ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের দেওয়া টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি—এমন তথ্য উঠে এসেছে সরকারি গবেষণায়। এতে দেশে ব্যবহৃত টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনজন ইমিউনোলজিস্ট।বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জন্য টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু দাম কিংবা সরবরাহের পরিমাণ বিবেচনা করলেই চলবে না। টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই জনস্বার্থে টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক বিশ্লেষণ প্রকাশের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, বহুল আলোচিত বঙ্গভ্যাক্সের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তাঁরা প্রথম জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। সম্প্রতি পাঁচ কোটি শিশুকে দেওয়া টাইফয়েড টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহুল ব্যবহৃত একটি টিকার পরিবর্তে নতুন টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্তের পেছনে কী বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত যুক্তি ছিল, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।গত ২৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত আইইডিসিআরের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, হামের টিকা নেওয়া ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫ জনের (২৭ দশমিক ৫ শতাংশ) রক্তে হামের অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়া গেছে। আরও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরীক্ষার ফল ছিল অনিশ্চিত বা বর্ডারলাইন। বিপরীতে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া যায়।২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার পর সেপ্টেম্বরে এই গবেষণা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল দেশের কোটি কোটি শিশুর জন্য সংগ্রহ করা টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।বাংলাদেশ ও উন্নত দেশগুলোর টিকায় পার্থক্যবাংলাদেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে সাধারণত এমআর (MR) টিকা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রধানত এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়া হয়, যা হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া জলবসন্ত প্রতিরোধের উপাদান যুক্ত এমএমআরভি (MMRV) টিকাও ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এমএমআরভি ব্যবহার শুরু করেছে।যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে জিএসকের PRIORIX, মার্কের M-M-R II এবং ProQuad। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে M-M-RVAXPRO ও Priorix-Tetra।অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভারতের Serum Institute of India (SII) এবং Biological E-এর এমআর টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রি-কোয়ালিফিকেশন পেয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাজ্যে এসব টিকার নিয়মিত বাজারজাতকরণের অনুমোদন নেই বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।তাঁদের মতে, কোটি কোটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিকা নির্বাচনে এফডিএ ও ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।আগের গবেষণা ও সাম্প্রতিক ফলাফলে বড় পার্থক্যবাংলাদেশে এমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b) একাধিক গবেষণা পরিচালনা করেছে। ২০১৬ সালে Journal of Infectious Diseases-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রায় কিছু পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।তবে ২০২৫ সালে The Lancet Child & Adolescent Health সাময়িকীতে প্রকাশিত ২০১৭-১৮ সালের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই গবেষণায় ৯ মাস বয়সে টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ২৯২ শিশুর প্রায় ১০০ শতাংশের শরীরে হামের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।এমনকি ছয় মাস বয়সে এমআর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া শিশুদের মধ্যেও ৯৪ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতির (Stunting) হার ছিল দুই দলে যথাক্রমে ১০ ও ১২ শতাংশ। উচ্চতার তুলনায় ওজন কম বা ওয়েস্টিংয়ের (Wasting) হার ছিল যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশ।বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অপুষ্টি ও কম বয়সের মতো বিষয় থাকার পরও আগের গবেষণায় প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। সে তুলনায় ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি পজিটিভের হার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।তবে তাঁরা মনে করেন, শুধু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সফল ফল দিয়ে কোনো টিকার দীর্ঘমেয়াদি গুণগত মান নিশ্চিত করা যায় না। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে একই মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।টিকার উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কেন কঠোর নজরদারি প্রয়োজনবিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হামের টিকা সাধারণ রাসায়নিক ওষুধের মতো নয়। এটি জীবন্ত দুর্বলকৃত ভাইরাস (Live Attenuated Virus) ব্যবহার করে তৈরি একটি সংবেদনশীল জৈবপ্রযুক্তিগত পণ্য। টিকা উৎপাদনে ব্যবহৃত কোষের বৈশিষ্ট্য, কাঁচামালের মান, উৎপাদন পরিবেশ এবং ফ্রিজ-ড্রাইং প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও এর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।এ কারণে টিকা উৎপাদনে ব্যাচভিত্তিক গুণগত সামঞ্জস্য বা Batch-to-batch consistency অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান কয়েকটি ভালো মানের টিকা উৎপাদন করতে পারলেই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের FDA এবং ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) টিকার ক্লিনিক্যাল গবেষণার পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনকেন্দ্রের কার্যক্রমেও কঠোর নজরদারি করে।অপুষ্টি ও কোল্ড চেইনই কি ব্যর্থতার কারণ?সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়ার পেছনে শিশুদের অপুষ্টি, কম বয়স কিংবা টিকা সংরক্ষণের ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণকে এককভাবে দায়ী করার আগে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।তাঁরা ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর পরিচালিত এমআর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উদাহরণ দিয়েছেন। ওই গবেষণায় অপুষ্টির উপস্থিতি এবং কম বয়সেও অধিকাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করতে শুধু বয়স ও অপুষ্টিকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোল্ড চেইন ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁরা। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় দেশে টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য একটি বিস্তৃত অবকাঠামো রয়েছে।ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি নথির বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার মহাখালীতে ইপিআইয়ের সংরক্ষণাগারে ৩৮টি কোল্ডরুম ও ফ্রিজাররুম রয়েছে। এসব স্থাপনায় প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রাগত ত্রুটি বা সংরক্ষণজনিত সমস্যার প্রমাণ ছাড়া কোল্ড চেইনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। একইভাবে উৎপাদন পর্যায়েই কোনো টিকার কার্যক্ষমতা অপর্যাপ্ত থাকলে উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।FDA ও EMA অনুমোদনের গুরুত্ববিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার গুণগত মান যাচাইয়ে FDA ও EMA-এর মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্থা টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং উৎপাদনকেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ করে।ইউরোপে OCABR নামে একটি স্বাধীন সরকারি ব্যাচ যাচাইব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাধীন পরীক্ষাগারেও টিকার প্রতিটি ব্যাচের মান যাচাই করা হয়।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক মূল্যায়নকে টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত।ভারতে টিকা উৎপাদনের প্রায় ১২৫ বছরের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা সরবরাহে Serum Institute of India গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের নিজস্ব গবেষণায় উদ্ভাবিত কোনো টিকা FDA বা EMA-এর অনুমোদন পায়নি। এ বিষয়টিও বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।টিকা কেনায় স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্তের তাগিদবিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত এমএমআর টিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এসব টিকার নিয়মিত ব্যবহারের বয়স সাধারণত ১২ মাস থেকে শুরু হয়। ইউরোপের কিছু ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সেও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে এসব টিকা ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন তাঁরা। কোনো বিজ্ঞানী নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের টিকা নিয়ে গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে টিকা নির্বাচন ও চূড়ান্ত ক্রয় সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের বিরত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, বরং টিকার উৎপাদনগত মান, অ-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।এ ছাড়া দেশে বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধানের মতো মৌলিক জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, বিদেশি অর্থায়ন ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকেন্দ্রিক আর্থিক স্বার্থের কারণে কখনো কখনো জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত অগ্রাধিকার আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা অনৈতিক ও জনস্বার্থবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।শিশুদের টিকার মান নিয়ে আপস নয়বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সাম্প্রতিক হামের টিকার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ ফলাফলের কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা, উৎপাদনপ্রক্রিয়া যাচাই এবং টিকার প্রতিটি ব্যাচের গুণগত মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু কত কোটি ডোজ কেনা হচ্ছে কিংবা কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি ডোজের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে টিকার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।প্রতিবেদনটির লেখক ড. রেজাউল করিম নেদারল্যান্ডস-প্রবাসী ইমিউনোলজিস্ট। তিনি বায়োলজিকস ও টিকা উদ্ভাবন এবং মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ। ড. জুবায়ের রহমান যুক্তরাষ্ট্রের একজন ইমিউনোলজিস্ট। আর ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের বায়োটেক বিভাগের সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার (R&D) এবং বাংলাদেশ বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি।

