ঢাকা    বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
জুলাইয়ের গণহত্যা মামলা: ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাইয়ের গণহত্যা মামলা: ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই আন্দোলন ঘিরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে তাঁদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাইয়ে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়। তাঁদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড, প্রতিটি কথোপকথনের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সহায়ক প্রমাণও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। তাঁর দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।এর আগে ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনগত যুক্তিতে সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম দাবি করেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ ওবায়দুল কাদের দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে তিনি শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, তাঁর মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশও দেননি।ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তাঁর মক্কেলদের নাম আসেনি। অধীনস্থ নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হলেও মামলায় কোনো নারী সাক্ষী উপস্থাপন করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন এবং তাঁর মক্কেলদের খালাস চান।রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম যুক্তি দেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর নীতি প্রযোজ্য। একই উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী অপরাধ করলে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও ওই গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্য দায়ী হতে পারেন। তাঁর দাবি, ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের পর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় যুক্ত হন।মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত শুরু করে এবং ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে নয়টি অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ আমলে নিয়ে ওই দিনই আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয় এবং একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ১৭ আগস্ট শেষ হয়। এরপর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে

জুলাই বিপ্লব চলাকালে রাজশাহীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে পলাতক ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তাঁকে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হান, সহিদুল ইসলাম সরদার ও তারেক আবদুল্লাহ।শুনানিতে তিনটি ভিডিও উপস্থাপনশুনানিতে মামলার অভিযোগ ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে তিনটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ভিডিওগুলোতে কয়েকজন আসামিকে অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে জহিরুলসহ কয়েকজনকে শনাক্ত করার কথা জানান প্রসিকিউটর।পরে অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি বা প্রাইমা ফেসি গ্রাউন্ড বিবেচনায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির আবেদন করে প্রসিকিউশন।শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং চারজনকে হাজিরের নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।যাঁদের হাজিরের নির্দেশপ্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি হওয়া চারজন হলেন রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, ডাবলু সরকার, জহিরুল ইসলাম রুবেল ও মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক।গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়া ৩৪ জন হলেন—খায়রুজ্জামান লিটন, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হুমায়ুন কবির, রকি কুমার ঘোষ, রাশিক দত্ত, বাপ্পী চৌধুরী রনি, মহিদুল ইসলাম মোস্তফা, খালিদ হাসান বিপ্লব, রাশেদুল করিম রোজেল, মেহেদী হাসান ওরফে রনি, জেডু সরকার ওরফে জাবেদুর রহমান, আব্দুল হামিদ সরকার ওরফে টেকন, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার, আরমান আলী, আব্দুল মোমিন, শাহাদত হোসেন শাহু, তৌহিদুল হক সুমন, মাহতাব হোসেন চৌধুরী, আলাউদ্দিন ওরফে আলাল, সরিফুল ইসলাম বাবু, মো. নাবিল হাসান, মাহমুদুল হাসান রাজীব, ফরহাদ হোসেন বিপ্লব, তৌরিদ আল মাসুদ রনি, মেহেদী হাসান রিমেল ওরফে রিগেন, আশরাফুল ইসলাম জাফর, সুকান্ত কুমার দাস, ফয়সাল আহমেদ রুনু, নুর মোহাম্মদ সিয়াম, আসাদুল্লা-হিল-গালিব, গোলাম কিবরিয়া, আলাল পারভেজ লুলু, মনিরুজ্জামান খান ওরফে মনির এবং শফিকুজ্জামান ওরফে শফিক।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লব চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে রাজশাহী মহানগরের বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারী রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সময়ে শাহ মখদুম কলেজের সামনে আনজুম সাকিব নিহত হন।এ ছাড়া সালমান ওরফে শিমুলসহ আরও অনেকে ওই সময় আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।শেখেরচক স্বচ্ছ টাওয়ারের সামনে, শাহ মখদুম কলেজের সামনে, পদ্মা নদীর বেড়িবাঁধ, আলুপট্টি মোড় ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।এর আগে গত ৩০ জুলাই এই ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার তা আমলে নিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে