ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
১৮ শিক্ষকের মাদরাসায় ১৬ পরীক্ষার্থী, সবাই ফেল

১৮ শিক্ষকের মাদরাসায় ১৬ পরীক্ষার্থী, সবাই ফেল

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসায় ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ জন শিক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেনি। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৭ জন ছাত্রী ও ৯ জন ছাত্র।এ ঘটনায় অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান না করা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি পরে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে বলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের দাখিল পরীক্ষায় ২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকেরা।শ্রেণিকক্ষ আছে ১০টি, পাঠদান চলে দুই কক্ষেবুধবার সরেজমিনে মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, ৯ম, ১০ম শ্রেণি ও প্রাথমিক শাখা মিলিয়ে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। শিক্ষার্থী কম থাকায় একটি কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছিল।প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ১০টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। তবে কয়েকটি কক্ষ জরাজীর্ণ। কোনো কোনো কক্ষে ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন হয়নি।দাখিলে ফেল করা শিক্ষার্থী সিয়ামের বাবা বাচ্চু মিয়া বলেন, এই মাদরাসায় কোনো শিক্ষক পড়ালেখা করান না। শিক্ষকরা গল্প করেন, যার যার মতো চলে যান। গত বছর আমার ছেলে দুই বিষয়ে ফেল করেছিল। এবার আবার পরীক্ষা দিয়েও ফেল করেছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি। কিন্তু আমাদের কথা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।আগে মাদরাসা জমজমাট ছিলমাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, তিনি ২০০৭ সালে এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তখন মাদরাসাটি বেশ জমজমাট ছিল। এখন শিক্ষার্থী কমে গেছে এবং ফলাফলও খারাপ হচ্ছে।তৌহিদের অভিযোগ, প্রতি ক্লাসে একজন-দুজন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। স্যাররা বসে থাকেন, আড্ডা দেন। পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। ১৬ জন পরীক্ষা দিয়েছে, একজনও পাস করেনি। অথচ শিক্ষক আছেন ১৮ জন।স্থানীয় বাসিন্দা তৌফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘১৬ জনের মধ্যে ১৬ জনই ফেল করেছে- এটা লজ্জার বিষয়। ১৮ জন শিক্ষক থাকার পরও এমন ফল কীভাবে হলো, তা দেখা দরকার।ফলাফলে নিজেই হতভম্বতবে মাদরাসার প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান ফল বিপর্যয়ের জন্য শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার পরিবেশের সংকটকে দায়ী করেছেন।তিনি বলেন, আমি এই ফলাফলে নিজেই হতভম্ব। আমার বলার মতো ভাষা নেই। সবাই একসঙ্গে ফেল করার কথা নয়। কেন এমন হয়েছে, তা দেখছি। ফেল করা শিক্ষার্থীদের খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমি ক্লাস কীভাবে নেব, আমার শ্রেণিকক্ষই তো ঠিক নেই। ৪০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি আছে, কিন্তু আধুনিকায়ন হয়নি। দুইটি কক্ষ দিয়ে নয়টি ক্লাস চালাতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী কষ্ট করে পড়াশোনা করে। আগামী বছর শতভাগ পাস করানোর চেষ্টা করব।শতভাগ ফেল মেনে নেওয়া যায় নাবেলাবো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, কেন এমন ফল হলো, তা জানতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ডেকে ফল বিপর্যয়ের কারণ এবং তা কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিক্ষার পরিবেশ ভালো না থাকাকে ফল খারাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, গাছতলায় পড়ালেখা করলেও পাঁচ-সাতজন পাস করবে। ভবন সংস্কারের বিষয়ে আমি কথা বলব। কিন্তু শতভাগ ফেল মেনে নেওয়া যায় না।তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে ফেল করেছে।১৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় মাদরাসাটির পাঠদান, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে উন্নতি ঘটবে।