নরসিংদী জেলা হাসপাতালে এক বিছানায় দুজনের চিকিৎসা

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১০০। অথচ সেখানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডেঙ্গু ও হামের রোগীর পাশাপাশি শিশু ও বয়স্ক রোগীদেরও মিলছে না শয্যা। বাধ্য হয়ে অনেককে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বারান্দার মেঝেতে। কোথাও আবার একটি শয্যায় থাকছেন দুজন রোগী।সীমিত জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শয্যা নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে চাপে পড়েছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়াতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।নরসিংদী জেলা হাসপাতাল জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এখানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীরাও আসেন। পাশাপাশি জেলার বৃহত্তর রায়পুরা উপজেলার একটি বড় অংশের মানুষ এ হাসপাতাল থেকে সেবা নেন। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও সেবার মানের কারণে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।দুই সপ্তাহ ধরে রোগী তিন শতাধিকহাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে অধিকাংশ সময়ই দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে রোগীর সংখ্যা তিন শতাধিক। সর্বশেষ গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩৩৫ জন রোগী।তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ১৩২ জন এবং শিশু ৯৮ জন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন ৩০ জন। এর আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩১৩।জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক জরিপ অনুযায়ী, নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও শয্যা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়ছেন। অনেককে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও একটি নির্ধারিত শয্যায় দুজন রোগীকেও থাকতে দেখা গেছে।শিশুকে নিয়ে দুই দিন ধরে বারান্দায় আমেনারায়পুরা থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন আমেনা বেগম। কিন্তু শয্যা না পাওয়ায় শিশুকে নিয়ে থাকতে হচ্ছে বারান্দার মেঝেতে।আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো লোকও নেই। এই হাসপাতালের সেবার মান ভালো। তাই সিট না পেলেও বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা নিচ্ছি। তাতেই আগের তুলনায় একটু ভালো।’শিবপুরের বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী মোমেন খান ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শয্যা না পেয়ে অন্য এক রোগী বাইরে যাওয়ার সুযোগে তাঁর বিছানায় শুয়ে শরীরে স্যালাইন নিচ্ছেন তিনি। অপেক্ষা করছেন, কখন একটি শয্যা খালি হবে।মোমেন খান বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই বা কী করার আছে? এক শয্যার হাসপাতালে রোগী প্রায় সাড়ে তিন শ।’পরীক্ষার চাপও বেড়েছেরোগীর সংখ্যা বাড়ায় চাপ বেড়েছে হাসপাতালের পরীক্ষাগারেও। হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান শাহ আলম বলেন, আগে ভর্তি রোগী ও বাইরে থেকে আসা রোগীদের মিলিয়ে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০টি পরীক্ষা করা হতো। এখন প্রতিদিন দেড় শতাধিক পরীক্ষা করতে হচ্ছে। লোকবল কম থাকায় কাজ সামলাতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাজহারুল আলম বলেন, ১০০ জন রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও সীমিত জনবল ও লজিস্টিক সুবিধা দিয়ে তিন গুণের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। এতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তারপরও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।শয্যা ও জনবল বাড়ানোর দাবিনরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও অধিকাংশ সময় দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে প্রতিদিনই তিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকছেন। এরপরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।তিনি ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হবে। এতে নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হবে এবং রোগীদের বারান্দার মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার দুর্ভোগ কমবে।

