ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

গবেষণাগার তৈরি হয়নি, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৮৬ জন



গবেষণাগার তৈরি হয়নি, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৮৬ জন
ছবি: সংগ্রহ

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পরিচালিত ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রজেক্ট’ (আইইউপিএইচপিএসপি)–এ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত তিনজন বিশেষজ্ঞের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তের অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করে সংশোধিত টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) তৈরি করা হয়। নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্তত তিনজন ওই টিওআর প্রণয়ন, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং বাছাইপ্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই তাঁদের প্রকল্প কার্যালয়ে কাজ করার তথ্যও সামনে এসেছে।

শুধু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ নয়, ২৮ কোটি ৭২ লাখ টাকার আউটসোর্সিং চুক্তির মাধ্যমে ২৪০ জন কর্মী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬ জনকে একটি প্রস্তাবিত ডেঙ্গু গবেষণাগারের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার নির্মাণকাজের কার্যাদেশ এখনো দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া তিনটি সিটি করপোরেশন ও দুটি পৌরসভার জন্য ৫৪ জন মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণকর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের জনবল চাননি।

বিশেষজ্ঞ নিয়োগে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের চারটি পদে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মহঃ শের আলী এবং হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করা এনামুল হক। তাঁদের পদ যথাক্রমে মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট, এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট ও বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট।

প্রকল্পের ডিপিপি, সংশোধিত টিওআর, শিক্ষাগত সনদ, অভিজ্ঞতার সনদ এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে অন্তত তিনজনের নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তাঁরা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন।

টিওআর অনুযায়ী, মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট পদে সমাজবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, গণিত, ব্যবসায় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন ১৫ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়ন সহযোগী বা সরকার-অর্থায়িত সরকারি খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে সাত বছরের কাজের অভিজ্ঞতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে এমকম ডিগ্রিধারী আমিনুল ইসলামের জমা দেওয়া নথিতে মনিটরিং ও ইভালুয়েশন বিষয়ে কাজের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি এর আগে পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট, সিনিয়র পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট এবং সিনিয়র লোকাল গভর্নমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট পদের জন্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি প্রশাসন, সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার খাতে তিন বছরের অভিজ্ঞতা এবং নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পদে নিয়োগ পাওয়া শের আলী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ করেছেন।

পরিবেশ ও আচরণ পরিবর্তনবিষয়ক পদেও অসংগতি

এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট পদে নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুমোদিত ডিপিপিতে চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিবেশগত দিক নিয়ে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা ছিল। এর মধ্যে পরিবেশগত কর্মপরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর কাজে অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির টিওআরে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ১৫ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়ন সহযোগী বা সরকার-সহায়তাপুষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন।

বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন (বিসিসি) স্পেশালিস্ট পদেও শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। মূল ডিপিপিতে নৃবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, জনসংযোগ বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা এবং জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় বিসিসি ব্যবস্থাপনায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সংশ্লিষ্ট গবেষণায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার শর্তও ছিল।

অন্যদিকে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির টিওআরে সমাজবিজ্ঞান, জনসংযোগ, মনোবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান অথবা অন্য যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সুযোগ রাখা হয়।

এ পদে নিয়োগ পাওয়া এনামুল হক ঢাকা সিটি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিকম এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে এমকম পাস করেছেন। তাঁর জীবনবৃত্তান্তে হিসাবরক্ষক, অর্থ ও প্রশাসন সমন্বয়কারী, ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং স্পেশালিস্ট, ফিন্যান্স ম্যানেজার, আঞ্চলিক অর্থ সমন্বয়কারী এবং ফিন্যান্স অ্যাসোসিয়েট (অডিট) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে। তবে বিসিসি ব্যবস্থাপনা বা সংশ্লিষ্ট গবেষণায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত ২৯ জুন তাঁকে প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞের দায়িত্বও দেওয়া হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিযোগ

প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। ১২ জন বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাঁরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পে যোগ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, আমিনুল ইসলাম, এনামুল হক ও শের আলী টিওআরের খসড়া তৈরি, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং বিশেষজ্ঞ বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক নিয়োগের আগেই তাঁরা প্রকল্প কার্যালয়ে বসে কাজ করতেন এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি তৈরিতে সহায়তা করেন।

