ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

বি-স্ট্রং প্রকল্পে ১৩১ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ, অস্বীকার পরিচালকের



 বি-স্ট্রং প্রকল্পে ১৩১ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ, অস্বীকার পরিচালকের
ছবি: সংগ্রহ

বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্পের (বি-স্ট্রং) কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার ও তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনা, ভুয়া বিল তৈরি, সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। প্রকল্প পরিচালকের আত্মীয়স্বজন, পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে পণ্য ও সরঞ্জাম কেনার অভিযোগও রয়েছে। নিরপেক্ষ ঠিকাদারেরা কাজ পেলেও কমিশন না দিলে তাঁদের বিল আটকে রাখা কিংবা দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রতিবেদকের হাতে আসা কিছু নথি পর্যালোচনা করে কেনাকাটা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং অর্থ পরিশোধের কাগজপত্র যাচাই করলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

নিরাপত্তার কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কেউ নাম প্রকাশ করে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।

বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনার অভিযোগ

বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), আসবাব, কম্পিউটার, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান থাকার অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব পণ্য কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, একই ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়মিত কেনাকাটার বিল-ভাউচার পরীক্ষা করে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প কার্যালয়ে আবাসিক ব্যবস্থার অভিযোগ

রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত বি-স্ট্রং প্রকল্প কার্যালয়ের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে সেখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা দেখা গেছে। কার্যালয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও পানি গরম করার জন্য ওয়াটার হিটার ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থে অফিসের বাথরুম সংস্কার করে উন্নতমানের ঝরনা স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালকের অফিসকক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, খাওয়াদাওয়া ও গোসলসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ করা হয়। এতে দাপ্তরিক কক্ষটি কার্যত আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, বিদ্যুৎ বিল ও অফিস ব্যবহারের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ

প্রকল্পের তিনটি মাইক্রোবাসের মধ্যে একটি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও অন্যগুলো প্রকল্প পরিচালকের স্বামী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গাড়ির লগবুকে দাপ্তরিক সফরের তথ্য থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

একই সঙ্গে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি ভ্রমণ ভাতা (টিএ-ডিএ) উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি বিল তৈরি এবং সেসব বিল অনুমোদনের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট সময়ের ভ্রমণসূচি, অফিস আদেশ, গাড়ির লগবুক ও জ্বালানি বিল পরীক্ষা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা যন্ত্রপাতির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো বা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ কৃষকদের হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যন্ত্রপাতির নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল, গ্রহণের সনদ এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

শ্রমিকের বেতন ও পরামর্শক নিয়োগে প্রশ্ন

প্রকল্পের অনিয়মিত শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আগা আজাহারুল ইসলামের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক মূল্যায়নে নির্ধারিত নম্বরের ভিত্তিতে পিছিয়ে থাকলেও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ অস্বীকার প্রকল্প পরিচালকের

অভিযোগের বিষয়ে বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন আমার দেশকে বলেন, “আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি অফিসটা সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য। ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে কাজ করি না। প্রকল্প কীভাবে ভালোভাবে চলবে, সেদিকেই সবার ধ্যান-জ্ঞান।”

ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর ভালো দক্ষতা রয়েছে। তাই অনিয়ম করার সুযোগ নেই। দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ঠিকাদারকে তিনি চেনেন না। প্রকল্পের কোনো কিছুই তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা পরিবারের সুবিধার জন্য ব্যবহার করেন না বলেও দাবি করেন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার, সরকারি গাড়ি ও জ্বালানির ব্যবহার, ভ্রমণ ভাতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, গত কয়েক বছরের দরপত্রের নথি, ক্রয়াদেশ, অর্থ পরিশোধের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ির লগবুক এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের তথ্য নিরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, প্রত্যেকটি প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অসংগতি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিন বছর মেয়াদি বি-স্ট্রং প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের জুনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অংশে এ প্রকল্পের বরাদ্দ ১৩১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জানা গেছে, প্রকল্পটির অগ্রগতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির চেয়ে কম।

বিষয় : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বি-স্ট্রং প্রকল্প প্রকল্পে অনিয়ম সরকারি কেনাকাটা