নরসিংদী জেলা হাসপাতালে এক বিছানায় দুজনের চিকিৎসা

পাঁচ বছরে ২ কোটি মানুষকে চক্ষুসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য

অন্ধত্ব ও দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ২ কোটি মানুষকে উন্নত প্রাথমিক চক্ষুসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে ১ কোটি মানুষকে চশমা দেওয়া, ১০ লাখ মানুষের ছানি অপারেশন এবং ৮০ শতাংশ চক্ষু বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ‘বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত এসব পরিকল্পনার কথা জানান।প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক চক্ষুসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে সারা দেশে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্কুলশিক্ষার্থী এবং পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের মানুষের কাছে এ সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে।দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের কর্মক্ষমতা, কাজের দক্ষতা এবং আয় বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।গড়ে তোলা হবে রেফারেল নেটওয়ার্কচক্ষুসেবা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে একটি সুনির্দিষ্ট রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথা জানান ডা. এম এ মুহিত। এ জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেল হাসপাতালগুলো চিহ্নিত করা হবে।তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং ও রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে যেসব রোগী শনাক্ত হবেন, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে।সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্কুলপড়ুয়া শিশুসহ ১ কোটি মানুষকে চশমা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষের ছানি অপারেশন এবং ৮০ শতাংশ চক্ষু বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।এ কর্মসূচিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে একটি ‘জাতীয় চক্ষু স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা’ প্রণয়নের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।‘লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়’আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ‘গ্লোবাল সামিট ফর আই হেলথ’-এ সরকারের এসব প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হবে বলে জানান ডা. এম এ মুহিত।তিনি বলেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে চক্ষুসেবার আওতায় আনা, ১ কোটি মানুষকে চশমা দেওয়া এবং ১০ লাখ ছানি অপারেশন করা সহজ কাজ নয়। তবে এ খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের উদ্দীপনা, ঐক্য, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রমাণভিত্তিক কর্মপদ্ধতি লক্ষ্যগুলো অর্জনে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।‘আইএনজিও ফোরাম ইন আই হেলথ’-এর সহায়তায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং অফথালমোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওএসবি) যৌথভাবে আলোচনা সভাটির আয়োজন করে।সভায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. সৈয়দ মাহবুবুল কাদির, আইএপিবির কান্ট্রি চেয়ার (বাংলাদেশ চ্যাপ্টার) ও অরবিস ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. মুনির আহমেদ, ওএসবির সভাপতি ডা. মো. তৌহিদুর রহমান ও মহাসচিব অধ্যাপক মো. নিনু রেইন (নিউটন), আইএনজিও ফোরামের চেয়ার ও সাইটসেভার্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও এবং ভিশনস্প্রিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিশা মাহজাবিন বক্তব্য দেন।‘সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে’ডা. মুনির আহমেদ বলেন, দেশে চক্ষুসেবা সম্প্রসারণে এ খাতের সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে, চক্ষু স্বাস্থ্যসেবাকে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।তিনি জানান, বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্য ব্লাইন্ড’-কে পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে।চক্ষুসেবা খাতে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. মুনির আহমেদ বলেন, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের কাঠামো ছাড়া কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।

পাঁচ বছরে ২ কোটি মানুষকে চক্ষুসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসা

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কয়েক দফায় পলেস্তারা খসে পড়ে রোগীসহ হাসপাতালের কর্মীরা আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ভাষ্য, ভয় ও ঝুঁকি নিয়েই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি জরুরি বিভাগেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য চাপ। শয্যা সংকট থাকায় অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী রয়েছে।রোগী ও স্বজনেরা জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের স্বল্পতা। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবলও নেই। ফলে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।হাসপাতালের আরএমও ডা. মুমিনুল হক বলেন, প্রতিদিন নির্ধারিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ বাড়ছে। হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা জরুরি।উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. পিনাকী চক্রবর্তী বলেন, হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, নতুন হাসপাতাল ভবন তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য নিজস্ব অক্সিজেন প্ল্যান্ট, পর্যাপ্ত সরকারি ওষুধ এবং উন্নত ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পরিবর্তে নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে বাঁশখালীর মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসা

কম দামের ওষুধ উধাও, বাড়ছে রোগীর চিকিৎসা খরচ

সরকারের তালিকায় থাকা ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বেশিরভাগই এখন বাজারে সহজলভ্য নয়। সরকারি হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে শুরু করে বেসরকারি ওষুধের দোকানেও অনেক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে সরকার নির্ধারিত দাম অপরিবর্তিত থাকায় উৎপাদন খরচের সঙ্গে দামের সামঞ্জস্য না থাকাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে কম দামের প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিবর্তে রোগীদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামের বিকল্প ওষুধ।বহুল ব্যবহৃত প্যারাসিটামল ৫০০ মিলিগ্রামের ক্ষেত্রেও সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। শতাধিক কোম্পানির উৎপাদন লাইসেন্স থাকলেও সারা বছর নিয়মিত এটি তৈরি করে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের মৌসুমে চাহিদা বাড়লে সংকট আরও তীব্র হয়। তখন নাপা এক্সট্রা, নাপা ওয়ান, নাপা র‍্যাপিড, নাপাডল, নাপা এক্সটেন্ড, এইস প্লাসসহ অতিরিক্ত ফর্মুলেশনের প্যারাসিটামল বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।অ্যান্টিবায়োটিকেও একই চিত্র। অ্যামোক্সিসিলিন ৫০০ মিলিগ্রাম উৎপাদনের লাইসেন্স অর্ধশতাধিক কোম্পানির থাকলেও নিয়মিত উৎপাদন করছে মাত্র ৮ থেকে ১০টি। সহজলভ্য না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের বেশি দামের অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে হচ্ছে। অথচ অ্যামোক্সিসিলিন ৫০০ মিলিগ্রামের দাম প্রায় সাড়ে ৭ টাকা। ডক্সিসাইক্লিন ১০০ মিলিগ্রাম আড়াই টাকা এবং ফ্লুক্লাক্সসিলিন ৫০০ মিলিগ্রাম ১৪ টাকা। বিপরীতে সেফুরক্সিম ও ক্লাভুরিক অ্যাসিডের ৫০০ মিলিগ্রামের দাম কোম্পানিভেদে ৫৫ থেকে ৮৫ টাকা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম দামের অত্যাবশ্যকীয় অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য হলে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমার পাশাপাশি উচ্চ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে। কারণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দামি ও উচ্চ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সিপ্রোফ্লোক্সাসিনের ক্ষেত্রেও কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় সরকার নির্ধারিত দাম কম হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।একই জেনেরিকের ওষুধ কোম্পানিভেদে ভিন্ন দামে বিক্রির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যেমন এজিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের অনুমোদিত দাম কোম্পানিভেদে ২৭ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই ধরনের কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়া হলেও দামের এমন পার্থক্য ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর জন্য বৈষম্য তৈরি করছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেখ জহির রায়হান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বৈশিষ্ট্যই হলো সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও জ্বালানির দামসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তাই উৎপাদক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার মাধ্যমে এসব ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন জানান, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ও তালিকা হালনাগাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের আলোচনা চলছে। কমিটি গঠিত হলে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

কম দামের ওষুধ উধাও, বাড়ছে রোগীর চিকিৎসা খরচ

আবারও রোগী ও স্বজনদের ভিড় বেড়েছে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে

রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আবারও রোগী ও স্বজনদের ভিড় বেড়েছে। জরুরি বিভাগ থেকে বহির্বিভাগ- হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে সকাল থেকেই রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি দেখা গেছে। টিকিট কাউন্টার, প্রসূতি ও শিশু বিভাগ, ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ বিভিন্ন স্থানে ছিল অপেক্ষমাণ মানুষের দীর্ঘ সারি।ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় ৪৭ দিন হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রমে ছন্দপতন হয়েছিল। লাইসেন্স পুনর্বহালের পর এখন আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে হাসপাতালটি।মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, লাইসেন্স পুনর্বহালের ৩৬তম দিনে সকাল থেকেই হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগীর চাপ রয়েছে। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নবজাতক, প্রসূতি ও অন্যান্য রোগে চিকিৎসা নিতে মানুষ এখানে আসছেন।রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া এবং চিকিৎসক-নার্সদের পরিচর্যার কারণে হাসপাতালটির ওপর তাঁদের এখনো আস্থা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়ার বিষয়টি তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন।তবে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর হাসপাতালটির হারানো আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে সেবার মান ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অনেকে।অবকাঠামো ও সেবায় পরিবর্তনের দাবিহাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লাইসেন্স পুনর্বহালের পর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা অনুসরণ করে আইসিইউ, এনআইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হচ্ছে।চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালটিতে মোট শয্যা ৭০০টি। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি বিনামূল্যের। শিশু ওয়ার্ডে বিনামূল্যের শয্যা রয়েছে ৬৬টি। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য রয়েছে আরও ১৫টি বিশেষ ফ্রি বেড।এ ছাড়া ১০১ শয্যার এনআইসিইউ রয়েছে। গর্ভবতী সেবাকেন্দ্রে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ জন গর্ভবতী নারী অ্যান্টিনেটাল কেয়ার নিতে আসেন। চেকআপ ও প্রসবের আগে তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয় এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালে সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করা হয়।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সেবায় একজন মায়ের জন্য একজন মিডওয়াইফ দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ৬০ থেকে ৬৫টি সিজারিয়ান প্রসব হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফার করা রোগীরাও এখানে প্রসবসেবা নেন।কম খরচের চিকিৎসায় আস্থাঅলাভজনক প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ১৯৯৭ সাল থেকে মানুষের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, এন্ডোক্রাইনোলজি, চক্ষু, কার্ডিওলজি, নাক-কান-গলা, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, অর্থোপেডিক্স, হেপাটোলজি, শিশু সার্জারি, ডায়াবেটোলজি, নেফ্রোলজি, নিউরোমেডিসিন, ইউরোলজি, মনোরোগ, রেডিওলজি ও ইমেজিংসহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সেবা দেন।স্বল্প খরচে চিকিৎসার পাশাপাশি ঢাকায় ৩৮০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবাও চালু রয়েছে। গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য বিনামূল্যে এবং নামমাত্র মূল্যে বিভিন্ন সেবাও সারা বছর চালু থাকে।যে ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যুছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সরেজমিনে সেখানে পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে ওয়ার্ডটিতে ‘পজিটিভ এয়ার প্রেসার’ বা পজিটিভ অক্সিজেন প্রেসারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার পাশাপাশি ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।শিশু ওয়ার্ডের বাইরে কেরানীগঞ্জ থেকে আসা হাবিব হোসেন বলেন, তাঁর প্রথম সন্তান এই হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবে এবং দ্বিতীয় সন্তান চার দিন আগে সিজারের মাধ্যমে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘কম খরচে ভালো সেবা পেয়েছি।’আদ্-দ্বীন হাসপাতালসমূহের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ঢাকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৭০০ বেডের মধ্যে ২০০টি বেড বিনামূল্যের। ফ্রি বেডের রোগীদের থাকা-খাওয়া সবকিছুই বিনামূল্যে।’তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো-বাতাস চলাচল এবং অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ নার্স ও কর্মীদের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। স্বল্প খরচে মানসম্মত ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন।ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর লাইসেন্স বাতিলগত ২৭ মে সকালে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে।সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং দায়িত্বে থাকা নার্স ও স্টাফদের চরম অবহেলার কথা উল্লেখ করে।পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়।৭ জুন মধ্যস্থতাকারী আইনজীবী শিশির মনির জানান, মৃত ছয় নবজাতকের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে দিতে সম্মত হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আইন পর্যালোচনার পর ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়। প্রায় ৪৭ দিন চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ২৭ জুলাই তিনটি শর্তে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল করে সেবা চালুর অনুমতি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইন ও লাইসেন্সের নির্দেশনা মেনে চলা, দ্রুত ডিউটি ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ এবং শর্ত ভঙ্গ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

আবারও রোগী ও স্বজনদের ভিড় বেড়েছে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে

বাংলাদেশকে ২৪ লাখ ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে ২৪ লাখ ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকরণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।সোমবার সকালে পঞ্চগড় জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মো. মিজানুর রহমানের কাছে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ মডেল হস্তান্তর করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সহায়তার মধ্যে নবজাতকের শরীর উষ্ণ রাখা ও শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তার সরঞ্জাম, গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য থেরাপিউটিক ফুড এবং টিকার কার্যকারিতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে এফএইচআই ৩৬০, ঝিপাইগো, জেএসআই ও ইউনিসেফের মাধ্যমে এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্গম এলাকার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ সহায়তার আওতায় রাখা হয়েছে।মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। এসব সহায়তার মূল লক্ষ্য সংক্রামক রোগ ও তা প্রতিরোধ করা হলেও মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য খাতেও কিছু সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।তিনি আরও বলেন, বাস্তবভিত্তিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ সহায়তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতের উদ্ভাবন এগিয়ে নিতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট গ্লোবাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নেও এটি সহায়ক হবে। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।এর আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তেঁতুলিয়া উপজেলার চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা ও মহানন্দা নদী পরিদর্শন করেন। পরে পঞ্চগড় জেলা হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে পঞ্চগড় সার্কিট হাউসে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমিরের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাঁর আমন্ত্রণে দুপুরের খাবারেও অংশ নেন রাষ্ট্রদূত।এ সময় পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভিন ও পুলিশ সুপার আবু সাঈম উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ২৪ লাখ মার্কিন ডলার বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৯ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

