ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

আর্কাইভ

অক্টোবরের ইতিহাস: সুলতান সেলিম থেকে সম্রাট আকবর

অক্টোবরের ইতিহাস: সুলতান সেলিম থেকে সম্রাট আকবর

ইতিহাসের পাতায় অক্টোবর মাসের বিভিন্ন দিনে ঘটে গেছে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোনো দিন জন্ম নিয়েছেন প্রভাবশালী শাসক, কোনো দিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোনো দিন পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রের রাজধানী কিংবা বর্ষপঞ্জিতে। ১০ থেকে ১৫ অক্টোবরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।১০ অক্টোবর: সুলতান প্রথম সেলিমের জন্ম ও ড. আবদুল কাদির খানের মৃত্যু১৪৭০ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের নবম সুলতান প্রথম সেলিম। তিনি ১৫১২ থেকে ১৫২০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। ১৫১৭ সালে মিসর জয়ের মধ্য দিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে আরব ভূখণ্ডের বিস্তার ঘটে। একই সঙ্গে মক্কা ও মদিনার ওপর উসমানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।২০২১ সালের ১০ অক্টোবর মারা যান পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান রূপকার ড. আবদুল কাদির খান। ১৯৩৬ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের ভোপালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পাকিস্তানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই বিজ্ঞানী।১৩ অক্টোবর: ব্যাবিলনের পতন ও তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারাখ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ সালের ১৩ অক্টোবর পারস্যের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দ্বিতীয় সাইরাসের ব্যাবিলন বিজয়ের মধ্য দিয়ে নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। প্রাচীন ব্যাবিলনীয় কালপঞ্জি অনুযায়ী, দিনটি রাজা নাবোনিদাসের শাসনের সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।১৯২৩ সালের ১৩ অক্টোবর তুরস্কের জাতীয় পরিষদের সিদ্ধান্তে আঙ্কারাকে দেশটির নতুন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আঙ্কারা জাতীয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। রাজধানী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নবগঠিত তুর্কি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে শহরটির অবস্থান আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।১৪ অক্টোবর: পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু১৮৮২ সালের ১৪ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের সিমলায় প্রথম সিনেট সভার মধ্য দিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে লাহোরে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে পাকিস্তানের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।১৫ অক্টোবর: গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির সূচনা১৫৮২ সালের ১৫ অক্টোবর ইতালি, স্পেনসহ কয়েকটি ক্যাথলিক অঞ্চলে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির উদ্যোগে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি চালু হয়। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের সঙ্গে বর্ষপঞ্জির অসংগতি দূর করতে জুলীয় বর্ষপঞ্জির সংস্কার করা হয়েছিল। এ সংস্কারের ফলে ১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসে ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের পর সরাসরি ১৫ অক্টোবর শুক্রবার নির্ধারণ করা হয়। মাঝের ১০টি তারিখ বাদ দেওয়া হয়েছিল।১৫ অক্টোবর: সম্রাট আকবরের জন্ম১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর (জন্মতারিখ নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে) মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ওমরকোট দুর্গে সম্রাট হুমায়ুন ও হামিদা বানু বেগমের ঘরে তাঁর জন্ম হয়।১৫৫৬ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর আকবর মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সংহতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।

ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২৮০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বজরা শাহী মসজিদ। দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশার আদলে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭৪১-৪২ সালে জমিদার আমানুল্লাহ প্রায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। ওই দীঘির পশ্চিম প্রান্তে পরে নির্মাণ করা হয় বজরা শাহী মসজিদ।মসজিদটির রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশ তোরণ। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৬ ফুট, প্রস্থ প্রায় ৭৪ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির ভিত্তি মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তিনটি গম্বুজই মার্বেল পাথর দিয়ে সুসজ্জিত।মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতির দরজা। কেবলার দিকে রয়েছে কারুকার্যখচিত তিনটি মিহরাব। প্রবেশপথের তোরণের ওপরও কয়েকটি ছোট গম্বুজ দেখা যায়। এসব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য মসজিদটির ঐতিহাসিক ও নান্দনিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।১৯০৯ সালে প্রথম সংস্কারনির্মাণের প্রায় ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে বজরা শাহী মসজিদ প্রথমবার সংস্কার করা হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে মসজিদটির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পায়।১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা ও দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।মানত ও সিন্নি নিয়ে লোকবিশ্বাসবজরা শাহী মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। লোকমুখে বলা হয়, এখানে কিছু মানত করলে তা পূরণ হয়। এই বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মসজিদে আসেন নামাজ আদায় করতে। কেউ কেউ রোগমুক্তির আশায় এখানে টাকা-পয়সা ও সিন্নি দান করেন।তবে এসব বিশ্বাস মূলত লোকমুখে প্রচলিত। মসজিদটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় এর দীর্ঘ ইতিহাস, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব।কাবা শরিফ থেকে আসা প্রথম ইমামবজরা শাহী মসজিদের সঙ্গে ইমামদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের অনুরোধে সৌদি আরবের পবিত্র কাবা শরিফ থেকে মাওলানা শাহ আবু সিদ্দীক এসে এই মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।এরপর তাঁর বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বজরা শাহী মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে শাহ আবু সিদ্দীক সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দীকি এই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।সংরক্ষণে গুরুত্ববজরা শাহী মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি নোয়াখালীর ইতিহাস, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এর যথাযথ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। লেখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ

ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য

পুরান ঢাকার যে আঙিনায় চার মাস ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই কবির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনা। এর মধ্যে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউরীর একটি আঙিনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে প্রায় চার মাস অবস্থান করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর অবস্থানের স্মৃতি বহন করা ঘরটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।বেচারাম দেউরীর ৫৩-৫৫ নম্বর এলাকার আবদুল্লাহ ওয়াকফ স্টেট-সংলগ্ন এই অংশে রয়েছে সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর মাজার। একই আঙিনায় রয়েছে আবদুল্লাহ জামে মসজিদ এবং মৌলভী আবুল খায়রাত মোহাম্মদ ও মৌলভী আবুয়াল মোজাফফর আবদুল্লাহর পারিবারিক কবরস্থান।স্থানীয় ইতিহাসসংশ্লিষ্ট তথ্য ও গবেষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, কাজী নজরুল ইসলাম এই আঙিনায় অবস্থানকালে এখানকার বাগিচায় বসে বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে ‘বুলবুলি’ ও ‘বিদেশী মন উদাসী’ উল্লেখযোগ্য।নজরুলের অবস্থানের সময় এই এলাকায় একটি সুবিশাল বাগান ছিল। সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর জীবদ্দশায়ও এখানে বড় বাগিচা ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে সেই বাগানের অস্তিত্ব নেই। তবে মাজার, মসজিদ, পারিবারিক কবরস্থান ও নজরুলের অবস্থানের ঘরটি পুরান ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।এই স্থানের সঙ্গে নজরুল পরিবারের একটি সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়। সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর ছোট ছেলে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কয়েকটি গানে সুর দিতেন বলে জানা যায়। নজরুলের জীবনের সঙ্গে পুরান ঢাকার আরও কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসময় তিনি পুরান ঢাকায় নির্বাচনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় উল্লেখ পাওয়া যায়।আবদুল্লাহ জামে মসজিদের ইতিহাসএই আঙিনার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা আবদুল্লাহ জামে মসজিদ। বাংলার ১২৭৬ সনে, অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন।এ আঙিনার সঙ্গে যুক্ত মৌলভী আবুল খায়রাত মোহাম্মদ ও মৌলভী আবুয়াল মোজাফফর আবদুল্লাহর নামও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ১৮ শতকের কাছাকাছি সময়ে আবুল খায়রাত সাহেবের ঢাকা ও সোনারগাঁয়ে জমিদারি ছিল বলে জানা যায়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথাও ইতিহাসচর্চায় উঠে এসেছে।মৌলভী আবদুল্লাহ ছিলেন মৌলভী আবুল খায়রাতের শ্বশুর। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মৌলভী আবদুল্লাহর বাবা আরব দেশ থেকে বাংলায় এসেছিলেন। কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর এলাকার নামকরণের সঙ্গেও তাঁর নামের সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে।সংরক্ষণের দাবিকাজী নজরুল ইসলামের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে বেচারাম দেউরীর এই আঙিনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যে ঘরে কবি প্রায় চার মাস অবস্থান করেছিলেন, সেটি বর্তমানে জরাজীর্ণ। ফলে স্থানটি সংরক্ষণ ও যথাযথভাবে চিহ্নিত করার দাবি রয়েছে ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয়দের মধ্যে।ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এমন স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা গেলে নগরটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জাতীয় কবির জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোও যথাযথ মর্যাদা পাবে।লিখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীমসাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ

পুরান ঢাকার যে আঙিনায় চার মাস ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম

