ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য


মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম
মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম লেখক

ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য
নোয়াখালীর ২৮০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বজরা শাহী মসজিদ

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২৮০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বজরা শাহী মসজিদ। দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশার আদলে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ইতিহাস স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭৪১-৪২ সালে জমিদার আমানুল্লাহ প্রায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। ওই দীঘির পশ্চিম প্রান্তে পরে নির্মাণ করা হয় বজরা শাহী মসজিদ।

মসজিদটির রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশ তোরণ। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৬ ফুট, প্রস্থ প্রায় ৭৪ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির ভিত্তি মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তিনটি গম্বুজই মার্বেল পাথর দিয়ে সুসজ্জিত।

মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতির দরজা। কেবলার দিকে রয়েছে কারুকার্যখচিত তিনটি মিহরাব। প্রবেশপথের তোরণের ওপরও কয়েকটি ছোট গম্বুজ দেখা যায়। এসব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য মসজিদটির ঐতিহাসিক নান্দনিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

১৯০৯ সালে প্রথম সংস্কার

নির্মাণের প্রায় ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে বজরা শাহী মসজিদ প্রথমবার সংস্কার করা হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে মসজিদটির সংরক্ষণ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পায়।

১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।

মানত সিন্নি নিয়ে লোকবিশ্বাস

বজরা শাহী মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। লোকমুখে বলা হয়, এখানে কিছু মানত করলে তা পূরণ হয়। এই বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মসজিদে আসেন নামাজ আদায় করতে। কেউ কেউ রোগমুক্তির আশায় এখানে টাকা-পয়সা সিন্নি দান করেন।

তবে এসব বিশ্বাস মূলত লোকমুখে প্রচলিত। মসজিদটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় এর দীর্ঘ ইতিহাস, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব।

কাবা শরিফ থেকে আসা প্রথম ইমাম

বজরা শাহী মসজিদের সঙ্গে ইমামদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের অনুরোধে সৌদি আরবের পবিত্র কাবা শরিফ থেকে মাওলানা শাহ আবু সিদ্দীক এসে এই মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

এরপর তাঁর বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বজরা শাহী মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে শাহ আবু সিদ্দীক সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দীকি এই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংরক্ষণে গুরুত্ব

বজরা শাহী মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি নোয়াখালীর ইতিহাস, স্থাপত্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এর যথাযথ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ

Image

বিষয় : নোয়াখালী সোনাইমুড়ী বজরা শাহী মসজিদ ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা মোগল আমল

দৈনিক নবকাল

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২৮০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বজরা শাহী মসজিদ। দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশার আদলে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ইতিহাস স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭৪১-৪২ সালে জমিদার আমানুল্লাহ প্রায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। ওই দীঘির পশ্চিম প্রান্তে পরে নির্মাণ করা হয় বজরা শাহী মসজিদ।

মসজিদটির রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশ তোরণ। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৬ ফুট, প্রস্থ প্রায় ৭৪ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির ভিত্তি মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তিনটি গম্বুজই মার্বেল পাথর দিয়ে সুসজ্জিত।

মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতির দরজা। কেবলার দিকে রয়েছে কারুকার্যখচিত তিনটি মিহরাব। প্রবেশপথের তোরণের ওপরও কয়েকটি ছোট গম্বুজ দেখা যায়। এসব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য মসজিদটির ঐতিহাসিক নান্দনিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

১৯০৯ সালে প্রথম সংস্কার

নির্মাণের প্রায় ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে বজরা শাহী মসজিদ প্রথমবার সংস্কার করা হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে মসজিদটির সংরক্ষণ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পায়।

১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।

মানত সিন্নি নিয়ে লোকবিশ্বাস

বজরা শাহী মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। লোকমুখে বলা হয়, এখানে কিছু মানত করলে তা পূরণ হয়। এই বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মসজিদে আসেন নামাজ আদায় করতে। কেউ কেউ রোগমুক্তির আশায় এখানে টাকা-পয়সা সিন্নি দান করেন।

তবে এসব বিশ্বাস মূলত লোকমুখে প্রচলিত। মসজিদটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় এর দীর্ঘ ইতিহাস, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব।

কাবা শরিফ থেকে আসা প্রথম ইমাম

বজরা শাহী মসজিদের সঙ্গে ইমামদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের অনুরোধে সৌদি আরবের পবিত্র কাবা শরিফ থেকে মাওলানা শাহ আবু সিদ্দীক এসে এই মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

এরপর তাঁর বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বজরা শাহী মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে শাহ আবু সিদ্দীক সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দীকি এই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংরক্ষণে গুরুত্ব

বজরা শাহী মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি নোয়াখালীর ইতিহাস, স্থাপত্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এর যথাযথ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
ইতিহাসের সাক্ষী বজরা শাহী মসজিদ, ২৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য
0:00 0:00
1.0x