দিল্লির বার্তা নিয়ে ঢাকায় দীনেশ ত্রিবেদীর দৌড়ঝাঁপ, নজরে তারেক রহমানের ভারত সফর
বাংলাদেশ-ভারত
সম্পর্ক যখন
নানা
অস্বস্তি ও
টানাপোড়েনের মধ্য
দিয়ে
যাচ্ছে,
তখন
ঢাকায়
ভারতের
হাইকমিশনার দীনেশ
ত্রিবেদীর তৎপরতা
কূটনৈতিক মহলে
আলাদা
করে
নজর
কেড়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার
পর
গত
দুই
মাসে
তিনি
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অন্তত
২৮
জন
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও
উপদেষ্টার সঙ্গে
বৈঠক
করেছেন।এসব বৈঠকে
একদিকে
যেমন
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়
উঠে
এসেছে,
অন্যদিকে ভারতীয়
প্রকল্প পুনরায়
চালু,
যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও
জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আমলাদের প্রশিক্ষণ এবং
সংসদীয়
সম্পর্ক জোরদারের মতো
বিষয়েও
গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তবে তাঁর
ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে
সবচেয়ে
বেশি
গুরুত্ব পেয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি
সফর।
বিভিন্ন বৈঠকে
ভারতীয়
হাইকমিশনার এ
সফরের
প্রয়োজনীয়তার কথা
তুলে
ধরেছেন। তাঁর
বক্তব্য, দুই
দেশের
প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে
অনেক
জটিলতার সমাধান
হতে
পারে।দীনেশ ত্রিবেদী গত
১২
জুন
কলকাতা
থেকে
সড়কপথে
ঢাকায়
আসেন।
২৫
জুন
রাষ্ট্রপতির কাছে
পরিচয়পত্র পেশের
মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন
তিনি।
তবে
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে
প্রথম
সৌজন্য
বৈঠকের
জন্য
তাঁকে
এক
মাসের
বেশি
অপেক্ষা করতে
হয়।
২৯
জুলাই
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.
খলিলুর
রহমানের সঙ্গে
তাঁর
প্রথম
বৈঠক
হয়।
একই
দিনে
তিনি
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা
ওবায়েদ
ইসলামের সঙ্গেও
সাক্ষাৎ করেন।
সেই বৈঠকের
পর
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন
যাত্রায় নিতে
হবে।
একই
সঙ্গে
সম্পর্কের অস্বস্তির জায়গাগুলো দূর
করার
প্রয়োজনীয়তার কথাও
তিনি
উল্লেখ
করেন।
তাঁর
অবস্থান ছিল—সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও
স্বার্থের ভিত্তিতে।এরপর ৩
আগস্ট
প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের
সঙ্গে
বৈঠক
করেন
ভারতীয়
হাইকমিশনার। সেখানে
ভারতে
অবস্থানরত শেখ
হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ঢাকার
পক্ষ
থেকে
বলা
হয়,
বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতার জন্য
ভারতের
মাটি
ব্যবহার না
করার
বিষয়টি
দিল্লিকে নিশ্চিত করতে
হবে।
৬ আগস্ট
বিদ্যুৎ ও
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল
হাসান
মাহমুদ
টুকু
এবং
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম
অমিতের
সঙ্গে
বৈঠকে
আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ ও
জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে
আলোচনা
করেন
দীনেশ
ত্রিবেদী। বাংলাদেশ তখন
পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও
জ্বালানি সরবরাহের জন্য
ভারতের
সহযোগিতা চায়।
৯ আগস্ট
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে
আবারও
বৈঠক
করেন
তিনি।
এর
পরদিন,
১০
আগস্ট,
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে
সাক্ষাৎ করেন।
ওই
বৈঠকে
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি তারেক
রহমানের দিল্লি
সফরের
বিষয়টি
বিশেষ
গুরুত্ব পায়।
ভারতীয়
হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে পরিবারসহ একটি
পূর্ণাঙ্গ ‘গ্র্যান্ড ভিজিটের’ আমন্ত্রণ জানান।তবে ঢাকার
পক্ষ
থেকে
বলা
হয়,
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি
সফরের
আগে
একটি
অনুকূল
ও
সহায়ক
পরিবেশ
তৈরি
করা
প্রয়োজন। এ
পরিবেশ
তৈরির
দায়িত্ব ভারতের
বলেও
বার্তা
দেওয়া
হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে
বৈঠকের
পর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের
সঙ্গেও
সাক্ষাৎ করেন
দীনেশ
ত্রিবেদী। সেখানে
নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায়
শেখ
হাসিনাসহ অন্য
অপরাধীদের হস্তান্তরের বিষয়টি
ওঠে
আসে।
এরপর ১১
আগস্ট
দিল্লি
গিয়ে
ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে
বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ
করেন
দীনেশ
ত্রিবেদী।ঢাকায় ফিরে
তাঁর
বৈঠকের
পরিধি
আরও
বাড়ে।
২০
আগস্ট
অর্থমন্ত্রী আমির
খসরু
মাহমুদ
চৌধুরীর সঙ্গে
বৈঠকে
বন্ধ
থাকা
ভারতীয়
প্রকল্পগুলো পুনরায়
চালুর
ওপর
গুরুত্ব দেন
তিনি।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, জ্বালানি ও
অবকাঠামো সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও
আলোচনা
হয়।
২৪ আগস্ট
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল
মুক্তাদিরের সঙ্গে
বৈঠকে
সীমান্ত হাট
চালু,
স্থলবন্দর কার্যকর করা
এবং
স্থলপথে সুতা
আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো
বিষয়
নিয়ে
আলোচনা
হয়।
দীনেশ
ত্রিবেদী বলেন,
রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক বিষয়ে
মতপার্থক্য থাকলেও
দুই
দেশের
মানুষ
উন্নয়ন
ও
অগ্রগতি চায়।
তিনি
ভারত-বাংলাদেশকে নতুন প্রজন্মের জন্য
একসঙ্গে কাজ
করার
আহ্বান
জানান।
এরপর সংসদীয়
সম্পর্ক জোরদারেও উদ্যোগী হন
তিনি।
২
সেপ্টেম্বর স্পিকার হাফিজ
উদ্দিন
আহমদ,
ডেপুটি
স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার
কামাল
এবং
চিফ
হুইপ
নুরুল
ইসলাম
মনির
সঙ্গে
পৃথক
বৈঠকে
ভারত
ও
বাংলাদেশের সংসদ
সদস্যদের নিয়ে
একটি
ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ
গঠনের
প্রস্তাব দেন।তবে এসব
বৈঠকে
বাংলাদেশের পক্ষ
থেকেও
বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়
সামনে
এসেছে।
চিফ
হুইপ
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ড, বেড়া
নির্মাণ এবং
অতীতে
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে
ভারতের
নীরবতার বিষয়ে
ক্ষোভের কথা
জানান।
সেপ্টেম্বরের প্রথম
সপ্তাহেও ধারাবাহিক বৈঠক
চালিয়ে
যান
দীনেশ
ত্রিবেদী। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে
দুই
দেশের
তরুণদের জন্য
যৌথ
প্রশিক্ষণ ও
সাংস্কৃতিক বিনিময়
কর্মসূচির প্রস্তাব দেন।
জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে
আলোচনায় বাংলাদেশি আমলাদের প্রশিক্ষণের জন্য
ভারতে
পাঠানোর বিষয়টি
তোলেন।
বাংলাদেশের পক্ষ
থেকে
সীমান্ত হত্যা
বন্ধ
এবং
গঙ্গার
পানির
ন্যায্য হিস্যার বিষয়ও
উত্থাপন করা
হয়।
৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা
ফখরুল
ইসলাম
আলমগীরের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করেন
ভারতীয়
হাইকমিশনার। পরদিন
প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে
বৈঠকে
সামরিক
প্রশিক্ষণ, কর্মকর্তা বিনিময়
ও
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর
গুরুত্ব দেন
তিনি।১৩ সেপ্টেম্বর পানিসম্পদমন্ত্রী ও
প্রতিমন্ত্রী এবং
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য
উপদেষ্টার সঙ্গে
বৈঠক
করেন।
এরপর
১৬
সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান
ও
পর্যটনমন্ত্রী এম
রাশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে
বৈঠকে
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে
ভারতের
সহযোগিতার আগ্রহের কথা
জানান।
পরদিন
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী
আমিনের
সঙ্গেও
বৈঠক
করেন
তিনি।
৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ
আযম
খানের
সঙ্গে
বৈঠকের
মধ্য
দিয়ে
তাঁর
সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠকগুলোর আরেকটি
পর্ব
শেষ
হয়।
বৈঠক
শেষে
দীনেশ
ত্রিবেদী বলেন,
দুই
দেশের
সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ থাকা
স্বাভাবিক, তবে
সবকিছু
সঠিক
পথেই
এগোচ্ছে। তাঁর
প্রত্যাশা, সময়মতো
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত
সফর
করবেন।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে বারবার
একটি
বিষয়ই
ফিরে
এসেছে—ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ককে সামনে
এগিয়ে
নেওয়া।
তাঁর
ভাষায়,
ভারতের
প্রধানমন্ত্রী তাঁকে
একটি
দায়িত্ব দিয়ে
ঢাকায়
পাঠিয়েছেন এবং
তাঁর
কাজ
হলো
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে
নেওয়া।
এই ধারাবাহিক তৎপরতায় এখন
সবচেয়ে
বড়
প্রশ্ন,
প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের দিল্লি
সফরের
জন্য
ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ
কত
দ্রুত
তৈরি
হয়
এবং
সেই
সফর
হলে
দুই
দেশের
অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে কতটা
অগ্রগতি আসে।