ইছামতীর তীরে দুই শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা। ইছামতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদের রয়েছে দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও সামাজিক ইতিহাস। ব্রিটিশ আমল থেকেই নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল ঝিটকা। কৃষিপণ্য ও মসলার কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হাট-বাজার একসময় এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।এই বাণিজ্যিক জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি। প্রাসাদসদৃশ ভবন, কাঠের ঘর, বড় পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, বাংলো ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নিয়ে একসময় গড়ে উঠেছিল পোদ্দার পরিবারের বিশাল আবাসিক পরিসর। শুধু স্থাপত্য নয়, দেশভাগ, সরকারি অধিগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির নানা স্মৃতিও ধারণ করে আছে এই বাড়ি।ইছামতী ঘিরে ঝিটকার বাণিজ্যঝিটকার ইতিহাসের সঙ্গে ইছামতী নদীর সম্পর্ক গভীর। একসময় এই নদীপথে কৃষিপণ্য ও মসলা পরিবহন করা হতো। ধনে, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। কলকাতার সঙ্গেও ছিল বাণিজ্যিক যোগাযোগ।এই নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করেই ঝিটকা হাট ও বাজারের প্রসার ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর উত্থানের। সেই সময়ের সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর অন্যতম ছিল পোদ্দার পরিবার।ধনের ব্যবসা থেকে প্রাসাদ নির্মাণপ্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে পোদ্দার পরিবারের সদস্যরা ধনের ব্যবসায় বড় পরিসরে যুক্ত হন। যোগেশ্বর মোহন পোদ্দার ও রায়চরণ মোহন পোদ্দারকে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত দুই সহোদর হিসেবে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা নৌপথে ধনে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন।ব্যবসায়িক সাফল্যের ফলে পরিবারটি স্থানীয়ভাবে সম্পদশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে স্থানীয় ঝিকুটিয়া মৌজায় প্রায় সাত একর জমি কেনা হয়। এর মধ্যে ইছামতী নদীর পাশে প্রায় ২ দশমিক ৭৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে মূল প্রাসাদসদৃশ বাড়ি।প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির পূর্ব অংশে যোগেশ্বর মোহন পোদ্দার এবং পশ্চিম অংশে রায়চরণ মোহন পোদ্দার পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সময়ের সঙ্গে পুরো স্থাপনাটি মানুষের কাছে ‘ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।বংশপরিচয়ে কিছুটা ভিন্নতাপোদ্দার পরিবারের বংশপরিচয় নিয়ে স্থানীয় ও প্রকাশিত সূত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় মহারাজ পোদ্দারকে পরিবারের মূল কর্ণধার হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর সন্তান রাম মোহন ও আনন্দ মোহনের কথা বলা হয়েছে। আবার ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আনন্দ মোহন পোদ্দারের দুই সন্তান হিসেবে যোগেশ্বর মোহন ও রায়চরণ মোহনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।দেশভাগের পর পরিবারের কোন শাখা ভারতে চলে যায় এবং কোন শাখা ঝিটকায় থেকে যায়, এ নিয়েও প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য দলিল ছাড়া একটি নির্দিষ্ট বংশতালিকা তৈরি করা কঠিন। তবে বিভিন্ন সূত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশভাগের পর পোদ্দার পরিবারের একটি অংশ ভারতে চলে যায় এবং অন্য একটি অংশের সঙ্গে ঝিটকার সম্পর্ক বজায় থাকে।পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে রথীন্দ্রনাথ পোদ্দারের নামও পাওয়া যায়। একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে রায়চরণ পোদ্দারের নাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।সাত একরের বিস্তৃত আবাসিক পরিসরঝিটকা পোদ্দারবাড়ি মূলত একটি ভবনের নাম নয়। প্রায় সাত একর জমির ওপর গড়ে ওঠা পুরো আবাসিক পরিসরটিতে ছিল একাধিক স্থাপনা। বড় পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, কৃষিজমি, কাঠের ঘর, আধাপাকা ভবন, বাংলো ও প্রাসাদসদৃশ একাধিক ভবন মিলে এটি ছিল একটি বিস্তৃত পারিবারিক কমপ্লেক্স।বাড়ির দক্ষিণ ও উত্তর পাশে বড় পুকুর ছিল বলে বিভিন্ন স্থানীয় বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ দিকের পুকুরের পাড়ে ছিল শানবাঁধানো ঘাট। পূর্ব পাশে ছিল কৃষিজমি। পুরোনো গাছপালা, পুকুর ও স্থাপনাগুলো মিলিয়ে একসময় পুরো এলাকাটি ছিল সবুজ ও নান্দনিক।কাঠের ঘরে বসত বিচার–সালিসপোদ্দারবাড়ির অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপনা একটি বড় চৌচালা কাঠের ঘর। পুকুরের ঘাটের কাছে অবস্থিত এই ঘরের ছাউনি টিনের হলেও চারপাশের দেয়াল কাঠের। রয়েছে কাঠের বারান্দাও।স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় এই ঘরে বিচার–সালিস ও সামাজিক বৈঠক বসত। অর্থাৎ পোদ্দারবাড়ি শুধু একটি পরিবারের আবাসস্থল ছিল না; স্থানীয় সামাজিক জীবনেও এর ভূমিকা ছিল।পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক এই ঘরটি সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এখানে বাল্লা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।