ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন



সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন
ছবি: সংগ্রহ

সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য গুরুতর অনিয়মের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়।

তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আমলাদের তদবির উপেক্ষা করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ জানাতে বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা মন্ত্রণালয়ে আসছেন। গত রোববার সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের তিনজন সংসদ সদস্য এবং কৃষক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের অভিযোগ জানান।

গত সোমবার ঝিনাইদহে একটি অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আইনি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস গত সোমবারও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচ থেকে ছয়টি আবেদন জমা পড়ে। এর আগে একই ধরনের প্রায় ৫০০ আবেদন জমা হয়েছিল।

সারের ভরা মৌসুমের আগে সমাধানের তাগিদ

আগামী নভেম্বর থেকে সারের ভরা মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। আলু, ভুট্টা, গম ও শীতকালীন সবজি চাষের কারণে এ সময় সারের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু ডিলার নিয়োগ নিয়ে জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। মাঠপর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগও উঠছে। এতে উদ্বেগে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

তবে সার ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে সারের মজুতের ঘাটতি নেই। আমার দেশ–কে তাঁরা বলেন, সৌদি আরব, বেলারুশ, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানির কার্যক্রম চলছে। সারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ার আগেই ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মন্ত্রণালয়।

চার বিষয়ে তদন্ত

ডিলার নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এগুলো হলো—উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়ম, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ, আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারীদের ডিলার নিয়োগের সুপারিশের নেপথ্য কারণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার কারণ অনুসন্ধান।

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের কেউ কেউ নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে মন্ত্রণালয় এসব তদবির আমলে নেয়নি। বাছাই কমিটির তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা ব্যক্তিকেই নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বলে তাঁরা জানান।

কৃষি সচিব সেলিম খান আমার দেশ–কে বলেন, নীতিমালা ও জেলার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আমলযোগ্য অভিযোগের সংখ্যা খুবই কম। প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক জেলা বগুড়া থেকেও বেশ কিছু আবেদন এসেছে। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ জনের ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ডিলার নিয়োগের সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির হয়েছে। কোথাও কোথাও সংসদ সদস্যদের আধা সরকারি চিঠি বা ডিও লেটার ব্যবহার এবং ইউএনও ও ডিসির কাছে তদবিরের জন্য অর্থ লেনদেনের চুক্তির অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকেরা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি জেলার প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। গত ১৩ অক্টোবর যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক এলাহী তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজস্ব গুদাম নেই এমন ব্যক্তি ও অনভিজ্ঞদের ডিলার হিসেবে সুপারিশ, ইউএনওর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে ডিসির সুপারিশে প্রথম স্থানে নিয়ে আসা, রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া।

পাইকগাছা, বাঘারপাড়া ও ডুমুরিয়ায় অভিযোগ

খুলনার পাইকগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অস্বচ্ছতা, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকা পরিবর্তনের জন্য ঊর্ধ্বতন মহলের কথা বলে চাপ দেন জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। পরে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে কয়েকটি ইউনিয়নে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তালিকার নিচের দিকে থাকা ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কপিলমুনি ইউনিয়নে প্রথম স্থানে থাকা মেসার্স পপি এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে তৃতীয় স্থানে থাকা মেসার্স দৃশান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ষোলাদানা ইউনিয়নে এসকেআর এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স সুমি এন্টারপ্রাইজ এবং গড়াইখালী ইউনিয়নে মেসার্স যাবিন স্টোরের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত তালিকার বাইরে গিয়ে দলীয় বিবেচনা ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত আমার দেশ–কে বলেন, কমিটির বিবেচনা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাঁকে প্রথম স্থানে রাখার প্রয়োজন, তাঁকেই রাখা হয়েছে। এরপরও সুপারিশে অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ৮ নম্বর বাসুয়াড়ী ইউনিয়নে হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, একাধিক প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি এবং নিজস্ব গুদামঘর নেই—এমন একজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

তবে হাবিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষরা মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজারে মেসার্স মোল্ল্যা কৃষি ভান্ডারের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন বিএনপি নেতার ছেলে রিয়াদ মোহাম্মদ। তাঁর নিজস্ব সার বিক্রির দোকান ও গুদাম নেই—এমন অভিযোগ তুলে ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সবুজ মোড়ল।

অন্যদিকে, ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে একটি মিষ্টির দোকানকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে সুকৃতি কুমার মণ্ডল আমার দেশ–কে বলেন, দোকানটি অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল এবং দ্রুত খালি করা হচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।

ডুমুরিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও সবিতা সরকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ব্যস্ত থাকায় পরে যোগাযোগ করতে বলেন।

অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা

কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সার ডিলার নিয়োগে জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অনুপযুক্ত গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়া কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় এবং সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