প্রকল্পের শুরুর দিকের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে এনামুল হক আমার দেশ-কে বলেন, শের আলী অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় তাঁকে একটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের কথা জানান। পরে পরিকল্পনা বিভাগ থেকে প্রকল্পের ফাইল এনে কাজ করতে বলেন। এনামুলের ভাষ্য, তাঁরা দুজন মিলে টিওআর তৈরি, কমিটি গঠনসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

শের আলীও প্রকল্পটি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আমার দেশ-কে তিনি বলেন, প্রকল্পের ঋণ নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচক দলের সদস্য ছিলেন তিনি। তবে বড় কোনো প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই বলেও জানান। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে তিনি প্রকল্পটির দেখভাল করেছেন এবং বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়েছেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

প্রত্যেকের বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা

প্রকল্পের চার বিশেষজ্ঞ আমিনুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন, শের আলী ও এনামুল হকের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। প্রকল্পে তাঁদের জন্য নির্ধারিত প্রাক্কলিত মাসিক ব্যয় ছিল সাড়ে চার লাখ টাকা।

শীর্ষ ১২ কর্মকর্তার মধ্যে আরও দুজন একই বেতন পান। তাঁরা হলেন ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট এস এম আব্দুল মোত্তালিব এবং পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট ড. শারমিন মিজান।

অভিযোগের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন ও শের আলী আমার দেশ-এর কাছে দাবি করেন, তাঁদের নিয়োগে কোনো সমস্যা নেই। নিজ নিজ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন। এনামুল হকও একই ধরনের দাবি করেন।

নিয়োগের সময় দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের প্রয়োজন বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং তাদের অনুমোদন নিয়ে টিওআর পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে তৈরি করা টিওআর প্রকল্পের প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না।

বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা এখনো অসম্পূর্ণ

প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক জীবনবৃত্তান্ত পরীক্ষা করে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করেছে। তবে বাকি ১১ জন বিশেষজ্ঞের নিয়োগ নিরীক্ষার কথা প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ইমেইলে জানানো হলেও সেই নিরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের চুক্তি ও কেনাকাটার বিষয়েও পরবর্তী পর্যালোচনা করা হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির বিশ্বব্যাংক টাস্ক টিম লিডার ইফফাত মাহমুদ ইমেইলে জানান, প্রকল্পের জনবল নিয়োগের দায়িত্ব বাস্তবায়নকারী সংস্থার। নিয়োগ অবশ্যই সরকারি বিধিবিধান এবং প্রকল্পের সম্মত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে করতে হবে।

তিনি আরও জানান, বড় অঙ্কের চুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের তদারকির আওতায় পূর্বানুমোদনভিত্তিক পর্যালোচনা এবং নমুনাভিত্তিক পরবর্তী পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ বিশ্বব্যাংক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। প্রকল্পে সম্ভাব্য অনিয়ম বা অসদাচরণ সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সিতে জানানো যায়। সংস্থাটি স্বাধীনভাবে ও গোপনীয়তার সঙ্গে এসব অভিযোগ তদন্ত করে।

গবেষণাগার নির্মাণের আগেই ১৮৬ জন নিয়োগ

প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ডেঙ্গুর বাহক মশা নিয়ে গবেষণা করা। এ জন্য ২৮ কোটি ৭২ লাখ টাকার আউটসোর্সিং চুক্তির মাধ্যমে ২৪০ জন কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রেড ৬ থেকে ২০ পর্যন্ত এসব কর্মী সরবরাহের জন্য গত বছরের ২২ জুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, নিয়োগের জন্য নির্ধারিত ২৪০টি পদের মধ্যে ১৮৬টি প্রস্তাবিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র জন্য। বাকি ৫৪ জনের ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও নারায়ণগঞ্জের তারাবো পৌরসভায় মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত থাকার কথা।

এর মধ্যে ১৫৮ জন গত জুলাইয়ে যোগ দিয়েছেন এবং বাকি ৮২ জনের শিগগিরই যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষায়িত কয়েকটি পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের অনেকের মশা নিয়ন্ত্রণ বা বাহক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে।

গবেষণাগার নির্মাণের জন্য ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট দরপত্র প্রকাশ করা হয় এবং ২৭ সেপ্টেম্বর তা খোলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনার জন্যও কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

অথচ নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের দুই বছরের জন্য প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বণ্টন করা হয়েছে। গবেষণাগার চালু হওয়ার আগেই তাঁদের চাকরির মেয়াদের বড় অংশ, এমনকি কারও কারও পুরো মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের জুনে।

চাহিদা ছাড়াই ৫৪ জন নিয়োগ?

মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণের কাজে ৫৪ জন নিয়োগের বিষয়ে একাধিক সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই জনবল তাঁদের প্রয়োজন ছিল না। তাঁদের ভাষ্য, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতার অভাবও কর্মীদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২৪০ জন কর্মী নিয়োগের দরপত্র আহ্বান ও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান। বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, টিএমসিও ভবনের উল্লম্ব সম্প্রসারণের জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) তৈরি এবং নতুন করে ব্যয় প্রাক্কলন করতে সময় লেগেছে। ভবনের কাঠামোগত নথি সংগ্রহ, বিশ্বব্যাংকের আপত্তির পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রকল্পের শতাধিক ইকোনমিক কোডে ভুল থাকায় পুরো ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছিল।

হাফিজুল্লাহ খানের দাবি, গবেষণাগারের কর্মীরা বর্তমানে আইসিটি দলের সঙ্গে যন্ত্রপাতি প্রস্তুতের কাজ করছেন। ভবন নির্মাণের দরপত্র খোলার কাজ শেষ হয়েছে; মূল নির্মাণকাজ শুরু হলে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ২৪০ জন কর্মীকে সবাইকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়নি; তাঁদের একটি অংশকে তিনটি সিটি করপোরেশন ও দুটি পৌরসভায় পদায়ন করা হয়েছে। শতাধিক কর্মীর একটি অংশকে প্রশিক্ষণ শেষে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ নিয়োগের যোগ্যতা, টিওআর পরিবর্তন, বাছাইপ্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং গবেষণাগার চালুর আগেই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নথির স্বচ্ছ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটির নিয়োগ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

বিষয় : জনস্বাস্থ্য স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বিশ্বব্যাংক নিয়োগ অনিয়ম বিশ্বব্যাংক

দৈনিক নবকাল

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


গবেষণাগার তৈরি হয়নি, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৮৬ জন

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পরিচালিত ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রজেক্ট’ (আইইউপিএইচপিএসপি)–এ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত তিনজন বিশেষজ্ঞের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তের অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করে সংশোধিত টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) তৈরি করা হয়। নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্তত তিনজন ওই টিওআর প্রণয়ন, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং বাছাইপ্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই তাঁদের প্রকল্প কার্যালয়ে কাজ করার তথ্যও সামনে এসেছে।

শুধু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ নয়, ২৮ কোটি ৭২ লাখ টাকার আউটসোর্সিং চুক্তির মাধ্যমে ২৪০ জন কর্মী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬ জনকে একটি প্রস্তাবিত ডেঙ্গু গবেষণাগারের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার নির্মাণকাজের কার্যাদেশ এখনো দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া তিনটি সিটি করপোরেশন ও দুটি পৌরসভার জন্য ৫৪ জন মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণকর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের জনবল চাননি।

বিশেষজ্ঞ নিয়োগে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের চারটি পদে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মহঃ শের আলী এবং হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করা এনামুল হক। তাঁদের পদ যথাক্রমে মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট, এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট ও বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট।

প্রকল্পের ডিপিপি, সংশোধিত টিওআর, শিক্ষাগত সনদ, অভিজ্ঞতার সনদ এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে অন্তত তিনজনের নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তাঁরা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন।

টিওআর অনুযায়ী, মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট পদে সমাজবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, গণিত, ব্যবসায় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন ১৫ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়ন সহযোগী বা সরকার-অর্থায়িত সরকারি খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে সাত বছরের কাজের অভিজ্ঞতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে এমকম ডিগ্রিধারী আমিনুল ইসলামের জমা দেওয়া নথিতে মনিটরিং ও ইভালুয়েশন বিষয়ে কাজের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি এর আগে পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট, সিনিয়র পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট এবং সিনিয়র লোকাল গভর্নমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট পদের জন্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি প্রশাসন, সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার খাতে তিন বছরের অভিজ্ঞতা এবং নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পদে নিয়োগ পাওয়া শের আলী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ করেছেন।