তিন প্রাসাদ ও পুরোনো স্থাপত্যকাঠের ঘরের উত্তর দিকে ছিল একটি বড় আধাপাকা স্থাপনা। এর পেছনে ছিল দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্বমুখী তিনটি কারুকার্যখচিত একতলা প্রাসাদ। প্রতিটি প্রাসাদে চার থেকে পাঁচটি বড় কক্ষ ছিল বলে স্থানীয় বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।সময় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব ভবনের অনেকটাই এখন জরাজীর্ণ। দেয়াল ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে পুরোনো কারুকাজ। ফলে একসময়কার জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্য এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও জড়িয়ে আছেঝিটকা পোদ্দারবাড়ির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে এই বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। আগস্ট থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে ক্যাম্প পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।ফলে বাড়িটির গুরুত্ব শুধু পুরোনো স্থাপত্য বা একটি ব্যবসায়ী পরিবারের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।ঘুড়ি উৎসব ও মেলার স্মৃতিএকসময় পোদ্দারবাড়ি ছিল লোকজ সংস্কৃতিরও একটি কেন্দ্র। ১৯৯৮ সাল থেকে রঞ্জন সাহার উদ্যোগে এখানে ঘুড়ি উৎসব ও মেলার আয়োজন করা হতো। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই আয়োজনে অংশ নিতে আসতেন।রঞ্জন সাহা ছিলেন রায়চরণ পোদ্দারের নাতিনের স্বামী। তাঁর উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে এই উৎসব চললেও ২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আয়োজনটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।দেশভাগ ও সরকারি অধিগ্রহণ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পোদ্দার পরিবারের ইতিহাসেও পরিবর্তন আনে। পরিবারের একটি অংশ ভারতে চলে যাওয়ার পর ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভারতে চলে যাওয়া/পরিত্যক্ত অংশের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে বলে প্রকাশিত স্থানীয় তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।১৯৬৭ সালে বাড়ির দক্ষিণ পাশের একটি ঘরে সার্কেল অফিস (রাজস্ব) চালু করা হয়। পরবর্তীকালে সরকারি ব্যবহারের ধারাবাহিকতায় সেখানে ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।একসময় যে স্থাপনা ছিল একটি পরিবারের আবাস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র, তার একটি অংশ এভাবেই সরকারি প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হয়ে যায়।অযত্নে হারাচ্ছে ঐতিহ্যবর্তমানে পোদ্দারবাড়ির সবচেয়ে বড় সংকট অযত্ন ও দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাব। পুরোনো ভবনগুলোর দেয়াল ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কারুকাজ। অনেক স্থাপনা ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে।তবু বাড়িটির পুকুর, পুরোনো গাছপালা, কাঠের ঘর, প্রাসাদসদৃশ ভবন ও খোলা পরিবেশ এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। বিভিন্ন সময় বাড়িটিতে শুটিং ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়েছে।সংরক্ষণে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি সংরক্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। প্রথম ধাপে পুরো স্থাপনার স্থাপত্যগত জরিপ ও নথিভুক্তকরণ করা যেতে পারে। এরপর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পুরোনো ভবন, কাঠের ঘর, পুকুর ও ঘাট সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বাড়িটির সম্পর্ক, পোদ্দার পরিবারের ব্যবসায়িক ইতিহাস এবং ঘুড়ি উৎসবের মতো লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরে একটি তথ্যকেন্দ্র বা ছোট প্রদর্শনীকেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে।স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়িটির পরিত্যক্ত ভবন সংস্কার এবং স্থাপনাটিকে ঘিরে পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।তবে পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি মূল স্থাপনার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।একটি বাড়িতে একটি জনপদের ইতিহাসঝিটকা পোদ্দারবাড়ি শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইছামতী নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য, ধনের ব্যবসা, কলকাতার সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য, একটি ব্যবসায়ী পরিবারের উত্থান, দেশভাগ, সরকারি অধিগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাস।প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনার অনেক কিছুই আজ ক্ষয়প্রাপ্ত। কিন্তু এর পুকুর, কাঠের ঘর, প্রাসাদ, পুরোনো গাছ ও স্থাপত্য এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।সময় থাকতে সংরক্ষণ করা গেলে ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা হিসেবে নয়, মানিকগঞ্জের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে টিকে থাকতে পারে। লেখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ

ইছামতীর তীরে দুই শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি

১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম এলাকার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ১৫৫ বছরের পুরোনো এক স্থাপত্যনিদর্শন-চন্দনপুরা মসজিদ। রঙের বৈচিত্র্য, সূক্ষ্ম কারুকাজ, লতা-পাতার নকশা এবং একাধিক গম্বুজের কারণে দূর থেকেই আলাদা করে চোখে পড়ে মসজিদটি। স্থানীয়ভাবে এটি চন্দনপুরা বড় মসজিদ কিংবা ‘তাজ মসজিদ’ নামেও পরিচিত।নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত এই মসজিদ। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৭০ সালে আব্দুল হামিদ মাস্টার মাটি ও চুন-সুরকির দেয়াল এবং টিনের ছাদ দিয়ে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ছিল নানা ধরনের কারুকাজ।পরবর্তী সময়ে মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেন আব্দুল হামিদ মাস্টারের বংশধর এবং ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ। ১৯৪৬ সালে তিনি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মসজিদের কারিগর ও নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় অংশ ভারত থেকে আনা হয়েছিল। ওই সময় এ কাজে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয় বলে জানা যায়।প্রায় ১৩ শতক জায়গার ওপর দোতলা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। কলকাতা থেকে কারিগর এবং দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রী এনে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৫০ সালে মসজিদের পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করেন।আলো-বাতাসের বিশেষ ব্যবস্থামসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে আলো-বাতাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা। চারপাশের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। দেয়ালের বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থা মসজিদের ভেতরে বাতাস চলাচলও স্বাভাবিক রাখে।মসজিদের বাইরের প্রতিটি অংশে ব্যবহার করা হয়েছে নানা রঙ। দেয়াল, গম্বুজ ও বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদানে লতা-পাতার নকশা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। এসব নকশায় মোগল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট।আছে ১৫টি গম্বুজ, দুটি উঁচু মিনারচন্দনপুরা মসজিদে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে যাওয়ার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়ির বিভিন্ন অংশে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।গম্বুজগুলোর চারপাশে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির নাম লেখা রয়েছে।মসজিদটিতে রয়েছে দুটি উঁচু মিনার। মাইকের প্রচলন না থাকায় একসময় এসব মিনারের ওপর উঠে আজান দেওয়া হতো। মিনার দুটির উচ্চতা প্রায় চারতলা ভবনের সমান বলে জানা যায়। বর্তমানে সেগুলো মসজিদের স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।রুপা ও পিতলের বড় গম্বুজমসজিদের বড় গম্বুজটি একসময় প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতল দিয়ে তৈরি ছিল বলে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া এবং সংস্কারকাজের কারণে এর অনেক কিছু নষ্ট হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।বর্তমানে মসজিদটি প্রায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর রঙ করা হয়। একবার রঙ করার কাজ শেষ করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার করতে দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন হলেও এ ধরনের কারিগর সহজে পাওয়া যায় না। ফলে মসজিদের কিছু পুরোনো স্থাপত্য উপাদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রচন্দনপুরা মসজিদ এখন শুধু মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে মসজিদটির ছবি ব্যবহার করা হয়। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে মসজিদটির পরিচিতি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকেরাও এটি দেখতে আসেন।প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। আশপাশে সময়ের সঙ্গে অনেক নতুন মসজিদ গড়ে উঠলেও চন্দনপুরা মসজিদে মুসল্লির উপস্থিতি কমেনি। বরং নিয়মিতই বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।সাধারণ দিনে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবারে মুসল্লির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদের ভেতরে জায়গা সংকুলান না হলে আশপাশের সড়ক বন্ধ করে সেখানেও নামাজ আদায় করতে হয়।চট্টগ্রামের নগরজীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা চন্দনপুরা মসজিদ তাই ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নগরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।লেখক পরিচিতি মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ।

