বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণার পর সচিবালয়ে এ আলোচনা আরও বেড়েছে।
আগামী ১৬
আগস্ট বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ
হবে। এর আগে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা, মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে
তাঁদের ভূমিকা মূল্যায়নের কাজ প্রায় শেষ
পর্যায়ে বলে সরকারের একাধিক
সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি,
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজনের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, কয়েকজনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া
এবং নতুন কয়েকজনকে যুক্ত
করার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায়ও কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার আলোচনা চলছে।
কে
পাচ্ছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়?
মির্জা ফখরুলের
পদত্যাগের পর সচিবালয়ে সবচেয়ে
বেশি আলোচনা চলছে স্থানীয় সরকার,
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের
পরবর্তী দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিয়ে।
সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে।
সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী
এ্যানির হাতে দেওয়ার আলোচনা
রয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী জহির
উদ্দিন স্বপনকে নতুন কোনো দায়িত্ব
দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ অন্য সূত্রগুলোর বক্তব্য
ভিন্ন। তাদের দাবি, সালাহউদ্দিন আহমদ আপাতত স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়েই থাকছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
এখনই পরিবর্তন আনতে প্রধানমন্ত্রী ঝুঁকি
নিতে চাইছেন না।
এ ছাড়া
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী
থাকায় মন্ত্রী পরিবর্তনের বিষয়টিও জটিল হয়ে উঠেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের পক্ষ থেকে তাঁর
মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী না রাখার অনুরোধ
রয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।
তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে সরানোর সম্ভাবনা আপাতত কম বলে সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিরা মনে করছেন।
এ পরিস্থিতিতে
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ
হোসেন অথবা ড. আব্দুল
মঈন খানকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান
প্রতিমন্ত্রীকে বহাল রাখা সম্ভব
হতে পারে।
নতুন মন্ত্রী
হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা
রহমানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
১৮০
দিনের কর্মপরিকল্পনা সামনে
সরকার গঠনের
পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা
জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছয় মাস পর
কাজের মূল্যায়ন করা হবে বলেও
তখন জানানো হয়েছিল।
সেই ১৮০
দিনের সময়সীমা সামনে রেখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের
মধ্যে এখন বাড়তি সতর্কতা
তৈরি হয়েছে।
বিশেষ সূত্রের
দাবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিষয়ে
তথ্য সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে
প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের
পাশাপাশি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত
কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, সংসদে উপস্থিতি ও জবাবদিহি এবং
রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
থেকেও বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা
হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
কর্মদক্ষতাই
মূল বিবেচনা
সরকারি সূত্রগুলো
বলছে, সম্ভাব্য রদবদলে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বাস্তব কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী ইশতেহার
বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও মান,
প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর
নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদে জবাবদিহির
বিষয়গুলো মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে।
সরকারের ভাবমূর্তিতে
নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে- এমন বিতর্কও বিবেচনায়
নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রত্যাশিত ফল
না পেলেও কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে
গুরুতর অভিযোগ না থাকলে তাঁকে
সরাসরি বাদ না দিয়ে
সতর্ক করে আরও সময়
দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
একাধিক
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ হতে পারে
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের
অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে
এসেছে এক ব্যক্তির হাতে
একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকা।
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো
জানিয়েছে, বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী একসঙ্গে
দুই বা তিনটি মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত
দায়িত্বের কারণে সব মন্ত্রণালয়ে কাঙ্ক্ষিত
গতি নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে
বলে মনে করা হচ্ছে।
আ ন
ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা
এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্বে আছেন। খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দায়িত্বে রয়েছে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও
পাট মন্ত্রণালয়।
শেখ রবিউল
আলমের হাতে সড়ক পরিবহন
ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
আমিন উর রশিদ ইয়াছিন
কৃষি এবং মৎস্য ও
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়,
ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ডাক,
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়,
আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম
ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ
ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
ডা. এজেডএম
জাহিদ হোসেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
এসব অতিরিক্ত
দায়িত্বের কিছু অংশ ভাগ
করে নতুন মুখকে দায়িত্ব
দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মন্ত্রিসভার আকার
খুব বেশি না বাড়িয়েও
গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব
হবে বলে মনে করা
হচ্ছে।
আলোচনায়
আরও কয়েকজন
সম্ভাব্য রদবদল
নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী
ও প্রতিমন্ত্রীর নামও আলোচনায় রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার
মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী
জহির উদ্দিন স্বপন এবং শিক্ষামন্ত্রী ড.
আ ন ম এহছানুল
হক মিলনকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব
দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে
তাঁদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার
সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
তবে এসব বিষয়ে এখনো
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
ও কৃষি খাতের কয়েকটি
কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
ও কেন্দ্রীয় প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ কারণে
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল
হাসান মাহমুদ টুকুকে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ
মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
সংস্কৃতি ও
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় নিয়েও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে।
টেকনোক্র্যাট
কোটায়ও নতুন মুখ?
বিশেষ সূত্রের
তথ্য অনুযায়ী, টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন
আলমগীর পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং
চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন
আলালকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার আলোচনা রয়েছে।
সরকারের শরিক
ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
আলোচনায় রয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর নামও।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের
একজন সদস্য নাম প্রকাশ না
করার শর্তে বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা
ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ায় ওই মন্ত্রণালয়ে নতুন
কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তবে কে
দায়িত্ব পাবেন, সে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনই কোনো নাম চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।