ঢাকা    বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ডেঙ্গু, হিটস্ট্রোক ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ডেঙ্গু, হিটস্ট্রোক ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও বায়ুদূষণের কারণে ডেঙ্গু, লেপ্টোস্পাইরোসিসসহ বিভিন্ন রোগের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্‌রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে আগাম সতর্কতা এবং আধুনিক রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন মালয়েশিয়ার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যে মানুষের স্বাস্থ্যে পড়তে শুরু করেছে। সুপার এল নিনোর মতো চরম আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা।মালয়েশিয়ার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী দাতুক ডা. জাইনাল আরিফিন ওমর বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে এডিস মশার প্রজননচক্র দ্রুত হতে পারে। এতে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টি ও বন্যার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব ঝুঁকি আগাম অনুমান করা সম্ভব।ডা. জাইনালের ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় গরমের শারীরিক প্রভাব আরও তীব্র হয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা হিটস্ট্রোকের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তীব্র গরমে হৃদ্‌রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে। আবার ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণে হাঁপানির উপসর্গও তীব্র হতে পারে।রোগ শনাক্তে আধুনিক নজরদারির পরামর্শজলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডা. জাইনাল। তিনি বলেন, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগের সংক্রমণপ্রবণ এলাকা আগেই শনাক্ত করা যেতে পারে। এ জন্য সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করা প্রয়োজন।ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে মশার লার্ভা ধ্বংস ও থার্মাল ফগিংয়ের মতো কার্যক্রম শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে দল গঠনও জরুরি।এ ছাড়া তাপপ্রবাহের বিষয়ে আগাম সতর্কতা জোরদার, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ডা. জাইনাল। তাঁর মতে, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও রোগীর আকস্মিক চাপ মোকাবিলায় হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। স্বাস্থ্যনীতি ও পরিকল্পনা তৈরির সময়ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।ডেঙ্গুর পাশাপাশি বাড়ছে অন্যান্য রোগের উদ্বেগমালয়েশিয়ার মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স কোয়ালিশন অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রাজ কুমার মহারাজা বলেন, ডেঙ্গু এখনো দেশটির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত মশার বেঁচে থাকা, প্রজনন এবং ভাইরাস সংক্রমণে প্রভাব ফেলে।ডেঙ্গুর পাশাপাশি লেপ্টোস্পাইরোসিস, ডায়রিয়াজনিত রোগ, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ, তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।ডা. রাজের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগের উপসর্গ বাড়তে পারে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।তিনি আরও বলেন, তাপজনিত অসুস্থতায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। রোগ নজরদারির সঙ্গে আবহাওয়া ও পরিবেশের তথ্য সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিকল্প বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং চরম আবহাওয়ার মধ্যেও চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে ওষুধ ও টিকা সুরক্ষিত রাখা জরুরি।বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের আগেই শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসা ও খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।ডিজিটাল প্রযুক্তিতে আগাম সতর্কতার প্রস্তাবমালায়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ভিক্টর হো আবহাওয়া, পরিবেশ, রোগের বিস্তার ও হাসপাতালসংক্রান্ত তথ্য একত্র করে সমন্বিত জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।জরুরি জনসতর্কতা পৌঁছে দিতে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার ‘মাইসেজাতেরা’ অ্যাপকে ব্যক্তিগত জলবায়ু-স্বাস্থ্য সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। এ ব্যবস্থায় তাপপ্রবাহ, ধোঁয়াশা কিংবা বন্যার পানির সংস্পর্শে আসার পর ব্যবহারকারীরা নিজেদের উপসর্গ যাচাই করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা পেতে পারেন।ডা. হোর মতে, এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, তাপজনিত অসুস্থতা এবং বন্যার পর সংক্রমণের ঝুঁকি আগাম অনুমান করতে সহায়তা করবে। ফলে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয় ভিত্তি রয়েছে। তবে জলবায়ুসংক্রান্ত সতর্কবার্তার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ, শ্রমিকদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাতে হবে। দেশটিতে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে।ঝুঁকিতে গিগ অর্থনীতির কর্মীরাডা. ভিক্টর হো বিশেষ করে গিগ অর্থনীতির কর্মীদের সুরক্ষা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। খাবার সরবরাহকারী কর্মী, মোটরসাইকেল চালক ও গাড়িচালকেরা তীব্র গরম, ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও খারাপ বায়ুমানের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন।তাঁর পরামর্শ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বায়ুমানের তথ্য যুক্ত করা উচিত। এতে বিপজ্জনক এলাকায় কাজের দায়িত্ব কমানো, নিরাপদ পথের পরামর্শ দেওয়া এবং বিশ্রাম ও পানি পানের বিরতি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, নিয়োগকর্তা ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।সূত্র: দ্য স্টার