১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য

ধর্ম, সাহিত্য ও ইতিহাসের স্মৃতিতে গিরিশ চন্দ্র সেন

নরসিংদীর মেহেরপাড়ায় গেলে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে। পাঁচদোনা গ্রামের ড্রিম হলিডে পার্কের সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে পবিত্র কোরআন শরীফের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি। বর্তমানে বাড়িটিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন মিউজিয়াম’।দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বাড়িটি ২০১৬ সালে মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ভারতীয় কমিশনারের অনুদানে সংস্কারের পর এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।পুরোনো কাঠামোয় নতুন করে সংরক্ষণগিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি সংস্কারের সময় ঐতিহ্যবাহী নির্মাণসামগ্রী চুন ও সুরকির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা মূল্যবান কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হয়েছে। বাড়ির অন্দরমহল সাজানো হয়েছে ব্রিটিশ আমলের আসবাব দিয়ে।বাড়ির সামনের অংশে স্থাপন করা হয়েছে গিরিশ চন্দ্র সেনের একটি আবক্ষ মূর্তি। সেখানে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্মের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।বাড়িতে গড়ে তোলা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে গিরিশ চন্দ্র সেনের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র, তাঁর বাস্তুভিটায় পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং তাঁর লেখা বই। এসব নিদর্শন দর্শনার্থীদের তাঁর জীবন, গবেষণা ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়।প্রতি সপ্তাহের রোববার ছাড়া অন্য ছয় দিন জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।সাহিত্যিক, গবেষক ও ভাষাবিদগিরিশ চন্দ্র সেন ১৮৩৪ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, গবেষক ও ভাষাবিদ। ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থ নিয়ে তিনি গবেষণা ও অনুবাদ করেন।ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নেন। কোরআন ও ইসলামি ধর্মীয় গ্রন্থ অনুবাদের কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তাঁকে ‘ভাই’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরে আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন এবং কোরআন-হাদিসের অনুবাদক হিসেবে তিনি ‘মৌলভি’ উপাধিও লাভ করেন।ইতিহাস জানার একটি স্থানগিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি ও জাদুঘর শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি নরসিংদীর ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এখানে সংরক্ষিত বই, ব্যবহার্য সামগ্রী ও প্রত্ননিদর্শন অতীতের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের একটি সংযোগ তৈরি করেছে।১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট গিরিশ চন্দ্র সেন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মভূমিতে গড়ে ওঠা এই জাদুঘর তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।লেখক: মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ

ধর্ম, সাহিত্য ও ইতিহাসের স্মৃতিতে গিরিশ চন্দ্র সেন

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বাদ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।শনিবার বেলা ১১টার পর জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ অভিযোগ করেন।নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে সীমান্ত হত্যার একটি সেগমেন্ট ছিল। সীমান্তে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেসবের স্মৃতি এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’জাদুঘরে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রাম তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ ছিল, তার সঙ্গে ভারত জড়িত ছিল। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে এবং সরকার মনে করছে, এভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা সম্ভব।ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো বা খারাপের বিষয় নয়। সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ।’গণভবন প্রসঙ্গে নাহিদজুলাই স্মৃতি জাদুঘর যে ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই গণভবন সম্পর্কে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই গণভবন থেকেই শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী সব সিদ্ধান্ত নিতেন। মানুষকে লুটপাট, অর্থ লুটপাটসহ সব সিদ্ধান্ত এখান থেকেই নেওয়া হতো।’তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছিল। জাদুঘরটি খুলে দেওয়ার জন্য তারা সংসদে ও সংসদের বাইরে অনেক কথা বলেছেন। এর আগেও তিনি জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছিলেন। নির্বাচনের পর সরকার জাদুঘরে কিছু পরিবর্তন করেছে বলেও জানান তিনি।‘জুলাইয়ের ইতিহাস আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে’জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিগুলো জাদুঘরে আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, সময়ের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অবদানও জাদুঘরে তুলে ধরা প্রয়োজন।জাদুঘরে কেন্দ্রীয় ও পরিচিত ব্যক্তিদের বারবার তুলে ধরা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংসদে বলেছিলাম, এটি স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘর হওয়া উচিত।’জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন- এমন ব্যক্তিদের দিয়ে জাদুঘর পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর যেন দলীয় ইতিহাস চর্চার জায়গা না হয়, জাতীয় ইতিহাস চর্চার জায়গা হয়। প্রকৃত সত্যটাই যেন এখানে আসে এবং সবাই যেন সেটি ধারণ করতে পারে।’এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বাদ