ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা নতুন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চিত্র শুধু এই একটি হত্যাকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৩১১টির বেশি এবং দিনে ১০টির বেশি হত্যার মামলা হয়েছে।জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টি খুন যেন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।চুরি-ডাকাতি কমলেও খুন নিয়ন্ত্রণে আসেনিপুলিশের ভাষ্য, চুরি ও ডাকাতির মতো কিছু অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়নি।পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে স্থানীয় বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মানুষের মধ্যে অস্থিরতার মতো কিছু ঘটনা অনেক সময় আগেভাগে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।অপরাধ বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার আধিপত্য, মাদক, পারিবারিক বিরোধ এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এর মধ্যে অন্যতম।অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের মতে, মানুষের হাতে অবৈধ অস্ত্র পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক ও পারিবারিক বিরোধের কারণে সহিংসতা বাড়ছে। তার ভাষ্য, অপরাধ বাড়লেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাতও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি করছে।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন। নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘাতে চারজন, জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জন নিহত হয়েছেন।বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।গত ২৩ আগস্ট রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটিও রাজনৈতিক কোন্দল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।মব সহিংসতায় সাত মাসে ১৩৪ মৃত্যুমব সহিংসতার ঘটনাও কমেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন।এর মধ্যে ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন। চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ৩১ জন।মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে। পদ-পদবি নিয়েও সংঘাত হচ্ছে। এসবের দায় সরকারকেই নিতে হবে।তবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর কোনো চাপ নেই এবং পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে।ছয় মাসে হত্যার মামলা প্রায় একইচলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরের ছয় মাসের সঙ্গে আগের ছয় মাসের হত্যার মামলার হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৯টি।নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাও বেড়েছে। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিভিন্ন থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো আগের সক্ষমতায় পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। এর সুযোগে খুন, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ বাড়ছে।চলতি বছরে ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই মামলায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারিক কার্যক্রম হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের আরও অনেক ঘটনা ঘটছে, যেগুলোর সবগুলোতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, খুন ও সহিংসতা বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত অভিযান প্রয়োজন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্য মনোবল হারিয়েছেন এবং অনেকে ভয় নিয়ে কাজ করছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জপুলিশের হিসাবে চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধ কিছুটা কমলেও হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা এখনো উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব সহিংসতার ধারাবাহিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে না। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার বন্ধ করা, রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বিরোধ নিরসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।