ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য


মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম লেখক

১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য
চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম এলাকার চন্দনপুরা মসজিদ

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম এলাকার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ১৫৫ বছরের পুরোনো এক স্থাপত্যনিদর্শন-চন্দনপুরা মসজিদ। রঙের বৈচিত্র্য, সূক্ষ্ম কারুকাজ, লতা-পাতার নকশা এবং একাধিক গম্বুজের কারণে দূর থেকেই আলাদা করে চোখে পড়ে মসজিদটি। স্থানীয়ভাবে এটি চন্দনপুরা বড় মসজিদ কিংবা ‘তাজ মসজিদ’ নামেও পরিচিত।

নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত এই মসজিদ। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৭০ সালে আব্দুল হামিদ মাস্টার মাটি ও চুন-সুরকির দেয়াল এবং টিনের ছাদ দিয়ে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ছিল নানা ধরনের কারুকাজ।

পরবর্তী সময়ে মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেন আব্দুল হামিদ মাস্টারের বংশধর এবং ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ। ১৯৪৬ সালে তিনি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মসজিদের কারিগর ও নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় অংশ ভারত থেকে আনা হয়েছিল। ওই সময় এ কাজে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয় বলে জানা যায়।

প্রায় ১৩ শতক জায়গার ওপর দোতলা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। কলকাতা থেকে কারিগর এবং দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রী এনে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৫০ সালে মসজিদের পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করেন।

আলো-বাতাসের বিশেষ ব্যবস্থা

মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে আলো-বাতাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা। চারপাশের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। দেয়ালের বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থা মসজিদের ভেতরে বাতাস চলাচলও স্বাভাবিক রাখে।

মসজিদের বাইরের প্রতিটি অংশে ব্যবহার করা হয়েছে নানা রঙ। দেয়াল, গম্বুজ ও বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদানে লতা-পাতার নকশা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। এসব নকশায় মোগল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট।

আছে ১৫টি গম্বুজ, দুটি উঁচু মিনার

চন্দনপুরা মসজিদে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে যাওয়ার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়ির বিভিন্ন অংশে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

গম্বুজগুলোর চারপাশে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির নাম লেখা রয়েছে।

মসজিদটিতে রয়েছে দুটি উঁচু মিনার। মাইকের প্রচলন না থাকায় একসময় এসব মিনারের ওপর উঠে আজান দেওয়া হতো। মিনার দুটির উচ্চতা প্রায় চারতলা ভবনের সমান বলে জানা যায়। বর্তমানে সেগুলো মসজিদের স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।

রুপা ও পিতলের বড় গম্বুজ

মসজিদের বড় গম্বুজটি একসময় প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতল দিয়ে তৈরি ছিল বলে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া এবং সংস্কারকাজের কারণে এর অনেক কিছু নষ্ট হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।

বর্তমানে মসজিদটি প্রায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর রঙ করা হয়। একবার রঙ করার কাজ শেষ করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার করতে দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন হলেও এ ধরনের কারিগর সহজে পাওয়া যায় না। ফলে মসজিদের কিছু পুরোনো স্থাপত্য উপাদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র

চন্দনপুরা মসজিদ এখন শুধু মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে মসজিদটির ছবি ব্যবহার করা হয়। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে মসজিদটির পরিচিতি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকেরাও এটি দেখতে আসেন।

প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। আশপাশে সময়ের সঙ্গে অনেক নতুন মসজিদ গড়ে উঠলেও চন্দনপুরা মসজিদে মুসল্লির উপস্থিতি কমেনি। বরং নিয়মিতই বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সাধারণ দিনে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবারে মুসল্লির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদের ভেতরে জায়গা সংকুলান না হলে আশপাশের সড়ক বন্ধ করে সেখানেও নামাজ আদায় করতে হয়।

চট্টগ্রামের নগরজীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা চন্দনপুরা মসজিদ তাই ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নগরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

