পুরান ঢাকার যে আঙিনায় চার মাস ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম
বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই কবির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনা। এর মধ্যে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউরীর একটি আঙিনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে প্রায় চার মাস অবস্থান করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর অবস্থানের স্মৃতি বহন করা ঘরটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।বেচারাম দেউরীর ৫৩-৫৫ নম্বর এলাকার আবদুল্লাহ ওয়াকফ স্টেট-সংলগ্ন এই অংশে রয়েছে সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর মাজার। একই আঙিনায় রয়েছে আবদুল্লাহ জামে মসজিদ এবং মৌলভী আবুল খায়রাত মোহাম্মদ ও মৌলভী আবুয়াল মোজাফফর আবদুল্লাহর পারিবারিক কবরস্থান।স্থানীয় ইতিহাসসংশ্লিষ্ট তথ্য ও গবেষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, কাজী নজরুল ইসলাম এই আঙিনায় অবস্থানকালে এখানকার বাগিচায় বসে বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে ‘বুলবুলি’ ও ‘বিদেশী মন উদাসী’ উল্লেখযোগ্য।নজরুলের অবস্থানের সময় এই এলাকায় একটি সুবিশাল বাগান ছিল। সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর জীবদ্দশায়ও এখানে বড় বাগিচা ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে সেই বাগানের অস্তিত্ব নেই। তবে মাজার, মসজিদ, পারিবারিক কবরস্থান ও নজরুলের অবস্থানের ঘরটি পুরান ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।এই স্থানের সঙ্গে নজরুল পরিবারের একটি সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়। সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আল কাদরীর ছোট ছেলে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কয়েকটি গানে সুর দিতেন বলে জানা যায়। নজরুলের জীবনের সঙ্গে পুরান ঢাকার আরও কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসময় তিনি পুরান ঢাকায় নির্বাচনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় উল্লেখ পাওয়া যায়।আবদুল্লাহ জামে মসজিদের ইতিহাসএই আঙিনার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা আবদুল্লাহ জামে মসজিদ। বাংলার ১২৭৬ সনে, অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন।এ আঙিনার সঙ্গে যুক্ত মৌলভী আবুল খায়রাত মোহাম্মদ ও মৌলভী আবুয়াল মোজাফফর আবদুল্লাহর নামও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ১৮ শতকের কাছাকাছি সময়ে আবুল খায়রাত সাহেবের ঢাকা ও সোনারগাঁয়ে জমিদারি ছিল বলে জানা যায়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথাও ইতিহাসচর্চায় উঠে এসেছে।মৌলভী আবদুল্লাহ ছিলেন মৌলভী আবুল খায়রাতের শ্বশুর। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মৌলভী আবদুল্লাহর বাবা আরব দেশ থেকে বাংলায় এসেছিলেন। কেরানীগঞ্জের আবদুল্লাহপুর এলাকার নামকরণের সঙ্গেও তাঁর নামের সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে।সংরক্ষণের দাবিকাজী নজরুল ইসলামের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে বেচারাম দেউরীর এই আঙিনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যে ঘরে কবি প্রায় চার মাস অবস্থান করেছিলেন, সেটি বর্তমানে জরাজীর্ণ। ফলে স্থানটি সংরক্ষণ ও যথাযথভাবে চিহ্নিত করার দাবি রয়েছে ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয়দের মধ্যে।ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এমন স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা গেলে নগরটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জাতীয় কবির জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোও যথাযথ মর্যাদা পাবে।লিখক: মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীমসাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