ডেঙ্গু ঠেকাতে সপ্তাহে দুই দিন ঘরবাড়ি পরিষ্কারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে প্রত্যেক নাগরিক ও পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ঘরবাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, জমে থাকা পানি ও আবর্জনা পরিষ্কার করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়।বুধবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।বার্তায় তারেক রহমান বলেন, ঘরের আনাচকানাচ, রাস্তাঘাট, জনসমাগমস্থল এবং প্রতিদিন চলাচলের পথে যেসব জায়গায় ডেঙ্গুর মশা বংশবিস্তার করতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন।তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবার সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় দিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি, আশপাশের এলাকা এবং প্রতিদিন চলাচলের পথে যেসব স্থানে ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তার হতে পারে, সেসব জায়গা পরিষ্কার করি।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বয়সের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। সবাই সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে বহু পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা থেকে রক্ষা করা সম্ভব।ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোরবাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অতীতে অনেক বড় অর্জন করেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করা, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সফল হওয়া এবং ২০২৪ সালে সর্বস্তরের মানুষের প্রচেষ্টায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল করার পেছনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ভূমিকা ছিল।তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা যদি সবাই মিলে এসব অর্জন করতে পারি, তাহলে দেশের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে কেন সম্মিলিতভাবে অবদান রাখতে পারব না?’প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় আড়াই কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), স্কাউটস, গার্ল গাইডস ও রেড ক্রিসেন্টের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও এসব সংগঠনের সদস্যরা প্রায় এক মাস ধরে প্রতি শনিবার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের চেষ্টা করছেন।টিকার চেয়ে প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্বডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকার ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জমে থাকা পানি ও আবর্জনা পরিষ্কার করে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা বেশি কার্যকর। বিভিন্ন পরীক্ষায় ডেঙ্গুর টিকার কার্যকারিতা সীমিত বলে দেখা গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।তারেক রহমান বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারলেই একটি সরকার সফল হয়। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে চায় তাঁর সরকার।ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রাণহানি কমানো সম্ভব। সবাই উদ্যোগী হলে আগামী দিনে ডেঙ্গুর কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি রোধ করা যাবে। 

ডেঙ্গু ঠেকাতে সপ্তাহে দুই দিন ঘরবাড়ি পরিষ্কারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নরসিংদী জেলা হাসপাতালে এক বিছানায় দুজনের চিকিৎসা

