খাবারের খরচ কমানো যায়, কিন্তু ওষুধ তো কম খাওয়া যায় না। রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মিজানুর রহমানের কথায় উঠে এসেছে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে থাকা একটি পরিবারের চিত্র। মা-বাবার চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ প্রতি মাসে তাঁর ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে তিনি এখন হিমশিম খাচ্ছেন।
মিজানুর রহমানের মা-বাবা দুজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাঁর
বাবার
হৃদরোগ
ও
উচ্চ
রক্তচাপের চিকিৎসাও চলছে।
নিয়মিত
চিকিৎসক দেখানো,
ওষুধ
কেনা
এবং
বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতি
মাসে
বড়
অঙ্কের
অর্থ
ব্যয়
হচ্ছে।
আয়
বাড়ার
তুলনায়
চিকিৎসা ব্যয়
দ্রুত
বাড়ায়
সংসারের হিসাব
মেলানো
কঠিন
হয়ে
পড়েছে
তাঁর।
মিজানুর রহমানের মতো
দীর্ঘমেয়াদি রোগে
আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা
কম
নয়।
মূল্যস্ফীতির চাপে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
খরচ
সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত
চিকিৎসা ব্যয়
বহন
করতে
গিয়ে
নিম্ন
ও
মধ্যম
আয়ের
অনেক
পরিবার
সঞ্চয়
ভাঙছে,
ঋণ
করছে।
কেউ
কেউ
চিকিৎসা কিংবা
ওষুধ
কেনা
কমিয়ে
দিতে
বাধ্য
হচ্ছেন।
এর মধ্যেই
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা
ও
মূল্য
নির্ধারণের নীতিতে
সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নতুন
করে
আলোচনার জন্ম
দিয়েছে।
পুরোনো
ব্যবস্থায় ফেরার সিদ্ধান্ত
গত ৩
আগস্ট
প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে
অন্তর্বর্তী সরকার
প্রণীত
‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের
মূল্য
নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন
১৯৯৪
সালের
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা
এবং
সে
সময়ের
সরকারি
মূল্য
নির্ধারণের ব্যবস্থা বহাল
থাকবে।
একই
সঙ্গে
নতুন
করে
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা
প্রণয়ন
করা
হবে।
সরকারের পক্ষ
থেকে
বলা
হয়েছে,
‘ওষুধ
ও
কসমেটিকস আইন,
২০২৩’
অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা
তৈরির
আগে
জাতীয়
ওষুধ
উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার
বিধান
রয়েছে।
নতুন
তালিকা
ও
মূল্য
নির্ধারণ পদ্ধতি
প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ
বিধান
অনুসরণ
করা
হয়নি।
এ
কারণেই
সেগুলো
বাতিল
করা
হয়েছে।
তবে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের
মূল্য
নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’-এর বৈধতা
চ্যালেঞ্জ করে
হাইকোর্টে রিট
হয়েছে।
বিষয়টি
বর্তমানে বিচারাধীন।
স্বাস্থ্য
ব্যয়ের বড় অংশই মানুষের পকেট থেকে
বাংলাদেশ উন্নয়ন
গবেষণা
প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা
অনুযায়ী, দেশের
মোট
স্বাস্থ্য ব্যয়ের
প্রায়
৭৯
শতাংশ
মানুষকে নিজ
পকেট
থেকে
বহন
করতে
হয়।
চিকিৎসা ও
ওষুধের
ব্যয়
মেটাতে
গিয়ে
অনেক
পরিবার
সঞ্চয়
হারাচ্ছে এবং
ঋণগ্রস্ত হচ্ছে।
কেউ
কেউ
নতুন
করে
দারিদ্র্যের ঝুঁকিতেও পড়ছেন।
বিশেষ করে
দীর্ঘমেয়াদি রোগে
আক্রান্ত পরিবারগুলোর ওপর
এর
চাপ
বেশি।
চিকিৎসার ব্যয়ের
আশঙ্কায় অনেকে
চিকিৎসকের কাছে
যেতে
চান
না।
আবার
আর্থিক
সংকটের
কারণে
কেউ
কেউ
চিকিৎসার মাঝপথে
ওষুধ
খাওয়া
বন্ধ
করে
দেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা,
পুরোনো
ব্যবস্থায় ফিরে
গেলে
উৎপাদন
ব্যয়,
কাঁচামালের দাম,
বিপণন
ব্যয়
ও
ডলারের
মূল্যবৃদ্ধির মতো
কারণ
দেখিয়ে
ওষুধের
দাম
বাড়ানোর সুযোগ
তৈরি
হতে
পারে।
এতে
জীবন
রক্ষাকারী ওষুধ
নিম্ন
ও
মধ্যম
আয়ের
মানুষের নাগালের বাইরে
চলে
যাওয়ার
ঝুঁকি
রয়েছে।
তিন দশকেও বড় পরিবর্তন
হয়নি
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য
অনুযায়ী, দেশে
প্রথম
জাতীয়
ওষুধনীতি প্রণয়ন
করা
হয়
১৯৮২
সালে।
ওই
নীতিতে
১৫০টি
ওষুধকে
অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে
তালিকাভুক্ত করা
হয়েছিল। ১৯৯৪
সালের
নীতিতে
সংখ্যা
কমিয়ে
১১৭
করা
হয়।
তালিকার বাইরে
থাকা
অধিকাংশ ওষুধের
দাম
নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া
হয়
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
এরপর
প্রায়
তিন
দশক
এই
ব্যবস্থায় বড়
কোনো
পরিবর্তন হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে
২০২৫
সালের
২৫
নভেম্বর হাইকোর্টের এক
রায়ে
পুরোনো
১১৭টি
ওষুধের
তালিকা
বাতিল
করে
নতুন
তালিকা
তৈরির
নির্দেশ দেওয়া
হয়।
এর
পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫
সালে
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
সংখ্যা
বাড়িয়ে
২৯৭
করা
হয়।
নতুন
তালিকায় যুক্ত
হয়
আরও
১৭৮টি
ওষুধ।
গত ৩
ফেব্রুয়ারি গেজেটের মাধ্যমে নতুন
তালিকাটি প্রকাশ
করা
হয়।
এর
আগে
৮
জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে
তালিকাটি অনুমোদন দেওয়া
হয়েছিল। তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা.