বাংলাদেশকে ২৪ লাখ ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

বগুড়ায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা, সেবা পেলেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ

অর্থের অভাবে সময়মতো চক্ষু চিকিৎসা নিতে পারেন না নিম্নআয়ের অনেক মানুষ। বিশেষ করে ছানি ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পারায় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের। এমন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বগুড়ায় আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ও পরামর্শ ক্যাম্প।শুক্রবার বগুড়া পৌর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত এ ক্যাম্পে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় ৫ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু চিকিৎসাসেবা নেন। সেখানে চোখ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চশমা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।আয়োজকেরা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানের উদ্যোগে এ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ক্যাম্পটি বাস্তবায়ন করে আল-বাসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন।সকাল থেকেই রোগীরা ক্যাম্পে আসতে শুরু করেন। শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ চিকিৎসা নেন। চিকিৎসকেরা চোখ পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র দেন এবং পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও চশমা বিতরণ করা হয়।ক্যাম্পে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে ছানি ও দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত প্রায় ৫০০ জনকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের জন্য বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে লেন্সসহ বিনামূল্যে ছানি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করা হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।ক্যাম্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও কৃষকদল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন এবং আল-বাসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর আহমেদ তাহের হামিদ আলী। তাঁরা চিকিৎসক ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।আয়োজকেরা বলেন, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ চক্ষু চিকিৎসা নিতে পারেন না। বিশেষ করে ছানি আক্রান্ত নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বগুড়ায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা, সেবা পেলেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ

চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে পেট সিটি স্ক্যান, কমবে ক্যানসার রোগীদের ঢাকামুখী ভোগান্তি

ক্যানসার রোগীদের জন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পাশে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (ইনমাস) চালু হচ্ছে আধুনিক পেট সিটি স্ক্যানের সুবিধা।সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ল্যাব স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে পরীক্ষা চালু হতে পারে।এতদিন চট্টগ্রামে পেট সিটি স্ক্যানের সুবিধা না থাকায় ক্যানসার রোগীদের পরীক্ষা করাতে ঢাকায় যেতে হতো। এতে পরীক্ষার খরচের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অসুস্থ রোগীকে নিয়ে চলাচলের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হতো স্বজনদের।চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। প্রতিদিন গড়ে ১২০ জনের মতো ক্যানসার রোগী চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে আসেন।চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে বেসরকারিভাবে পেট সিটি স্ক্যান করতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা চালু হলে খরচ অর্ধেকেরও কম হতে পারে।ইনমাসে পেট সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি স্থাপন করা হচ্ছে সাইক্লোট্রন মেশিন। এতে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও আইসোটোপ উৎপাদন করা হবে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে এসেছে এবং স্থাপন ও সংযোজনের কাজ চলছে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।পেট সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে শরীরে ক্যানসারের অবস্থান, অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার মাত্রা এবং চিকিৎসায় রোগী কতটা সাড়া দিচ্ছেন, তা মূল্যায়ন করা যায়। ক্যানসারের সক্রিয়তা শনাক্ত করতেও এ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।ইনমাস চট্টগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টাচার্য বলেন, সাইক্লোট্রনসহ পেট সিটি ল্যাব স্থাপনের কাজ চলছে। যন্ত্রপাতি স্থাপন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলেই পরীক্ষা শুরু করা হবে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সুবিধা স্থাপনে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রায় ১০৬ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা ভবন, মলিকুলার ল্যাব, সাইক্লোট্রন ও পেট সিটি মেশিন স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে পেট সিটি স্ক্যান, কমবে ক্যানসার রোগীদের ঢাকামুখী ভোগান্তি

ক্যানসার চিকিৎসায় আশার আলো

ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে ব্যক্তিগতকৃত এমআরএনএ ভ্যাকসিন। মের্ক ও মডার্নার যৌথভাবে তৈরি এই ভ্যাকসিন মেলানোমা রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।এক হাজারের বেশি মেলানোমা রোগীকে নিয়ে বড় পরিসরের গবেষণায় অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের ছয় সপ্তাহ পরপর সর্বোচ্চ নয়টি ডোজ ব্যক্তিগতকৃত ভ্যাকসিনের পাশাপাশি মের্কের ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কিট্রুডা দেওয়া হয়।গবেষণার পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু কিট্রুডার তুলনায় ভ্যাকসিন যুক্ত করলে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রায় ৫৯ শতাংশ কমেছে।এই ভ্যাকসিন রোগীর টিউমারে থাকা নির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তন শনাক্ত করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করে। ফলে ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করার সুযোগ তৈরি হয়।গবেষকদের দাবি, কিট্রুডার সঙ্গে ভ্যাকসিন ব্যবহারে নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ফ্লু বা কোভিড টিকার পর দেখা দেওয়া হালকা উপসর্গের মতো প্রতিক্রিয়াই প্রধানত দেখা গেছে।মেলানোমার পাশাপাশি ফুসফুস, মূত্রথলি, কিডনি, অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়েও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। রোশ ও বায়োএনটেকও কোলন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এমআরএনএ ভ্যাকসিন নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, মেলানোমার এই ফলাফল ব্যক্তিগতকৃত ক্যানসার ভ্যাকসিনের গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যানসার চিকিৎসায় আশার আলো