বিষয় : কৃষি মন্ত্রণালয় নিয়োগে অনিয়ম সার ডিলার নিয়োগ কৃষি মন্ত্রণালয়

দৈনিক নবকাল

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬


সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন

প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনভিজ্ঞ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য গুরুতর অনিয়মের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়।

তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আমলাদের তদবির উপেক্ষা করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ জানাতে বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা মন্ত্রণালয়ে আসছেন। গত রোববার সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের তিনজন সংসদ সদস্য এবং কৃষক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের অভিযোগ জানান।

গত সোমবার ঝিনাইদহে একটি অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আইনি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস গত সোমবারও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচ থেকে ছয়টি আবেদন জমা পড়ে। এর আগে একই ধরনের প্রায় ৫০০ আবেদন জমা হয়েছিল।

সারের ভরা মৌসুমের আগে সমাধানের তাগিদ

আগামী নভেম্বর থেকে সারের ভরা মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। আলু, ভুট্টা, গম ও শীতকালীন সবজি চাষের কারণে এ সময় সারের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু ডিলার নিয়োগ নিয়ে জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। মাঠপর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগও উঠছে। এতে উদ্বেগে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

তবে সার ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে সারের মজুতের ঘাটতি নেই। আমার দেশ–কে তাঁরা বলেন, সৌদি আরব, বেলারুশ, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানির কার্যক্রম চলছে। সারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ার আগেই ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মন্ত্রণালয়।

চার বিষয়ে তদন্ত

ডিলার নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এগুলো হলো—উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়ম, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ, আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারীদের ডিলার নিয়োগের সুপারিশের নেপথ্য কারণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার কারণ অনুসন্ধান।

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের কেউ কেউ নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে মন্ত্রণালয় এসব তদবির আমলে নেয়নি। বাছাই কমিটির তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা ব্যক্তিকেই নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বলে তাঁরা জানান।

কৃষি সচিব সেলিম খান আমার দেশ–কে বলেন, নীতিমালা ও জেলার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আমলযোগ্য অভিযোগের সংখ্যা খুবই কম। প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক জেলা বগুড়া থেকেও বেশ কিছু আবেদন এসেছে। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ জনের ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ডিলার নিয়োগের সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির হয়েছে। কোথাও কোথাও সংসদ সদস্যদের আধা সরকারি চিঠি বা ডিও লেটার ব্যবহার এবং ইউএনও ও ডিসির কাছে তদবিরের জন্য অর্থ লেনদেনের চুক্তির অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকেরা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি জেলার প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। গত ১৩ অক্টোবর যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক এলাহী তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজস্ব গুদাম নেই এমন ব্যক্তি ও অনভিজ্ঞদের ডিলার হিসেবে সুপারিশ, ইউএনওর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে ডিসির সুপারিশে প্রথম স্থানে নিয়ে আসা, রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া।

পাইকগাছা, বাঘারপাড়া ও ডুমুরিয়ায় অভিযোগ

খুলনার পাইকগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অস্বচ্ছতা, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকা পরিবর্তনের জন্য ঊর্ধ্বতন মহলের কথা বলে চাপ দেন জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। পরে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে কয়েকটি ইউনিয়নে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তালিকার নিচের দিকে থাকা ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কপিলমুনি ইউনিয়নে প্রথম স্থানে থাকা মেসার্স পপি এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে তৃতীয় স্থানে থাকা মেসার্স দৃশান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ষোলাদানা ইউনিয়নে এসকেআর এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স সুমি এন্টারপ্রাইজ এবং গড়াইখালী ইউনিয়নে মেসার্স যাবিন স্টোরের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত তালিকার বাইরে গিয়ে দলীয় বিবেচনা ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত আমার দেশ–কে বলেন, কমিটির বিবেচনা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাঁকে প্রথম স্থানে রাখার প্রয়োজন, তাঁকেই রাখা হয়েছে। এরপরও সুপারিশে অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ৮ নম্বর বাসুয়াড়ী ইউনিয়নে হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, একাধিক প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি এবং নিজস্ব গুদামঘর নেই—এমন একজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

তবে হাবিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষরা মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজারে মেসার্স মোল্ল্যা কৃষি ভান্ডারের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন বিএনপি নেতার ছেলে রিয়াদ মোহাম্মদ। তাঁর নিজস্ব সার বিক্রির দোকান ও গুদাম নেই—এমন অভিযোগ তুলে ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সবুজ মোড়ল।

অন্যদিকে, ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে একটি মিষ্টির দোকানকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে সুকৃতি কুমার মণ্ডল আমার দেশ–কে বলেন, দোকানটি অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল এবং দ্রুত খালি করা হচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।

ডুমুরিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও সবিতা সরকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ব্যস্ত থাকায় পরে যোগাযোগ করতে বলেন।

অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা

কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সার ডিলার নিয়োগে জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অনুপযুক্ত গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়া কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় এবং সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০ আবেদন
0:00 0:00
1.0x