সওজের গুরুত্বপূর্ণ পদে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের পদায়ন
সড়ক ও
জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ
প্রকল্প ও পদে পতিত
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের পদধারী নেতাদের পদায়ন করা হয়েছে—এমন
অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও
মহাসড়ক বিভাগ এবং সওজের কয়েকজন
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব পদায়ন দেওয়া
হয়েছে।গত ২৩
আগস্ট পৃথক তিনটি আদেশে
১২ জন অতিরিক্ত প্রধান
প্রকৌশলী, ২৫ জন তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী এবং ২১ জন
নির্বাহী, উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলীকে
বিভিন্ন পদে পদায়ন করা
হয়। এসব আদেশে স্বাক্ষর
করেন উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলি। এর দুই
দিন পর, ২৫ আগস্ট
প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা
মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরে আরও ৩৫ জন
নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদায়ন করা হয়।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের
অভিযোগ, চারটি আদেশে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জন বঙ্গবন্ধু
প্রকৌশলী পরিষদের সড়ক ও জনপথ
শাখার নেতা ছিলেন। তাঁদের
অনেককে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ
থাকা প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা
বা উইংয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।রাজেন্দ্রপুরে বৈঠক
নিয়ে
প্রশ্নপদায়নের আগে
গত ২২ আগস্ট গাজীপুরের
রাজেন্দ্রপুর সওজ পরিদর্শন বাংলোয়
একটি বৈঠক হয়েছিল বলে
অভিযোগ রয়েছে। সেখানে সড়ক পরিবহন ও
মহাসড়ক বিভাগের তিন কর্মকর্তা, সওজের
প্রধান প্রকৌশলী, একজন অতিরিক্ত প্রধান
প্রকৌশলী এবং সওজ প্রকৌশলী
সমিতির নেতাসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
দাবি করেছেন।তাঁদের অভিযোগ,
ওই বৈঠকে সওজের কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে জারি হওয়া
আদেশগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,
বেশি বিনিয়োগের প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী
পরিষদের নেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে
দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।তবে বৈঠকে
অংশ নেওয়া সড়ক পরিবহন ও
মহাসড়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা এ
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রাজেন্দ্রপুরে
তাঁরা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে
বসেছিলেন; সওজের পদায়ন নিয়ে সেখানে কোনো
আলোচনা হয়নি।সওজের প্রধান
প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানও পদায়ন নিয়ে রাজেন্দ্রপুরে কোনো
আলোচনা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ওখানে ওই রকম কিছুই
হয়নি। রাজেন্দ্রপুরে আমরা গিয়েছিলাম অন্য
কাজে। প্লান্টেশন নিয়ে বসেছিলাম। ওই
রাস্তায় আমাদের অনেক প্রজেক্ট আছে।’বদলির ক্ষেত্রে
আওয়ামী লীগপন্থী প্রকৌশলীরা বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন কি না—জানতে
চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই
আসে না।’গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যাঁদের পদায়নবঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী
পরিষদের সওজ শাখার ২০২১
সালের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌসকে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর
সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক-৬ করা হয়েছে।
এর আগে তিনি প্রেষণে
আশুগঞ্জ-নদীবন্দর-সরাইল-ধরখার-আখাউড়া স্থলবন্দর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক-৩ ছিলেন। আওয়ামী
লীগ সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী
প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন
করেন তিনি।ওই কমিটির
আরেক সদস্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনকে চট্টগ্রাম সার্কেলে পদায়ন করা হয়েছে।শাহানা ফেরদৌসের
সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি
ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠানো
হলেও কোনো জবাব পাওয়া
যায়নি। মোসলেহ উদ্দিনকেও একাধিকবার ফোন করা হলেও
তিনি সাড়া দেননি।শোক
দিবসের কমিটির সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ পদবঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী
পরিষদের সওজ শাখার জাতীয়
শোক দিবস পালনসংক্রান্ত প্রস্তুতি
কমিটির আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে
ময়মনসিংহ সার্কেলে এবং সদস্যসচিব অমিত
কুমার চক্রবর্তীকে শেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী করা হয়েছে।কমিটির সদস্য
শিশির কান্তি রাউৎকে ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইং থেকে এক্সপ্রেসওয়ে
রিজিওনাল কানেক্টিভিটি অ্যান্ড পিপিপি উইংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রজীবনে
বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে
সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে।তবে শিশির
কান্তি রাউৎ এসব অভিযোগ
অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তিনি
ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং বঙ্গবন্ধু
প্রকৌশলী পরিষদের সওজ শাখাতেও ছিলেন
না। কোনো রাজনৈতিক দলের
সঙ্গেই তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল
না বলে দাবি করেন
তিনি।২০২১ সালের
জাতীয় শোক দিবসের প্রস্তুতি
কমিটিতে তাঁর সদস্য থাকার
নথি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে তিনি সেটিকে
‘ভুয়া’ বলে দাবি করেন।প্রধান প্রকৌশলীর পদেও
ছিলেন
পরিষদের নেতারাআওয়ামী লীগ
সরকারের শেষদিকে সওজের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সওজ শাখার আহ্বায়ক
মনির হোসেন পাঠান ও সদস্য সৈয়দ
মঈনুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা পরিষদের নেতাদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ
মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যেতেন।শিশির কান্তি
রাউৎ, আবুল কালাম আজাদ,
জিকরুল হাসানসহ আরও কয়েকজনকে এসব
কর্মসূচিতে সামনের সারিতে দেখা যেত বলে
সংশ্লিষ্টদের দাবি।এ বিষয়ে
শিশির কান্তি রাউৎ বলেন, সরকারি
আদেশের কারণে তাঁরা সেখানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।আরও
যাঁদের নিয়ে
অভিযোগবঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী
পরিষদ নেতা মাসুম সারওয়ারকে
ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের
অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক-১ থেকে ময়মনসিংহ
বিভাগের পাঁচটি জলবায়ু-সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্পের
প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে বলে
অভিযোগ উঠেছে।নির্বাহী প্রকৌশলী
মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধেও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে
সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে ঢাকা-রংপুর প্রকল্প
থেকে চুক্তি মূল্যায়ন বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।তবে মাহবুবুর
রহমান বলেন, তিনি কখনো কোনো
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত
ছিলেন না। তাঁর দাবি,
মেধার ভিত্তিতেই তিনি বর্তমান পর্যায়ে
এসেছেন। কোনো কমিটিতে তাঁর
নাম কারা দিয়েছে, সেটিও
তাঁর জানা নেই।এ ছাড়া
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ নেতা সুমন সিংহ,
পংকজ ভৌমিক, সিনথিয়া আজমিরী খান ও আহসান
হাবীবকে নড়াইল, গাইবান্ধা, ঢাকা ও মানিকগঞ্জের
মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে
অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের অনেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও
বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।পরিষদ নেতা
রাশেদুল আলম আওয়ামী লীগ
সরকারের সময় বিভিন্ন জেলার
নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর
দায়িত্ব পালন করলেও তাঁকে
সওজের প্ল্যানিং ও ডেটা সার্কেলে
পদায়ন করা হয়েছে বলে
অভিযোগ উঠেছে।এ ছাড়া
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়
ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ সাইফ
উদ্দিনকে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর
সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক-১ করা হয়েছে।শোক
দিবসের কমিটি
থেকে
পদায়নবঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী
পরিষদের জাতীয় শোক দিবস পালনের
প্রস্তুতি কমিটিতে থাকা সৈয়দ আসলাম
আলী, সুপ্তা চাকমা, নুরুন নবী তরফদার, মনিরুজ্জামান,
মেহেদী ইকবাল, জহিরুল ইসলাম, ড. আহাদ উল্লাহ,
জাকির আলম, আইমান শওকতী,
শাফায়াত বিন রশিদ, খালেদ
মাহমুদ এহসান, শাহরিয়ার আলম, সৈয়দ হালিমুর
রহমান, ভূঁইয়া রেদওয়ানুর রহমান, শাকিরুল ইসলাম, কামরুল হাসান সরকার, মাইদুল ইসলাম ও ইউসুফ আলীসহ
কয়েকজনকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা
হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু
প্রকৌশলী পরিষদের সাত সদস্যবিশিষ্ট সওজ
শাখা কমিটির সদস্যসচিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিকরুল হাসান, সদস্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এবং নির্বাহী
প্রকৌশলী শামীম আল মামুন এখনো
বহাল রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে
জানা গেছে।সম্মেলনের কমিটিতেও একই
চিত্র?সওজের নির্বাহী
প্রকৌশলী ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের
অংশগ্রহণে ‘নির্বাহী প্রকৌশলী সম্মেলন’ আয়োজনের জন্য গত ৯
সেপ্টেম্বর পাঁচটি কমিটি গঠন করে অফিস
আদেশ জারি করা হয়।অভিযোগ রয়েছে,
এসব কমিটিতেও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের অনেকে দায়িত্ব পেয়েছেন।ফলে সওজের
সাম্প্রতিক পদায়ন ও বিভিন্ন কমিটিতে
দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে
প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ
প্রকল্প ও দায়িত্বে পদায়নের
ক্ষেত্রে আসলে কী ধরনের
মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে।
তবে
যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁদের
কয়েকজন তা সরাসরি অস্বীকার
করেছেন। ফলে পদায়নের ক্ষেত্রে
রাজনৈতিক পরিচয় কতটা প্রভাব ফেলেছে,
তা নিয়ে অভিযোগ ও
পাল্টা বক্তব্য—দুই পক্ষই রয়েছে।