লেখক পরিচিতি
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ।

Image

বিষয় : চট্টগ্রাম পর্যটন চন্দনপুরা মসজিদ ঐতিহ্য ইতিহাস মোগল স্থাপত্য

দৈনিক নবকাল

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬


১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম এলাকার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ১৫৫ বছরের পুরোনো এক স্থাপত্যনিদর্শন-চন্দনপুরা মসজিদ। রঙের বৈচিত্র্য, সূক্ষ্ম কারুকাজ, লতা-পাতার নকশা এবং একাধিক গম্বুজের কারণে দূর থেকেই আলাদা করে চোখে পড়ে মসজিদটি। স্থানীয়ভাবে এটি চন্দনপুরা বড় মসজিদ কিংবা ‘তাজ মসজিদ’ নামেও পরিচিত।

নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডের সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কের পশ্চিম পাশে মোগল স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত এই মসজিদ। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৭০ সালে আব্দুল হামিদ মাস্টার মাটি ও চুন-সুরকির দেয়াল এবং টিনের ছাদ দিয়ে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ছিল নানা ধরনের কারুকাজ।

পরবর্তী সময়ে মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেন আব্দুল হামিদ মাস্টারের বংশধর এবং ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ। ১৯৪৬ সালে তিনি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মসজিদের কারিগর ও নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় অংশ ভারত থেকে আনা হয়েছিল। ওই সময় এ কাজে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয় বলে জানা যায়।

প্রায় ১৩ শতক জায়গার ওপর দোতলা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। কলকাতা থেকে কারিগর এবং দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্মাণসামগ্রী এনে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। আবু সৈয়দ দোভাষ ১৯৫০ সালে মসজিদের পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করেন।

আলো-বাতাসের বিশেষ ব্যবস্থা

মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে আলো-বাতাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা। চারপাশের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। দেয়ালের বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থা মসজিদের ভেতরে বাতাস চলাচলও স্বাভাবিক রাখে।

মসজিদের বাইরের প্রতিটি অংশে ব্যবহার করা হয়েছে নানা রঙ। দেয়াল, গম্বুজ ও বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদানে লতা-পাতার নকশা ও সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। এসব নকশায় মোগল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট।

আছে ১৫টি গম্বুজ, দুটি উঁচু মিনার

চন্দনপুরা মসজিদে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে যাওয়ার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। গম্বুজ ও সিঁড়ির বিভিন্ন অংশে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

গম্বুজগুলোর চারপাশে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির নাম লেখা রয়েছে।

মসজিদটিতে রয়েছে দুটি উঁচু মিনার। মাইকের প্রচলন না থাকায় একসময় এসব মিনারের ওপর উঠে আজান দেওয়া হতো। মিনার দুটির উচ্চতা প্রায় চারতলা ভবনের সমান বলে জানা যায়। বর্তমানে সেগুলো মসজিদের স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।

রুপা ও পিতলের বড় গম্বুজ

মসজিদের বড় গম্বুজটি একসময় প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতল দিয়ে তৈরি ছিল বলে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া এবং সংস্কারকাজের কারণে এর অনেক কিছু নষ্ট হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।

বর্তমানে মসজিদটি প্রায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর রঙ করা হয়। একবার রঙ করার কাজ শেষ করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস। পুরোনো স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার করতে দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন হলেও এ ধরনের কারিগর সহজে পাওয়া যায় না। ফলে মসজিদের কিছু পুরোনো স্থাপত্য উপাদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র

চন্দনপুরা মসজিদ এখন শুধু মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে মসজিদটির ছবি ব্যবহার করা হয়। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে মসজিদটির পরিচিতি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকেরাও এটি দেখতে আসেন।

প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। আশপাশে সময়ের সঙ্গে অনেক নতুন মসজিদ গড়ে উঠলেও চন্দনপুরা মসজিদে মুসল্লির উপস্থিতি কমেনি। বরং নিয়মিতই বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সাধারণ দিনে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবারে মুসল্লির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। তখন মসজিদের ভেতরে জায়গা সংকুলান না হলে আশপাশের সড়ক বন্ধ করে সেখানেও নামাজ আদায় করতে হয়।

চট্টগ্রামের নগরজীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা চন্দনপুরা মসজিদ তাই ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নগরের ইতিহাস, স্থাপত্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

লেখক পরিচিতি
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
১৫৫ বছরের পুরোনো চন্দনপুরা মসজিদ, স্থাপত্যের বৈচিত্র্যে আজও অনন্য
0:00 0:00
1.0x