পরিবেশ ও আচরণ পরিবর্তনবিষয়ক পদেও অসংগতি

এনভায়রনমেন্ট স্পেশালিস্ট পদে নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুমোদিত ডিপিপিতে চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিবেশগত দিক নিয়ে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা ছিল। এর মধ্যে পরিবেশগত কর্মপরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর কাজে অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির টিওআরে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ১৫ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং উন্নয়ন সহযোগী বা সরকার-সহায়তাপুষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন।

বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন (বিসিসি) স্পেশালিস্ট পদেও শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। মূল ডিপিপিতে নৃবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, জনসংযোগ বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা এবং জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় বিসিসি ব্যবস্থাপনায় ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সংশ্লিষ্ট গবেষণায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার শর্তও ছিল।

অন্যদিকে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির টিওআরে সমাজবিজ্ঞান, জনসংযোগ, মনোবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান অথবা অন্য যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সুযোগ রাখা হয়।

এ পদে নিয়োগ পাওয়া এনামুল হক ঢাকা সিটি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিকম এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে এমকম পাস করেছেন। তাঁর জীবনবৃত্তান্তে হিসাবরক্ষক, অর্থ ও প্রশাসন সমন্বয়কারী, ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং স্পেশালিস্ট, ফিন্যান্স ম্যানেজার, আঞ্চলিক অর্থ সমন্বয়কারী এবং ফিন্যান্স অ্যাসোসিয়েট (অডিট) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে। তবে বিসিসি ব্যবস্থাপনা বা সংশ্লিষ্ট গবেষণায় ১০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত ২৯ জুন তাঁকে প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞের দায়িত্বও দেওয়া হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিযোগ

প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। ১২ জন বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাঁরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পে যোগ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, আমিনুল ইসলাম, এনামুল হক ও শের আলী টিওআরের খসড়া তৈরি, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং বিশেষজ্ঞ বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক নিয়োগের আগেই তাঁরা প্রকল্প কার্যালয়ে বসে কাজ করতেন এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি তৈরিতে সহায়তা করেন।

প্রকল্পের শুরুর দিকের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে এনামুল হক আমার দেশ-কে বলেন, শের আলী অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় তাঁকে একটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের কথা জানান। পরে পরিকল্পনা বিভাগ থেকে প্রকল্পের ফাইল এনে কাজ করতে বলেন। এনামুলের ভাষ্য, তাঁরা দুজন মিলে টিওআর তৈরি, কমিটি গঠনসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

শের আলীও প্রকল্পটি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আমার দেশ-কে তিনি বলেন, প্রকল্পের ঋণ নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচক দলের সদস্য ছিলেন তিনি। তবে বড় কোনো প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই বলেও জানান। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে তিনি প্রকল্পটির দেখভাল করেছেন এবং বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়েছেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

প্রত্যেকের বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা

প্রকল্পের চার বিশেষজ্ঞ আমিনুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন, শের আলী ও এনামুল হকের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। প্রকল্পে তাঁদের জন্য নির্ধারিত প্রাক্কলিত মাসিক ব্যয় ছিল সাড়ে চার লাখ টাকা।

শীর্ষ ১২ কর্মকর্তার মধ্যে আরও দুজন একই বেতন পান। তাঁরা হলেন ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট এস এম আব্দুল মোত্তালিব এবং পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট ড. শারমিন মিজান।

অভিযোগের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন ও শের আলী আমার দেশ-এর কাছে দাবি করেন, তাঁদের নিয়োগে কোনো সমস্যা নেই। নিজ নিজ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন। এনামুল হকও একই ধরনের দাবি করেন।

নিয়োগের সময় দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের প্রয়োজন বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং তাদের অনুমোদন নিয়ে টিওআর পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে তৈরি করা টিওআর প্রকল্পের প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না।

বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা এখনো অসম্পূর্ণ

প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক জীবনবৃত্তান্ত পরীক্ষা করে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করেছে। তবে বাকি ১১ জন বিশেষজ্ঞের নিয়োগ নিরীক্ষার কথা প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ইমেইলে জানানো হলেও সেই নিরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের চুক্তি ও কেনাকাটার বিষয়েও পরবর্তী পর্যালোচনা করা হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির বিশ্বব্যাংক টাস্ক টিম লিডার ইফফাত মাহমুদ ইমেইলে জানান, প্রকল্পের জনবল নিয়োগের দায়িত্ব বাস্তবায়নকারী সংস্থার। নিয়োগ অবশ্যই সরকারি বিধিবিধান এবং প্রকল্পের সম্মত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে করতে হবে।

তিনি আরও জানান, বড় অঙ্কের চুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের তদারকির আওতায় পূর্বানুমোদনভিত্তিক পর্যালোচনা এবং নমুনাভিত্তিক পরবর্তী পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগ বিশ্বব্যাংক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। প্রকল্পে সম্ভাব্য অনিয়ম বা অসদাচরণ সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা বিশ্বব্যাংকের ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সিতে জানানো যায়। সংস্থাটি স্বাধীনভাবে ও গোপনীয়তার সঙ্গে এসব অভিযোগ তদন্ত করে।

গবেষণাগার নির্মাণের আগেই ১৮৬ জন নিয়োগ

প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ডেঙ্গুর বাহক মশা নিয়ে গবেষণা করা। এ জন্য ২৮ কোটি ৭২ লাখ টাকার আউটসোর্সিং চুক্তির মাধ্যমে ২৪০ জন কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রেড ৬ থেকে ২০ পর্যন্ত এসব কর্মী সরবরাহের জন্য গত বছরের ২২ জুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, নিয়োগের জন্য নির্ধারিত ২৪০টি পদের মধ্যে ১৮৬টি প্রস্তাবিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র জন্য। বাকি ৫৪ জনের ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও নারায়ণগঞ্জের তারাবো পৌরসভায় মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত থাকার কথা।

এর মধ্যে ১৫৮ জন গত জুলাইয়ে যোগ দিয়েছেন এবং বাকি ৮২ জনের শিগগিরই যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষায়িত কয়েকটি পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের অনেকের মশা নিয়ন্ত্রণ বা বাহক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে।

গবেষণাগার নির্মাণের জন্য ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট দরপত্র প্রকাশ করা হয় এবং ২৭ সেপ্টেম্বর তা খোলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনার জন্যও কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

অথচ নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের দুই বছরের জন্য প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বণ্টন করা হয়েছে। গবেষণাগার চালু হওয়ার আগেই তাঁদের চাকরির মেয়াদের বড় অংশ, এমনকি কারও কারও পুরো মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের জুনে।

চাহিদা ছাড়াই ৫৪ জন নিয়োগ?

মশা ও বাহক নিয়ন্ত্রণের কাজে ৫৪ জন নিয়োগের বিষয়ে একাধিক সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই জনবল তাঁদের প্রয়োজন ছিল না। তাঁদের ভাষ্য, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতার অভাবও কর্মীদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২৪০ জন কর্মী নিয়োগের দরপত্র আহ্বান ও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান। বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, টিএমসিও ভবনের উল্লম্ব সম্প্রসারণের জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) তৈরি এবং নতুন করে ব্যয় প্রাক্কলন করতে সময় লেগেছে। ভবনের কাঠামোগত নথি সংগ্রহ, বিশ্বব্যাংকের আপত্তির পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রকল্পের শতাধিক ইকোনমিক কোডে ভুল থাকায় পুরো ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছিল।

হাফিজুল্লাহ খানের দাবি, গবেষণাগারের কর্মীরা বর্তমানে আইসিটি দলের সঙ্গে যন্ত্রপাতি প্রস্তুতের কাজ করছেন। ভবন নির্মাণের দরপত্র খোলার কাজ শেষ হয়েছে; মূল নির্মাণকাজ শুরু হলে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ২৪০ জন কর্মীকে সবাইকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়নি; তাঁদের একটি অংশকে তিনটি সিটি করপোরেশন ও দুটি পৌরসভায় পদায়ন করা হয়েছে। শতাধিক কর্মীর একটি অংশকে প্রশিক্ষণ শেষে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ নিয়োগের যোগ্যতা, টিওআর পরিবর্তন, বাছাইপ্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং গবেষণাগার চালুর আগেই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নথির স্বচ্ছ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটির নিয়োগ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
গবেষণাগার তৈরি হয়নি, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৮৬ জন
0:00 0:00
1.0x