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান সেলিম উদ্দিনের

সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। অর্থের অভাবে নিম্নআয়ের অনেক মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারছেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকার ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ওষুধ বিতরণ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী সেলিম উদ্দিনের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘পয়সা দিলে সব ঠিক, পয়সা নাই তো চিকিৎসা পাবেন না’—এমন পরিস্থিতি থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে। চিকিৎসাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।তিনি বলেন, জামায়াতের উদ্যোগে সারা বছর বিভিন্ন স্থানে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়, যাতে অসচ্ছল ও নিম্নআয়ের মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।দায়িত্ব পেলে ঢাকা উত্তর সিটির হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং কম খরচে সরকারি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান সেলিম উদ্দিন। হাসপাতালগুলোকে দ্রুত সার্জারি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।সেলিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তুলতে চাই।’ উন্নত চিকিৎসার জন্য যাতে দেশের মানুষকে বিদেশে যেতে না হয়, সে ধরনের পরিবর্তন চিকিৎসাক্ষেত্রে আনার কথা জানান তিনি।চিকিৎসার নামে অর্থপাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করতে কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ও উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান।ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ঢাকা উত্তর সিটির উন্নয়ন ও আধুনিক নগরায়নে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বের বিকল্প নেই।দিনব্যাপী এ মেডিকেল ক্যাম্পে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চিকিৎসাসেবা নেন।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান সেলিম উদ্দিনের

হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই পূর্ণ ছয় মাস বুকের দুধ পায়নি

হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ জীবনের প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে মায়ের বুকের দুধ পায়নি। একই সঙ্গে মারা যাওয়া শিশুদের ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র অপুষ্টিতে এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি অপুষ্টিতে।বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বাশিহাই) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।বুধবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে শিশুদের হাম নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ সভায় গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাশিহাইয়ের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান।৩৫৪ শিশুকে নিয়ে গবেষণাগবেষণায় হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৫৪ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ৩ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। এসব শিশুর ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে মায়ের বুকের দুধ পায়নি।মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ হামে মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ জীবনের প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে মায়ের বুকের দুধ পায়নি।গবেষণায় আরও দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র অপুষ্টি এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি অপুষ্টিতে আক্রান্ত ছিল।টিকা নেওয়ার তথ্যেও পার্থক্যগবেষকেরা বয়স ও টিকা নেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করেন।নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়।টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের বা ৯৭ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের বা ৯২ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের বা ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে।তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার এই তথ্যকে টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে হাম আক্রান্ত হওয়ার সাধারণ হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।কারণ, গবেষণায় অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ফলে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৬ জনের হাম শনাক্ত হওয়ার হিসাব শুধু এই হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।আরও গবেষণার প্রয়োজনগবেষকেরা বলেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও ওই শিশুদের হাম শনাক্ত হওয়ার কারণ জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। টিকা নেওয়ার পর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে অন্য কোনো কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে।তবে এসব সম্ভাব্য কারণের কোনটি সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে, তা বর্তমান গবেষণায় নির্ধারণ করা হয়নি।সভায় বাশিহাই পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই পূর্ণ ছয় মাস বুকের দুধ পায়নি

হামের উপসর্গে ৫ মাসে প্রাণ গেল ৯০৮ জনের, আজ ৬ শিশুর মৃত্যু

দেশে হামের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১০১ শিশু। রোববার (১৬ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ১ হাজার ২১ শিশু হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৮০৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯৯ জন। সব মিলিয়ে এই সময়ে হাম ও সংশ্লিষ্ট উপসর্গে ৯০৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৯৬৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৮৫০ জন। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৭। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এদের মধ্যে ১৭ হাজার ৮৮০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।এ সময়ে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৫৭ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৩৯ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার এখনো বেশি। বিশেষ করে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্য খাতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

হামের উপসর্গে ৫ মাসে প্রাণ গেল ৯০৮ জনের, আজ ৬ শিশুর মৃত্যু

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সম্প্রসারিত ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভবনটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।১৫ তলা ভবনটির নিচের তিন তলা বেজমেন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখানে পার্কিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সার্ভিস সেকশনের ব্যবস্থা রয়েছে। ওপরের ১২ তলায় রোগীদের জন্য ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও ডায়াগনস্টিক ইউনিট রাখা হয়েছে।নতুন ভবনে রয়েছে ৪০টি আইসিইউ শয্যা, ২৪টি পোস্ট-অপারেটিভ শয্যা এবং ১১২টি কেবিন। এর মাধ্যমে নিউরোলজিক্যাল রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী। এরপর রয়েছে দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগীরা।এ ছাড়া পার্কিনসন্স, ডিমেনশিয়া, গিলেন-বারে সিনড্রোম (জিবিএস), মৃগী ও হাইড্রোকেফালাসসহ বিভিন্ন ধরনের নিউরোলজিক্যাল রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক সব বয়সী রোগীর নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে।

