ঢাকা    রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই অভ্যুত্থান দমনে নির্যাতন, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি রোববার সকালে প্রকাশ করা হয়েছে।রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে প্রসিকিউশন। এর আগে গত ৫ জুলাই বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।যে তিন অভিযোগে সাজা৩ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী রাইসুল হকসহ ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন ও আহত করার দায়ে ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।৬ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও দুষ্কর্মে সংযোগের দায়ে তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।৭ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁকে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।রায়ে বলা হয়েছে, ইনুর ওপর আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলবে। ফলে সব মিলিয়ে তাঁকে ১০ বছর কারাগারে থাকতে হবে।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, এ রায়ের বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।আট অভিযোগের বিবরণইনুর বিরুদ্ধে ৩৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। এতে ২০ জনকে সাক্ষী করা হয়।প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ১৮ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাও’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে বল প্রয়োগের উসকানি এবং মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন ইনু।দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় সারা দেশে সেনা মোতায়েন, কারফিউ জারি এবং ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন ও হত্যার নির্দেশ দেন তিনি।চতুর্থ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার মাধ্যমে হত্যার পরিকল্পনায় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়।পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ২৭ জুলাই ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন ইনু।ষষ্ঠ অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।সপ্তম অভিযোগে ৪ আগস্ট আন্দোলনকারীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে কারফিউ জারি, গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় ইনুর নির্দেশে ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।তবে রায়ে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়েছে।দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়াপ্রসিকিউশনের তদন্ত দল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১১ সেপ্টেম্বর এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। শুনানি শেষে ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর কৌঁসুলি আব্দুস সোবহান তরফদারের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষী হিসেবে মেহেরপুরের বাসিন্দা রাইসুল হকের জবানবন্দি নেওয়া হয়।বিচার চলাকালে প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। আসামিপক্ষের দুজন সাফাই সাক্ষীও সাক্ষ্য দেন। মামলায় ২০ সিরিজের নথি ও পাঁচটি বস্তুগত আলামত উপস্থাপন করা হয়।গত ১১ মার্চ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য দেন ইনু। সেখানে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও বানোয়াট বলে দাবি করেন।২ এপ্রিল তাঁর পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল। এরপর আসামিপক্ষ টানা নয় দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ৬ মে ইনুর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তিতর্ক শেষ করে খালাস দাবি করেন। ১৪ মে প্রসিকিউশনও যুক্তিতর্ক শেষ করে। পরে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক জীবন২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসা থেকে হাসানুল হক ইনুকে আটক করা হয়। শুরুতে নিউ মার্কেট থানায় করা একটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্যে ২১ আগস্ট কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার দেখানো মামলার সংখ্যা ৮৭টি। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনেও তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্ম নেওয়া হাসানুল হক ইনু ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।