এনবিআরকে ভয় নয়: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে সরকারকে। তাই রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব ও করদাতাবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) মানুষ যেন ভয় না পেয়ে বিশ্বাস করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।মঙ্গলবার দুপুরে
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন
কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা
বলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন,
‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে
দাঁড়ানোর পালা।’ দেশের মানুষ এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও
বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে
করদাতারা চান, এনবিআর যেন
তাঁদের আস্থার জায়গা হয়। দক্ষ ও
টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই সেই আস্থা অর্জন
করা সম্ভব।তিনি বলেন,
করদাতাদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এনবিআর কর্মকর্তাদের নিতে হবে। বর্তমান
সরকার এনবিআর তথা দেশের রাজস্ব
কাঠামোকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে
বদ্ধপরিকর।অভ্যন্তরীণ আয়ের উৎস বাড়ানোর তাগিদপ্রধানমন্ত্রী বলেন,
আগের সরকার দেশকে ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির
দিকে ঠেলে দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের
মুখে পালিয়েছে। বর্তমান সরকার শুধু বৈদেশিক সহায়তার
ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপাতে
চায় না। তাই অভ্যন্তরীণ
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র ও উৎস বাড়াতে
হবে।এ জন্য
সরকার গণমুখী উৎপাদন নীতি গ্রহণ করেছে
উল্লেখ করে তিনি বলেন,
এতে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন বাড়বে।
মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান
বাড়ার পাশাপাশি জনগণ আরও উন্নত
সরকারি সেবা পাবে। এসব
ক্ষেত্রে এনবিআরের দক্ষ ও কার্যকর
ভূমিকা প্রয়োজন।রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিজ্ঞান বাড়ানোর আহ্বানবিশ্ব অর্থনীতিতে
দ্রুত পরিবর্তন আসছে উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত ধরন এবং নতুন
ব্যবসায়িক মডেলের কারণে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি
নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক
কর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও
পরিবর্তন এসেছে।পরিবর্তিত পরিস্থিতি
মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন
তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল
অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার
প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্য অর্থায়ন, আর্থিক অপরাধ, অর্থ পাচার, কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স
বিষয়ে তাঁদের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।তিনি বলেন,
শুধু প্রচলিত কর আইন জানা
একজন আধুনিক রাজস্ব কর্মকর্তার জন্য যথেষ্ট নয়।
অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে তাঁর
সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হবে।কর দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বপ্রধানমন্ত্রী বলেন,
ভালো রাজস্ব ব্যবস্থায় মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে চাইবেন।
কর প্রদান পদ্ধতি সহজ করার পাশাপাশি
তা দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করতে
হবে। অনলাইনে কর পরিশোধের সুযোগ
থাকলে করদাতার অফিসে আসার প্রয়োজন কমবে।এনবিআর কর্মকর্তাদের
আচরণ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে
করদাতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা গেলে
কর আদায়ও সহজ হবে বলে
মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন,
দেশে কর-জিডিপি অনুপাত
এখনো সক্ষমতার তুলনায় কম এবং করভিত্তিও
তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির বড় একটি অংশ
অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে
হবে। একই সঙ্গে করদাতা
ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর দিতে উৎসাহিত করতে হবেতারেক রহমান
বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য
শুধু বেশি কর আদায়
করা নয়; বরং আরও
বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত
করা। নিয়মিত কর দেওয়া নাগরিককে
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান
জানাতে হবে। অন্যদিকে যারা
ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দিচ্ছেন,
তাঁদেরও যথাযথভাবে কর প্রদানে উৎসাহিত
করতে হবে।একই করদাতার
ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে
রাজস্ব বাড়ানোর নীতি টেকসই নয়
বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বরং
কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের যথাযথ
নিয়মে করের আওতায় আনার
উদ্যোগ নিতে হবে। এ
জন্য ডিজিটাল ও ডেটাভিত্তিক আধুনিক
কর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর
জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।ভ্যাট ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার আহ্বানভ্যাটকে আধুনিক
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস উল্লেখ করে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে এর কার্যকর
বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের
জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য
বাধাগ্রস্ত না হয়, তা
এনবিআরকে নিশ্চিত করতে হবে।তিনি বলেন,
কাস্টমস, ভ্যাট বা আয়কর আদায়কে
শুধু আইন প্রয়োগের বিষয়
হিসেবে দেখলে হবে না। রাজস্ব
ব্যবস্থাপনার সঙ্গে করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক
তৈরি করা জরুরি। দক্ষ
ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এনবিআরকে এমন প্রতিষ্ঠানে পরিণত
করতে হবে, যাকে মানুষ
ভয় নয়, বিশ্বাস করবে।আপনারা পারবেনবক্তব্যের শেষ
পর্যায়ে রাজস্ব আহরণের ইতিবাচক প্রবণতার কথা তুলে ধরেন
প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ
পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ ইতিবাচক ছিল।
এটি প্রমাণ করে, ‘আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন এবং আপনারা অবশ্যই
পারবেন, ইনশাআল্লাহ।’এ জন্য
দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার প্রয়োজন
বলে উল্লেখ করেন তিনি।সমৃদ্ধ বাংলাদেশের
জন্য সবাইকে মিলে শক্তিশালী রাজস্ব
ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান
জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বিনিয়োগ ও
ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রত্যাশা
ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি
‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এর সফলতা কামনা
করেন।