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১০০। অথচ সেখানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডেঙ্গু ও হামের রোগীর পাশাপাশি শিশু ও বয়স্ক রোগীদেরও মিলছে না শয্যা। বাধ্য হয়ে অনেককে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বারান্দার মেঝেতে। কোথাও আবার একটি শয্যায় থাকছেন দুজন রোগী।সীমিত জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শয্যা নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে চাপে পড়েছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়াতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।নরসিংদী জেলা হাসপাতাল জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এখানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীরাও আসেন। পাশাপাশি জেলার বৃহত্তর রায়পুরা উপজেলার একটি বড় অংশের মানুষ এ হাসপাতাল থেকে সেবা নেন। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও সেবার মানের কারণে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।দুই সপ্তাহ ধরে রোগী তিন শতাধিকহাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে অধিকাংশ সময়ই দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে রোগীর সংখ্যা তিন শতাধিক। সর্বশেষ গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩৩৫ জন রোগী।তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ১৩২ জন এবং শিশু ৯৮ জন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন ৩০ জন। এর আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩১৩।জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক জরিপ অনুযায়ী, নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও শয্যা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়ছেন। অনেককে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও একটি নির্ধারিত শয্যায় দুজন রোগীকেও থাকতে দেখা গেছে।শিশুকে নিয়ে দুই দিন ধরে বারান্দায় আমেনারায়পুরা থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন আমেনা বেগম। কিন্তু শয্যা না পাওয়ায় শিশুকে নিয়ে থাকতে হচ্ছে বারান্দার মেঝেতে।আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো লোকও নেই। এই হাসপাতালের সেবার মান ভালো। তাই সিট না পেলেও বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা নিচ্ছি। তাতেই আগের তুলনায় একটু ভালো।’শিবপুরের বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী মোমেন খান ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শয্যা না পেয়ে অন্য এক রোগী বাইরে যাওয়ার সুযোগে তাঁর বিছানায় শুয়ে শরীরে স্যালাইন নিচ্ছেন তিনি। অপেক্ষা করছেন, কখন একটি শয্যা খালি হবে।মোমেন খান বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই বা কী করার আছে? এক শয্যার হাসপাতালে রোগী প্রায় সাড়ে তিন শ।’পরীক্ষার চাপও বেড়েছেরোগীর সংখ্যা বাড়ায় চাপ বেড়েছে হাসপাতালের পরীক্ষাগারেও। হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান শাহ আলম বলেন, আগে ভর্তি রোগী ও বাইরে থেকে আসা রোগীদের মিলিয়ে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০টি পরীক্ষা করা হতো। এখন প্রতিদিন দেড় শতাধিক পরীক্ষা করতে হচ্ছে। লোকবল কম থাকায় কাজ সামলাতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাজহারুল আলম বলেন, ১০০ জন রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও সীমিত জনবল ও লজিস্টিক সুবিধা দিয়ে তিন গুণের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। এতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তারপরও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।শয্যা ও জনবল বাড়ানোর দাবিনরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও অধিকাংশ সময় দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে প্রতিদিনই তিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকছেন। এরপরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।তিনি ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হবে। এতে নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হবে এবং রোগীদের বারান্দার মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার দুর্ভোগ কমবে।

নরসিংদী জেলা হাসপাতালে এক বিছানায় দুজনের চিকিৎসা

ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডে একযোগে ‘ক্লিনিং ডে’, চলবে তিন মাস

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডে একযোগে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান চালানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে নগরীর আবাসিক এলাকা, সড়ক, অলিগলি, ড্রেন, নালা, নির্মাণাধীন ভবন, পার্কিং এলাকা, ছাদ ও পরিত্যক্ত স্থাপনায় বিশেষভাবে তদারকি করা হয়।কর্মসূচির আওতায় কোথাও জমে থাকা পানি পাওয়া গেলে তা অপসারণ করা হয়। পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হয়। পানি জমতে পারে এমন ডাব ও নারকেলের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, পুরোনো টায়ার, ফুলের টবসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত সামগ্রীও পরিষ্কার করা হয়।অভিযানের সময় নির্ধারিত এলাকায় লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক, ফুটপাত ও আশপাশের এলাকা থেকে ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করেন।ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে ৭৫টি ওয়ার্ডেই সচেতনতামূলক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মশক নিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্থানীয় নাগরিকেরা অংশ নেন। র‌্যালি থেকে বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে লিফলেট বিতরণ করা হয়।ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা জরুরি। এ কারণে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি আগামী তিন মাস প্রতি শনিবার ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে বিশেষ অভিযান ও মাঠপর্যায়ের তদারকি অব্যাহত থাকবে।ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়েছে ডিএসসিসি। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডে একযোগে ‘ক্লিনিং ডে’, চলবে তিন মাস

ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ২ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৮৮ জন।শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৩ জনে। আর এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ৩২ জন।ঢাকায় ভর্তি ২৫১ জনগত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ১০২ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ১৪৯ জন।ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭৬ জন।এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৭১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২৩ জন, খুলনায় ১৬৩ জন, ময়মনসিংহে ৫০ জন, রাজশাহীতে ৪৯ জন এবং রংপুরে ৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।২০২৩ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তিস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হিসাব সংরক্ষণ করছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।একই বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ২০২৩ সালে এ রোগে প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন।গত বছরও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার।চলতি বছরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগটি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ২ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