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরছে সরকার, বাড়ছে উদ্বেগ

খাবারের খরচ কমানো যায়, কিন্তু ওষুধ তো কম খাওয়া যায় না। রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মিজানুর রহমানের কথায় উঠে এসেছে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে থাকা একটি পরিবারের চিত্র। মা-বাবার চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ প্রতি মাসে তাঁর ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে তিনি এখন হিমশিম খাচ্ছেন।মিজানুর রহমানের মা-বাবা দুজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাঁর বাবার হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসাও চলছে। নিয়মিত চিকিৎসক দেখানো, ওষুধ কেনা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতি মাসে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আয় বাড়ার তুলনায় চিকিৎসা ব্যয় দ্রুত বাড়ায় সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর।মিজানুর রহমানের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা কম নয়। মূল্যস্ফীতির চাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ করছে। কেউ কেউ চিকিৎসা কিংবা ওষুধ কেনা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।এর মধ্যেই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের নীতিতে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরার সিদ্ধান্তগত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সে সময়ের সরকারি মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা বহাল থাকবে। একই সঙ্গে নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ বিধান অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণেই সেগুলো বাতিল করা হয়েছে।তবে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন।স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই মানুষের পকেট থেকেবাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার সঞ্চয় হারাচ্ছে এবং ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতেও পড়ছেন।বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর ওপর এর চাপ বেশি। চিকিৎসার ব্যয়ের আশঙ্কায় অনেকে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। আবার আর্থিক সংকটের কারণে কেউ কেউ চিকিৎসার মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে গেলে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, বিপণন ব্যয় ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির মতো কারণ দেখিয়ে ওষুধের দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।তিন দশকেও বড় পরিবর্তন হয়নিঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়ন করা হয় ১৯৮২ সালে। ওই নীতিতে ১৫০টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের নীতিতে সংখ্যা কমিয়ে ১১৭ করা হয়।তালিকার বাইরে থাকা অধিকাংশ ওষুধের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। এরপর প্রায় তিন দশক এই ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর হাইকোর্টের এক রায়ে পুরোনো ১১৭টি ওষুধের তালিকা বাতিল করে নতুন তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৭ করা হয়। নতুন তালিকায় যুক্ত হয় আরও ১৭৮টি ওষুধ।গত ৩ ফেব্রুয়ারি গেজেটের মাধ্যমে নতুন তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তালিকাটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এ উদ্যোগকে ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমতনতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি। গত বছরের ১৩ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ওষুধ খাতের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নীতিটিকে ‘অস্বচ্ছ ও একপেশে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ৩২ বছর আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা অনেক ওষুধ বর্তমানে অকার্যকর হয়ে গেছে। আবার প্রযুক্তির উন্নতির কারণে কিছু ওষুধ উৎপাদনের খরচ কমেছে। তাই পুরো ব্যবস্থা বাতিল না করে প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ নীতি সংশোধন করা উচিত ছিল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, শুধু ওষুধ নয়, রোগ শনাক্তকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ওষুধ উৎপাদনের খরচও বেড়েছে। দীর্ঘদিন জেনেরিক ওষুধের তালিকা পর্যালোচনা না হওয়ায় তা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।তাঁর মতে, নতুন তালিকা তৈরির সময় এমন নীতি দরকার, যাতে ওষুধ ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারেন এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও ওষুধের দাম রাখা যায়।ওষুধশিল্প সমিতির স্বস্তিতবে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত নীতিটি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করেই করা হয়েছিল। এর ফলে প্রায় দুই বছর ধরে ওষুধশিল্পে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল।তাঁর দাবি, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই অচলাবস্থা কাটবে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরবে। নতুন নীতিমালা বাতিলের কারণে ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তিনি নাকচ করেছেন।ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক আদেশ পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা ঠিক হবে না।দেশে উৎপাদিত হয় ৯৭ শতাংশ ওষুধসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানিও হচ্ছে।দেশে বর্তমানে ৩১০টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ৪ হাজার ১৮০টি জেনেরিকের ৩৫ হাজার ২৯০টি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে। এর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ওষুধের খুচরা মূল্য বা এমআরপি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নির্ধারণ করে। বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধের দাম নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা রয়েছে। ওষুধ কেনা, সরকারি সরবরাহ, ব্যয় পরিশোধ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে এসব তালিকা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।ফলে বাংলাদেশে নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কীভাবে করা হবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের ভবিষ্যৎ।

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরছে সরকার, বাড়ছে উদ্বেগ