সায়েদুর রহমান
এ
উদ্যোগকে ‘ঐতিহাসিক ও
যুগান্তকারী’ বলে
উল্লেখ
করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের
ভিন্নমত
নতুন তালিকা
ও
মূল্য
নির্ধারণ পদ্ধতি
নিয়ে
শুরু
থেকেই
আপত্তি
জানিয়ে
আসছিল
বাংলাদেশ ঔষধ
শিল্প
সমিতি।
গত
বছরের
১৩
আগস্ট
অন্তর্বর্তী সরকারের ওষুধ
খাতের
নীতি
নিয়ে
প্রশ্ন
তুলেছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা
ফখরুল
ইসলাম
আলমগীর। তিনি
নীতিটিকে ‘অস্বচ্ছ ও
একপেশে’
বলে
মন্তব্য করেছিলেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা.
মুশতাক
হোসেন
সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে
বলেন,
৩২
বছর
আগের
ব্যবস্থায় ফিরে
যাওয়ার
প্রয়োজন নেই।
তাঁর
মতে,
১৯৯৪
সালের
তালিকায় থাকা
অনেক
ওষুধ
বর্তমানে অকার্যকর হয়ে
গেছে।
আবার
প্রযুক্তির উন্নতির কারণে
কিছু
ওষুধ
উৎপাদনের খরচ
কমেছে।
তাই
পুরো
ব্যবস্থা বাতিল
না
করে
প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকা
ও
মূল্য
নির্ধারণ নীতি
সংশোধন
করা
উচিত
ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড.
সৈয়দ
আবদুল
হামিদ
বলেন,
শুধু
ওষুধ
নয়,
রোগ
শনাক্তকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসার প্রায়
সব
ক্ষেত্রেই ব্যয়
বেড়েছে। একই
সঙ্গে
ওষুধ
উৎপাদনের খরচও
বেড়েছে। দীর্ঘদিন জেনেরিক ওষুধের
তালিকা
পর্যালোচনা না
হওয়ায়
তা
হালনাগাদ করা
প্রয়োজন।
তাঁর মতে,
নতুন
তালিকা
তৈরির
সময়
এমন
নীতি
দরকার,
যাতে
ওষুধ
ব্যবসায়ীরা টিকে
থাকতে
পারেন
এবং
সাধারণ
মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও
ওষুধের
দাম
রাখা
যায়।
ওষুধশিল্প
সমিতির স্বস্তি
তবে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত
জানিয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ
শিল্প
সমিতি।
সংগঠনটির মহাসচিব মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন,
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত
নীতিটি
তাঁদের
সঙ্গে
আলোচনা
না
করেই
করা
হয়েছিল। এর
ফলে
প্রায়
দুই
বছর
ধরে
ওষুধশিল্পে এক
ধরনের
স্থবিরতা ছিল।
তাঁর দাবি,
নতুন
সিদ্ধান্তের ফলে
সেই
অচলাবস্থা কাটবে
এবং
বাজারে
স্বস্তি ফিরবে।
নতুন
নীতিমালা বাতিলের কারণে
ওষুধের
দাম
বাড়ার
আশঙ্কাও তিনি
নাকচ
করেছেন।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড.
আকতার
হোসেন
বলেন,
মন্ত্রণালয় থেকে
এখনো
আনুষ্ঠানিক আদেশ
পাওয়া
যায়নি।
তাই
এ
বিষয়ে
এখনই
মন্তব্য করা
ঠিক
হবে
না।
দেশে উৎপাদিত
হয় ৯৭ শতাংশ ওষুধ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান,
দেশের
চাহিদার প্রায়
৯৭
শতাংশ
ওষুধ
দেশেই
উৎপাদিত হয়।
বাংলাদেশ থেকে
আমেরিকা ও
ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে
ওষুধ
রপ্তানিও হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ৩১০টি
অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এসব
প্রতিষ্ঠান ৪
হাজার
১৮০টি
জেনেরিকের ৩৫
হাজার
২৯০টি
ব্র্যান্ডের ওষুধ
উৎপাদন
করে।
এর
মধ্যে
মাত্র
৩
শতাংশ
ওষুধের
খুচরা
মূল্য
বা
এমআরপি
ঔষধ
প্রশাসন অধিদপ্তর নির্ধারণ করে।
বাকি
প্রায়
৯৭
শতাংশ
ওষুধের
দাম
নির্ধারণ করে
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য
অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টির
বেশি
দেশে
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের
জাতীয়
তালিকা
রয়েছে।
ওষুধ
কেনা,
সরকারি
সরবরাহ,
ব্যয়
পরিশোধ
ও
মূল্য
নিয়ন্ত্রণে এসব
তালিকা
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে
কাজ
করে।
ফলে বাংলাদেশে নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কীভাবে করা হবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের ভবিষ্যৎ।