দৈনিক নবকাল

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


বি-স্ট্রং প্রকল্পে ১৩১ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ, অস্বীকার পরিচালকের

প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্পের (বি-স্ট্রং) কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার ও তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনা, ভুয়া বিল তৈরি, সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। প্রকল্প পরিচালকের আত্মীয়স্বজন, পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে পণ্য ও সরঞ্জাম কেনার অভিযোগও রয়েছে। নিরপেক্ষ ঠিকাদারেরা কাজ পেলেও কমিশন না দিলে তাঁদের বিল আটকে রাখা কিংবা দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রতিবেদকের হাতে আসা কিছু নথি পর্যালোচনা করে কেনাকাটা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং অর্থ পরিশোধের কাগজপত্র যাচাই করলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

নিরাপত্তার কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কেউ নাম প্রকাশ করে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।

বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনার অভিযোগ

বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), আসবাব, কম্পিউটার, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান থাকার অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব পণ্য কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, একই ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়মিত কেনাকাটার বিল-ভাউচার পরীক্ষা করে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্প কার্যালয়ে আবাসিক ব্যবস্থার অভিযোগ

রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত বি-স্ট্রং প্রকল্প কার্যালয়ের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে সেখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা দেখা গেছে। কার্যালয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও পানি গরম করার জন্য ওয়াটার হিটার ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থে অফিসের বাথরুম সংস্কার করে উন্নতমানের ঝরনা স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালকের অফিসকক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, খাওয়াদাওয়া ও গোসলসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ করা হয়। এতে দাপ্তরিক কক্ষটি কার্যত আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, বিদ্যুৎ বিল ও অফিস ব্যবহারের নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ

প্রকল্পের তিনটি মাইক্রোবাসের মধ্যে একটি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও অন্যগুলো প্রকল্প পরিচালকের স্বামী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গাড়ির লগবুকে দাপ্তরিক সফরের তথ্য থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

একই সঙ্গে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি ভ্রমণ ভাতা (টিএ-ডিএ) উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি বিল তৈরি এবং সেসব বিল অনুমোদনের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট সময়ের ভ্রমণসূচি, অফিস আদেশ, গাড়ির লগবুক ও জ্বালানি বিল পরীক্ষা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা যন্ত্রপাতির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো বা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ কৃষকদের হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যন্ত্রপাতির নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল, গ্রহণের সনদ এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

শ্রমিকের বেতন ও পরামর্শক নিয়োগে প্রশ্ন

প্রকল্পের অনিয়মিত শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আগা আজাহারুল ইসলামের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক মূল্যায়নে নির্ধারিত নম্বরের ভিত্তিতে পিছিয়ে থাকলেও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ অস্বীকার প্রকল্প পরিচালকের

অভিযোগের বিষয়ে বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন আমার দেশকে বলেন, “আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি অফিসটা সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য। ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে কাজ করি না। প্রকল্প কীভাবে ভালোভাবে চলবে, সেদিকেই সবার ধ্যান-জ্ঞান।”

ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর ভালো দক্ষতা রয়েছে। তাই অনিয়ম করার সুযোগ নেই। দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ঠিকাদারকে তিনি চেনেন না। প্রকল্পের কোনো কিছুই তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা পরিবারের সুবিধার জন্য ব্যবহার করেন না বলেও দাবি করেন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার, সরকারি গাড়ি ও জ্বালানির ব্যবহার, ভ্রমণ ভাতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, গত কয়েক বছরের দরপত্রের নথি, ক্রয়াদেশ, অর্থ পরিশোধের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ির লগবুক এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের তথ্য নিরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, প্রত্যেকটি প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অসংগতি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিন বছর মেয়াদি বি-স্ট্রং প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের জুনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অংশে এ প্রকল্পের বরাদ্দ ১৩১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জানা গেছে, প্রকল্পটির অগ্রগতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির চেয়ে কম।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
বি-স্ট্রং প্রকল্পে ১৩১ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ, অস্বীকার পরিচালকের
0:00 0:00
1.0x