রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আবারও রোগী ও স্বজনদের ভিড় বেড়েছে। জরুরি বিভাগ থেকে বহির্বিভাগ- হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে সকাল থেকেই রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি দেখা গেছে। টিকিট কাউন্টার, প্রসূতি ও শিশু বিভাগ, ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ বিভিন্ন স্থানে ছিল অপেক্ষমাণ মানুষের দীর্ঘ সারি।
ছয় নবজাতকের
মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় ৪৭ দিন হাসপাতালটির
সেবা কার্যক্রমে ছন্দপতন হয়েছিল। লাইসেন্স পুনর্বহালের পর এখন আবার
স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে হাসপাতালটি।
মঙ্গলবার সরেজমিনে
দেখা যায়, লাইসেন্স পুনর্বহালের
৩৬তম দিনে সকাল থেকেই
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগীর চাপ রয়েছে। রাজধানী
ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নবজাতক, প্রসূতি
ও অন্যান্য রোগে চিকিৎসা নিতে
মানুষ এখানে আসছেন।
রোগী ও
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা
যায়, তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা
পাওয়া এবং চিকিৎসক-নার্সদের
পরিচর্যার কারণে হাসপাতালটির ওপর তাঁদের এখনো
আস্থা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাভাবিক প্রসবকে
উৎসাহিত করা এবং নিম্ন
আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিস
সেবা দেওয়ার বিষয়টি তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে ছয়
নবজাতকের মৃত্যুর পর হাসপাতালটির হারানো
আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে
সেবার মান ধরে রাখা
বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন
অনেকে।
অবকাঠামো
ও সেবায় পরিবর্তনের দাবি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
জানিয়েছে, লাইসেন্স পুনর্বহালের পর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থায় পরিবর্তন
আনা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, ভেন্টিলেশন
ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংক্রমণ
প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা অনুসরণ করে আইসিইউ, এনআইসিইউ,
সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেবা
দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসক, নার্স
ও অন্যান্য কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে
জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের তথ্য
অনুযায়ী, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার
৮০০ থেকে ৩ হাজার
রোগী চিকিৎসা নেন। হাসপাতালটিতে মোট
শয্যা ৭০০টি। এর মধ্যে প্রায়
২০০টি বিনামূল্যের। শিশু ওয়ার্ডে বিনামূল্যের
শয্যা রয়েছে ৬৬টি। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য রয়েছে আরও
১৫টি বিশেষ ফ্রি বেড।
এ ছাড়া
১০১ শয্যার এনআইসিইউ রয়েছে। গর্ভবতী সেবাকেন্দ্রে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০
জন গর্ভবতী নারী অ্যান্টিনেটাল কেয়ার
নিতে আসেন। চেকআপ ও প্রসবের আগে
তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয় এবং
কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালে সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওয়ান টু ওয়ান’
সেবায় একজন মায়ের জন্য
একজন মিডওয়াইফ দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন
গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি
স্বাভাবিক প্রসব এবং ৬০ থেকে
৬৫টি সিজারিয়ান প্রসব হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল
থেকে রেফার করা রোগীরাও এখানে
প্রসবসেবা নেন।
কম
খরচের চিকিৎসায় আস্থা
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ১৯৯৭ সাল থেকে
মানুষের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। হাসপাতালের
বহির্বিভাগে মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, এন্ডোক্রাইনোলজি, চক্ষু, কার্ডিওলজি, নাক-কান-গলা,
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, অর্থোপেডিক্স, হেপাটোলজি, শিশু সার্জারি, ডায়াবেটোলজি,
নেফ্রোলজি, নিউরোমেডিসিন, ইউরোলজি, মনোরোগ, রেডিওলজি ও ইমেজিংসহ বিভিন্ন
বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সেবা দেন।
স্বল্প খরচে
চিকিৎসার পাশাপাশি ঢাকায় ৩৮০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স
সেবাও চালু রয়েছে। গরিব
ও অসহায় রোগীদের জন্য বিনামূল্যে এবং
নামমাত্র মূল্যে বিভিন্ন সেবাও সারা বছর চালু
থাকে।
যে
ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু
ছয় নবজাতকের
মৃত্যুর পর যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল,
সরেজমিনে সেখানে পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে ওয়ার্ডটিতে ‘পজিটিভ এয়ার প্রেসার’ বা
পজিটিভ অক্সিজেন প্রেসারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর
ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের
করে দেওয়ার পাশাপাশি ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।
শিশু ওয়ার্ডের
বাইরে কেরানীগঞ্জ থেকে আসা হাবিব
হোসেন বলেন, তাঁর প্রথম সন্তান
এই হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবে এবং দ্বিতীয় সন্তান
চার দিন আগে সিজারের
মাধ্যমে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘কম
খরচে ভালো সেবা পেয়েছি।’
আদ্-দ্বীন
হাসপাতালসমূহের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন
বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
ঢাকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে
৭০০ বেডের মধ্যে ২০০টি বেড বিনামূল্যের। ফ্রি
বেডের রোগীদের থাকা-খাওয়া সবকিছুই
বিনামূল্যে।’
তিনি আরও
বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো-বাতাস চলাচল
এবং অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসক, দক্ষ নার্স ও
কর্মীদের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। স্বল্প খরচে মানসম্মত ও
উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে তাঁরা প্রস্তুত
রয়েছেন।
ছয়
নবজাতকের মৃত্যুর পর লাইসেন্স বাতিল
গত ২৭
মে সকালে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের
পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু
হয়। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের কমিটি
গঠন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও
একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে।
সরকার গঠিত
তদন্ত কমিটি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর
ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং দায়িত্বে থাকা
নার্স ও স্টাফদের চরম
অবহেলার কথা উল্লেখ করে।
পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫ জুন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ
দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে
জবাব দিতে বলা হয়।
৭ জুন
মধ্যস্থতাকারী আইনজীবী শিশির মনির জানান, মৃত
ছয় নবজাতকের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা
করে দিতে সম্মত হয়েছে
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আইন পর্যালোচনার পর
১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স
বাতিল করা হয়।
প্রায়
৪৭ দিন চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম
বন্ধ থাকার পর ২৭ জুলাই
তিনটি শর্তে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল করে সেবা চালুর
অনুমতি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইন ও লাইসেন্সের
নির্দেশনা মেনে চলা, দ্রুত
ডিউটি ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ
এবং শর্ত ভঙ্গ হলে
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।