বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়া এবং তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাবে প্রতিবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে লাইসেন্স প্রদানে রাজনৈতিক নির্দেশনার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর
বিটিআরসি এই প্রতিবেদন জমা
দেয়। এতে লাইসেন্স দেওয়ার
প্রক্রিয়ার বৈধতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কনসোর্টিয়াম গঠনের
পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা চালু করতে
না পারায় প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ
বিভাগের কাছে অনুমোদন চাওয়া
হয়েছে বলে জানানো হয়।
গত
২৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক আমার দেশ-এর
প্রথম পাতায় ‘সামিটের নেতৃত্বে সাবমেরিন ক্যাবলের অবৈধ কনসোর্টিয়াম’ শিরোনামে
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে সামিট
কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকমের
পৃথক লাইসেন্স নিয়ে যৌথ কনসোর্টিয়াম
গঠন, বিতর্কিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানাসংক্রান্ত
বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
লাইসেন্স
দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিটিআরসির বক্তব্য
বিটিআরসির
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১
সালের লাইসেন্সিং গাইডলাইন এবং পরবর্তী সময়ে
২০২১ ও ২০২২ সালে
সংশোধনী ও উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির
মাধ্যমে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বান
করা হয়। সর্বাধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের
অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত
করতে আবেদনের সময়সীমা দুই দফায় বাড়িয়ে
২০২২ সালের ১০ মে পর্যন্ত
নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মূল্যায়ন
কমিটি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব
যাচাই করে ওই বছরের
২৪ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে
সর্বোচ্চ নম্বর পায় সামিট কমিউনিকেশনস
লিমিটেড—৯২ দশমিক ৪৬।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিডিনেট কমিউনিকেশনস
লিমিটেড পায় ৮৭ দশমিক
৬৪ নম্বর এবং তৃতীয় স্থানে
থাকা মেটাকোর সাবকম লিমিটেড পায় ৮৬ দশমিক
৪৮ নম্বর।
পরবর্তী
সময়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ
বিভাগের পূর্বানুমোদন নিয়ে ২০২২ সালের
সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠান তিনটিকে পৃথক লাইসেন্স দেওয়া
হয়। বিটিআরসির দাবি, কারিগরি, আর্থিক ও আইনগত যোগ্যতা
যাচাই করে উন্মুক্ত ও
প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় এসব লাইসেন্স দেওয়া
হয়েছিল।
কনসোর্টিয়াম
গঠন নিয়ে বিতর্ক
বিটিআরসির
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের এপ্রিলে
এক সভায় তিন লাইসেন্সধারী
প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত
ট্রাঙ্ক ক্যাবলের জন্য ‘ক্যাম্পানা গ্রুপ’ এবং ব্রাঞ্চ ক্যাবলের
জন্য যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠনের
সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, আলাদাভাবে তিনটি ক্যাবল স্থাপন করলে ব্যয় তিন
গুণেরও বেশি হতে পারত।
এই ব্যয় এড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলো
যৌথভাবে প্রায় ১ হাজার ১০০
কিলোমিটার সমুদ্রতলের ক্যাবল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।
লাইসেন্সিং
গাইডলাইনের ২১ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা
দিয়ে বিটিআরসি বলেছে, ট্রাঙ্ক ক্যাবল বা সংশ্লিষ্ট চুক্তির
তথ্য কমিশনে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা
থাকলেও এ ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদন
নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
এ
ছাড়া গাইডলাইনে নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় প্রতিটি ফাইবার পেয়ার থেকে বেশি সক্ষমতা—১৫ দশমিক ২
টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড (টিবিপিএস)—পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
বর্তমান চাহিদা সিঙ্গাপুরমুখী হওয়ায় আপাতত পূর্বমুখী রুটে ক্যাবল বিস্তারের
পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা হয়েছে।
তবে
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী
প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লাইসেন্সিং
গাইডলাইনে কনসোর্টিয়ামকে আবেদনের একটি ধরন হিসেবে
উল্লেখ করা হয়েছে এবং
আবেদন করার সময়ই যৌথভাবে
আবেদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পৃথক লাইসেন্স নেওয়ার পর কনসোর্টিয়াম গঠনের
আইনগত ভিত্তি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের
পূর্ণাঙ্গ জবাব বিটিআরসির প্রতিবেদনে
নেই বলে অভিযোগ করা
হয়েছে।
সময়সীমা
শেষ, চালু হয়নি সেবা
লাইসেন্সিং
গাইডলাইনের ২.৪ অনুচ্ছেদ
অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার ৪৮ মাসের মধ্যে
ক্যাবল সিস্টেম স্থাপন ও সেবা চালু
করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সে হিসাবে
সিডিনেট ও সামিটের সময়সীমা
২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর এবং
মেটাকোর সাবকমের সময়সীমা ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ
হয়েছে।
বিটিআরসির
তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কার্যক্রম চালু
করতে পারেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা
গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) ছাড়পত্র না পাওয়া এবং
সমুদ্রে ক্যাবল স্থাপনের অনুকূল মৌসুম না থাকাকে বিলম্বের
কারণ হিসেবে দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ
পরিস্থিতিতে রোল-আউটের সময়সীমা
বাড়ানোর আবেদন করা হয়। এর
পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত
বিটিআরসির ৩১০তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী,
সময় বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চেয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে
চিঠি পাঠানো হয়।
রাজনৈতিক
নির্দেশনার অভিযোগের জবাব নেই
আমার
দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে
২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টার
উপস্থিতিতে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল
লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি রাজনৈতিক নির্দেশনার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বিটিআরসির
জবাবে এ অভিযোগের বিষয়ে
সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানী
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা
হয়, সাবেক তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও
চৌধুরী নাফিজ শরাফতের মালিকানাধীন সিডিনেট লাইসেন্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি আহ্বানের
পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি মূল্যায়নে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে লাইসেন্স পায়।
অন্যদিকে ফাইবার অ্যাট হোমের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান
লাইসেন্স পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা হয়। এসব অভিযোগেরও
জবাব দেয়নি বিটিআরসি।
প্রতিবেদনে
আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, লাইসেন্সিং
গাইডলাইনে প্রতিটি লাইসেন্সধারীর জন্য ন্যূনতম দুটি
ফাইবার পেয়ার থাকার শর্তকে কীভাবে উচ্চতর ক্যাপাসিটির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের
বক্তব্য, সক্ষমতার বিষয়টি দিয়ে ফাইবার পেয়ারসংক্রান্ত
শর্ত পূরণের দাবি করতে হলে
গাইডলাইন সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
এ
ছাড়া গাইডলাইনে পূর্ব ও পশ্চিম—উভয়
দিকে সংযোগের শর্ত থাকার কথা
উল্লেখ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে
বলা হয়, ভবিষ্যতে সংযোগ
সম্প্রসারণের পরিকল্পনা দেখিয়ে বর্তমান পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা দূর করা যায়
কি না, সে প্রশ্নেরও
ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সময়
বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
খাতসংশ্লিষ্টদের
একাংশের মতে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা,
মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও লাইসেন্সিং গাইডলাইন
লঙ্ঘনের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করে সময়
বাড়ানোর অনুমোদন চাওয়া হলে জবাবদিহির প্রশ্ন
থেকে যেতে পারে।
এখন
মূল প্রশ্ন হলো, লাইসেন্স প্রদানে
রাজনৈতিক নির্দেশনার অভিযোগ, বিতর্কিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, কনসোর্টিয়াম গঠনের আইনগত ভিত্তি এবং গাইডলাইনের শর্ত
পালনের বিষয়গুলো তদন্ত করা হবে কি
না। একই সঙ্গে এসব
অভিযোগের নিষ্পত্তির আগে প্রকল্পের সময়সীমা
বাড়ানো হবে কি না,
তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাজনৈতিক নির্দেশনার অভিযোগের জবাব এবং পৃথক লাইসেন্স নেওয়ার পর যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠনের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারীকে ফোন ও বার্তা পাঠানো হয়েছিল। তবে তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।