ঢাকা    সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
ট্রানজিটের আড়ালে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে ভারতের বিস্তৃত সুযোগ

ট্রানজিটের আড়ালে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে ভারতের বিস্তৃত সুযোগ

বাংলাদেশের বন্দর, নৌপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি করা তিনটি চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা এসব চুক্তির মাধ্যমে ভারত চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁও বন্দরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নৌ ও স্থলপথ ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে। তবে এর বিপরীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুবিধা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।চুক্তিগুলো হলো অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া (এসিএমপি), কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএসএ) এবং প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি)। পিআইডব্লিউটিটি পুরোনো চুক্তির নবায়ন হলেও এসিএমপি ও সিএসএ নতুন চুক্তি।বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি চুক্তিকে আলাদাভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগের পাশাপাশি এসব ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থও জড়িত।চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ও ভারত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। পরে ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর এসিএমপি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক আন্তঃসরকারি কাঠামো তৈরি হয়। ২০১৯ সালে কাস্টমস, পণ্য, যানবাহন, জাহাজ, রুট, নিরাপত্তা ও নথিপত্রসহ বাস্তবায়নের বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় পরীক্ষামূলক কনটেইনার চালান যায়।এসিএমপির আওতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করতে পারে। চুক্তিতে চারটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বা মোংলা থেকে আগরতলা, ডাউকি, সুতারকান্দি ও শ্রীমন্তপুরের রুট রয়েছে।চুক্তির বিভিন্ন ধারায় ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজকে বাংলাদেশের বন্দরে সুবিধা ও অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির আওতায় পরিবহন করা পণ্য নিয়মিত ফিজিক্যাল কাস্টমস পরিদর্শনের বাইরে রাখার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) এম শাহজাহানের দাবি, চুক্তি করার সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দরকষাকষির সুযোগ সীমিত ছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার চাপের কারণে ভারতের চাহিদা অনুযায়ী চুক্তি করা হয়।চার বন্দরকে কোস্টাল পোর্ট করার প্রশ্নকোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁওকে উপকূলীয় বন্দর হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। চুক্তির একটি ধারায় পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে চলাচলকারী জাহাজের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও ড্রাফট নির্ধারণ করা হয়েছে।চুক্তির এসওপিতে ৫০:৫০ কার্গো শেয়ারের কথা থাকলেও কোন পণ্যে, কীভাবে এবং কোন সময়ের ভিত্তিতে এই হিসাব হবে, তার স্পষ্ট কাঠামো নেই বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। পণ্য পরিবহনের সক্ষমতার দিক থেকে ভারত এগিয়ে থাকায় বাস্তবে দেশটি বেশি সুবিধা পেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।আরেকটি বিষয় হলো, চুক্তির আওতায় চলাচলকারী জাহাজে পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল বা পিএসসি কার্যকর না হওয়ার বিধান। সাধারণত বিদেশি জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করলে নিরাপত্তা, সনদপত্র, সমুদ্রযাত্রার সক্ষমতা ও দূষণ প্রতিরোধব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়। সমালোচকদের মতে, ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।এ ছাড়া চুক্তির আওতায় চলাচলকারী জাহাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়ার বিধান রয়েছে। এতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজজট এবং টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।বাংলাদেশের নদীপথ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়পিআইডব্লিউটিটি চুক্তির আওতায় ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল চুক্তিতে ২০১৫ সালে নতুন ধারা-উপধারা যুক্ত করা হয় এবং পাঁচ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয় নবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়। এর ফলে ২০২০ ও ২০২৫ সালে নতুন করে আলোচনা ছাড়াই চুক্তিটি নবায়ন হয়েছে।চুক্তি অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকার নদীপথ জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখার দায়িত্ব দুই দেশের। এ কাজে ভারত বাংলাদেশকে এককালীন ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও বাকি ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করবে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।সিরাজগঞ্জ-দাইকাওয়া ও শেরপুর-জকিগঞ্জ রুট ভারতীয় ট্রানজিট ট্রাফিকের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের কথাও চুক্তিতে রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের নদী অবকাঠামোর অর্থ ও সক্ষমতা ভারতের ট্রানজিটের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সমতা কতটা?চুক্তিগুলোর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সড়ক, নৌপথ ও বন্দর ব্যবহার করে সহজে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন করতে পারছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠাতে চাইলে ভারতের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সুবিধার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ আহবাবুল ইউসুফ খান মনে করেন, এসব চুক্তির অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বিশেষ করে ৫০:৫০ কার্গো শেয়ারের ক্ষেত্রে ‘as far as practicable’ এবং ‘expeditious transportation’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে শর্ত প্রয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।চুক্তি নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্নচুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে না থাকা এবং অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা সহজলভ্য না হওয়াকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দুই দেশের মধ্যে সুবিধা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও কৌশলগত ভারসাম্য কতটা বজায় রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক সালেহ শাহরিয়ার এসব ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত নির্ভরশীলতা বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ভারতীয় পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের বন্দর ও নিরাপত্তা কাঠামোকে বিশেষ সুবিধা দিতে হলে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থও সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা প্রয়োজন।পতনের পরও চুক্তিগুলো বহালআওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পরও চুক্তিগুলো বহাল রয়েছে। ফাইলে থাকা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতীয় কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতিতে থাকলেও পরে আবার এসব চুক্তির ভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।রাজনীতি বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে করা চুক্তিগুলো নিয়ে নির্বাচিত সরকারের উচিত সংসদে আলোচনা করা এবং দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা। তার বক্তব্য, সরকার পরিবর্তনের পরও চুক্তিগুলো নিয়ে প্রকাশ্য পর্যালোচনার উদ্যোগ দেখা যায়নি।সব মিলিয়ে, ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর, নৌপথ ও স্থলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া তিনটি চুক্তি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাংলাদেশের আর্থিক আয়, নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত ব্যয় এবং কৌশলগত সুবিধা কতটা নিশ্চিত হয়েছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। চুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ, সংসদীয় আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে পুনর্মূল্যায়নের দাবি তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।