ঢাকা    সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা ইসরাইলের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা ইসরাইলের

ইসরাইলের পক্ষে প্রচারণা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রে অস্তিত্বহীন একটি থিংক ট্যাংকের নামে বিপুল পরিমাণ লেখা প্রকাশ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অস্তিত্ব, কার্যালয় কিংবা পরিচিত কর্মীর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মাত্র নয় দিনে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ১২৪টি প্রতিবেদন। ৬ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের মোট শব্দসংখ্যা ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।এর মধ্যে ১২ ও ১৩ আগস্ট মাত্র দুই দিনে প্রকাশ করা হয় প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার শব্দের ৭৩টি প্রতিবেদন।গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রতিবেদনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সেগুলোকে একটি নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ হিসেবে মনে হয়। মূল লক্ষ্য ছিল এআই চ্যাটবটে ব্যবহারকারীদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরের ক্ষেত্রে এসব কনটেন্টকে সামনে আনা।এসব প্রতিবেদনে এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—ইসরাইল কি গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে, ইসরাইল কি ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে এবং ইহুদিবাদের বিরোধিতা কি ইহুদিবিদ্বেষের সমান?তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রতিবেদনের ভাষা ও তথ্য উপস্থাপনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে দুর্বল করার প্রবণতা ছিল।গার্ডিয়ানের হিসাবে, ১২৪টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০টিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যা বা বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ তুলে ধরে বলা হয়েছে, কোনো আদালত এখনো এসব বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়নি।অন্যদিকে, ৫৫টি প্রতিবেদনে গাজায় হতাহত ও ত্রাণ পরিস্থিতির পরিসংখ্যানকে ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত একটি পক্ষের’ তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন—এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।পেছনে ইসরাইলের হয়ে কাজ করা মার্কিন প্রতিষ্ঠানওয়েবসাইটটির সঙ্গে নিউইয়র্কভিত্তিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পাইরো ইনকের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। মার্কিন আইনের ‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ (এফএআরএ)-এর আওতায় পাইরো ইসরাইল সরকারের হয়ে কাজ করার বিষয়টি নথিভুক্ত করেছে।নথি অনুযায়ী, এ কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১০ লাখ ডলারের একটি চুক্তিতে যুক্ত ছিল।অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন হ্যানোভার ইনস্টিটিউটকে ঘিরে এই কার্যক্রম ইসরাইলের বৃহত্তর অনলাইন প্রচারণার অংশ। মার্কিন নথিতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এই ধরনের প্রচারণায় কোটি কোটি ডলার ব্যয়ের তথ্যও উঠে এসেছে।এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এমন ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট তৈরি করা, যেগুলো এআই সার্চ ও চ্যাটবটের উত্তরে উদ্ধৃত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।এআই প্রচারণায় নতুন কৌশলপ্রযুক্তি খাতে এ ধরনের কৌশলকে ‘জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ বা জিইও বলা হচ্ছে। সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে কোনো ওয়েবসাইটের অবস্থান ওপরে তোলার বদলে এ কৌশলের লক্ষ্য হলো চ্যাটজিপিটি, ক্লদ, জেমিনি কিংবা পারপ্লেক্সিটির মতো এআই সিস্টেমের উত্তরে নির্দিষ্ট তথ্য বা বয়ানকে বেশি দৃশ্যমান করা।গবেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের কনটেন্ট ভবিষ্যতে এআই মডেলের প্রশিক্ষণ-তথ্যের ভান্ডারে যুক্ত হলে এর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।তবে এই প্রচারণা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গার্ডিয়ানের পরীক্ষায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো ইতিমধ্যে হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সতর্কতা দেখাতে শুরু করেছে। অর্থাৎ এসব প্রচারণামূলক কনটেন্ট এআইয়ের উত্তরে প্রভাব ফেললেও, কনটেন্টের উৎস নিয়ে সন্দেহের বিষয়টিও সামনে আসছে।যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনমতেও পরিবর্তনএদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও বিভিন্ন জরিপে পাওয়া গেছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্যালাপের এক জরিপে প্রথমবারের মতো ইসরাইলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখানোর কথা জানান আমেরিকানরা।এপ্রিলের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন।তবে ইসরাইলি সরকার যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ‘প্রভাব বিস্তার অভিযান’ চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাইরোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল রোজেনবার্গও বলেছেন, তাদের কাজ ছিল ইসরাইল সম্পর্কে ‘সঠিক ও তথ্যসূত্রসমৃদ্ধ’ তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং ভুল তথ্যের মোকাবিলা করা।বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা এআইয়ের যুগে তথ্যযুদ্ধের নতুন একটি দিক সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি এখন এআই চ্যাটবটের তথ্যভান্ডার ও উত্তরের কাঠামোকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে।ফলে এআই থেকে পাওয়া তথ্যের উৎস, নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কাজের গতি বাড়াতে এর ব্যবহার হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ায় মিস-ইনফরমেশন ও ডিপফেক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তিবিদদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এআইয়ের অপব্যবহার সাইবার অপরাধ আরও জটিল করে তুলতে পারে।প্রযুক্তিবিদদের মতে, এআই ব্যবহার করে এমন ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয় যে সেগুলো ভুয়া। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ডেটা নিরাপত্তা এবং এআই মডেলের পক্ষপাত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভুয়া তথ্য ও ডিপফেক। এগুলো মোকাবিলায় মানুষের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।এখনো হয়নি এআই নীতিমালাদেশে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা প্রণয়ন হয়নি। সরকার জানিয়েছে, এআই নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে এবং এ ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।গত ৭ জুলাই আইসিটি টাওয়ারে টেলিকম বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের কাছে এআই নীতিমালা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে এবং শিগগির নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এআই যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে, তেমনি এর অপব্যবহারও নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ও জনমত প্রভাবিত করার কাজে এআই ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ভুয়া ভিডিওসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে অনেকেই সেগুলোকে বাস্তব ঘটনা মনে করছেন। বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ও তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা হলেও প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মানুষ তা করতে পারছেন না।সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শেখ হাসিনাকে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যৌথ সংবাদ সম্মেলন করতে দেখা যায়। পরে ভিডিওটি ভুয়া বলে জানা যায়।তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে বাংলাদেশে ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে এআই দিয়ে তৈরি প্রায় এক হাজার ভুয়া ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এসব ভিডিও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।রাজনৈতিক কনটেন্টেও অপব্যবহারের অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এআইয়ের অপব্যবহার শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই আলোচনার বিষয়। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নির্বাচনী জনমত প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্র ‘Preparing for Artificial Intelligence and Other Challenges to Election Administration’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদপ্রযুক্তিবিদদের মতে, এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে অনেক কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। ফলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এআই নীতিমালা তৈরির জন্য সরকার একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ইউনেস্কোর পরামর্শ নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে।

এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