স্বামীর মৃত্যুর পর চিংড়িঘেরই রত্নার ভরসা, এখন বদলাচ্ছে চাষের ধরন
স্বামী হারানোর
পর দুই মেয়েকে নিয়ে
জীবনযুদ্ধে নামেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পার মাগুরাখালি গ্রামের
রত্না মণ্ডল। ২০১৩ সালে স্বামীর
মৃত্যুর পর পরিবারের একমাত্র
অবলম্বন হয়ে ওঠেন তিনি।
চিংড়ির ঘেরই হয়ে ওঠে
তাঁর আয়ের প্রধান উৎস।
নিজের হাতে চাষ করা
মাছ স্থানীয় ডিপোতে বিক্রি করে চলত সংসার।
বড় মেয়ে পায়েল অনার্স
শেষ করার পর তাঁর
বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে দীপু
মণ্ডল এখন অষ্টম শ্রেণির
শিক্ষার্থী।রত্নার মতো
পার মাগুরাখালি গ্রামের আরও প্রায় ৫০
জন চিংড়িচাষি সম্প্রতি একত্রিত হয়েছেন। উৎপাদক পর্যায়ের চাষিদের সংগঠিত করার এই উদ্যোগ
চলছে প্রায় দেড় বছর ধরে।
টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি এ
প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।আন্তর্জাতিক সি-ফুড মনিটরিং সংস্থা
মনটেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম, আন্তর্জাতিক
শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
লক্ষ্য, দায়িত্বশীল ও টেকসই চিংড়ি
চাষে কৃষকের সক্ষমতা বাড়ানো।পার মাগুরাখালি
গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বংশপরম্পরায় চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত। পাশ দিয়ে বয়ে
যাওয়া ভাংগাড়িয়া নদীর নোনা পানি
চিংড়ি চাষের জন্য উপযোগী। বছরের
বেশির ভাগ সময় নোনা
পানিতে চিংড়ি চাষ হলেও বর্ষার
কয়েক মাস মিষ্টি পানিতে
ধান চাষ করেন স্থানীয়
কৃষকেরা।তবে আধুনিক
প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির
সঙ্গে পরিচিত নন অধিকাংশ চাষি।
নিরাপদ পোনা নির্বাচন, মাছের
খাবার ও ওষুধের সঠিক
ব্যবহার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনায়
রয়েছে ঘাটতি।সবচেয়ে বড়
সমস্যা উৎপাদিত চিংড়ির ন্যায্য দাম পাওয়া। কৃষকদের
অভিযোগ, তাঁদের উৎপাদিত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিদেশের বাজারে
গেলেও লাভের বড় অংশ চলে
যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও ডিপো মালিকদের
হাতে।মাগুরখালি গ্রামের
চিংড়িচাষিদের টিম লিডার সুমন
গোলদার বলেন, এত দিন তাঁরা
বিভিন্ন ধরনের সার ও ওষুধ
ব্যবহার করে, বাজার থেকে
কেনা খাবার দিয়ে মাছ চাষ
করতেন। এরপর ডিপোতে মাছ
বিক্রি করতেন। তিন-চার হাত
ঘুরে সেই মাছ কোম্পানিতে
যেত। তাঁর ভাষায়, আমাদের
পরিশ্রমের লাভ চলে যেত
ফড়িয়াদের পকেটে।সুমন বলেন,
প্রায় দেড় বছর আগে
টোটালফুডের কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ পর্যন্ত ৫
থেকে ৬টি প্রশিক্ষণের আয়োজন
করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা
প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এখন তাঁরা অর্গানিক
পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ শিখছেন।প্রশিক্ষণের পর
মৃন্ময় মণ্ডল, সনৎ সিংহ মণ্ডল,
দীপঙ্কর মণ্ডল, চিন্ময় মণ্ডলসহ অন্য চাষিরা খামারে
রেকর্ড বই ব্যবহার করছেন।
সেখানে পোনা মজুত, খাদ্য
প্রদান, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, সার ও ওষুধের
ব্যবহার, প্রোবায়োটিক, পানির গুণগত মান পরীক্ষা এবং
মাছ ধরার তথ্যসহ ১২টি
ক্যাটাগরির তথ্য রাখা হচ্ছে।
সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও
নিচ্ছেন তাঁরা।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. অলকেশ কুমার
ঘোষ প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, বৈদেশিক
মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড়
খাত হলেও চিংড়ি খাতে
সংকটের শেষ নেই। বিশেষ
করে রপ্তানির মূল কাঁচামাল যে
কৃষকের কাছ থেকে আসে,
এত দিন তাঁর দিকে
যথেষ্ট নজর ছিল না।ড. অলকেশের
ভাষ্য, এবার প্রথম কৃষকদের
সরকারিভাবে নিবন্ধিত করা হয়েছে। উন্নত
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি
মাছ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোগাক্রান্ত মাছ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা গবেষণাগারেও কাজ করছেন। তিনি আরও
বলেন, আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ি রেড জোনে আছে।
ক্রেতারা এখন অর্গানিক খাবার
চান এবং খাবার কোথা
থেকে ও কার কাছ
থেকে আসছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ
ধারণা চান। বাংলাদেশ এখন
সেই পথেই যাত্রা শুরু
করেছে।খুলনার রূপসা
উপজেলার জাবুসা গ্রামে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত
হয় টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড। এক বছর পর
উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। চলতি
বছর জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এ
মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে অবদানের জন্য
স্বর্ণপদক পেয়েছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটি প্রায়
৪৪৫ টন হিমায়িত মাছ
রপ্তানি করে ৪৬ কোটি
৬৬ লাখ টাকা আয়
করেছে। প্রতিদিন ৬০ টন উৎপাদনক্ষমতার
পাশাপাশি তিনটি হিমাগারে ৩ হাজার টন
মাছ মজুত রাখার সক্ষমতা
রয়েছে তাদের।কোম্পানির পরিচালক
মেহেদী হাসান মো. হেফজুর রহমান
বলেন, মাছ ও চিংড়িকে
শুধু কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না করে ভ্যালু
অ্যাডেড, রেডি টু কুক
ও রেডি টু ইট
খাদ্যপণ্যে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব
পণ্য দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের
বাজারে পৌঁছেছে।তিনি বলেন,
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়িচাষিদের নিয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং
ও সংগঠিত কৃষকভিত্তিক ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা
হয়েছে। মাগুরখালির মতো চার এলাকার
প্রায় সাড়ে ৬০০ নিবন্ধিত
চাষি এ উদ্যোগের সঙ্গে
যুক্ত। কৃষক নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ,
রেকর্ড সংরক্ষণ, পানি ও মাটি
পরীক্ষা এবং চিংড়ির স্বাস্থ্য
ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী সরবরাহব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। বাংলাদেশ
ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের
সহসভাপতি এসকে কামরুল আলম
বলেন, কৃষককে বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে টোটালফুড অনুকরণীয়
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। হিমায়িত চিংড়ি খাতে ভালো করতে
চাইলে অন্যদেরও এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন
করা প্রয়োজন।