ঢাকা    শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
নাইন ইলেভেন: ২৫ বছর পরও যে হামলার প্রভাব বদলে দেয় বিশ্বরাজনীতি

নাইন ইলেভেন: ২৫ বছর পরও যে হামলার প্রভাব বদলে দেয় বিশ্বরাজনীতি

নাইন ইলেভেন দুটি শব্দই যেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ হামলার সমার্থক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলার সেই দৃশ্য। ২৫ বছর পরও বিশ্বরাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং মুসলিমদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে ওই হামলার প্রভাব স্পষ্ট।২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি ভবনে মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে দুটি যাত্রীবাহী বিমান আঘাত হানে। একই দিন আরও দুটি বিমান ছিনতাই করা হয়। এর একটি আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে। অন্যটি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিধ্বস্ত হয়।হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইসলামি চরমপন্থি সংগঠন আল-কায়েদা ও এর প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে।ওয়ার অন টেরর দিয়ে শুরু নতুন অধ্যায়হামলার মাত্র নয় দিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আনুষ্ঠানিকভাবে আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করেন। একই ভাষণে তিনি ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।বুশ সেদিন বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদ্দেশে বলেন, ‘আইদার ইউ আর উইথ আস, অর উইথ দেম’—অর্থাৎ এই যুদ্ধে হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকতে হবে, নয়তো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে।এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরেই আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন তালেবান সরকার ওসামা বিন লাদেনসহ আল-কায়েদার নেতাদের হস্তান্তরের মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর ওই অভিযান শুরু হয়।আফগানিস্তানের পর ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালে লিবিয়াতেও মার্কিন বাহিনী সামরিক অভিযানে অংশ নেয়।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার বলে আসেন, এসব অভিযান কোনো ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। তবে মুসলিম বিশ্বের অনেক মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়।কেন নাইন ইলেভেন এত গুরুত্বপূর্ণদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। এরপর নাইন ইলেভেনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে এত বড় হামলার ঘটনা আর ঘটেনি।তবে পার্ল হারবার ও নাইন ইলেভেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পার্ল হারবার ছিল একটি সামরিক স্থাপনা এবং তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। অন্যদিকে নাইন ইলেভেনে হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল এমন স্থাপনা, যেখানে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ কর্মরত ছিলেন।হতাহতের সংখ্যার দিক থেকেও নাইন ইলেভেন পার্ল হারবারকে ছাড়িয়ে যায়। পার্ল হারবারে নিহত হন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। নাইন ইলেভেনে চারটি বিমান ছিনতাই ও বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।১৭ মিনিটেই বদলে যায় পরিস্থিতিসকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৬৭ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১১০ তলা উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে। শুরুতে অনেকে এটিকে দুর্ঘটনা মনে করেছিলেন।কিন্তু মাত্র ১৭ মিনিট পর আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ পাশের ভবনে আঘাত করলে পরিষ্কার হয়ে যায়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়—পরিকল্পিত হামলা।দ্বিতীয় বিমানটির আঘাতের দৃশ্য সরাসরি টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এর পরই পুরো বিশ্ব জানতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নজিরবিহীন হামলার কথা।দুটি বিমানই বোস্টন থেকে লস অ্যাঞ্জেলস যাচ্ছিল। প্রতিটি বিমানে পাঁচজন করে ছিনতাইকারী ছিল। উড্ডয়নের পর তারা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিউইয়র্কের দিকে ঘুরিয়ে দেন।একই সময়ে আরও দুটি বিমান ছিনতাই করা হয়। সেগুলোর একটি পেন্টাগনে আঘাত করে। অন্যটি ক্যাপিটল হিলে হামলার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে সেটি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিধ্বস্ত হয়।মোট ১৯ জন ছিনতাইকারী ওই হামলায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন সৌদি নাগরিক, দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের, একজন মিসরের এবং একজন লেবাননের নাগরিক।আফগানিস্তান থেকে ইরাক, বদলে যায় মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিনাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর দুই বছর পর ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আগে থেকেই অসন্তোষ ছিল। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান সেই বিরোধিতাকে আরও তীব্র করে।আফগানিস্তানে অভিযানের আগে পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ হয়। তুরস্ক, মিসর, ইয়েমেন ও পাকিস্তানের পাশাপাশি ইতালি, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামেও মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।২০১১ সালে লিবিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযানের সময়ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়।নাইন ইলেভেনের পর বাড়ে ইসলামবিদ্বেষনাইন ইলেভেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতেই পরিবর্তন আনেনি; দেশটির অভ্যন্তরেও মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী হামলা বেড়ে যায়।এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণাসূচক অপরাধের ঘটনা ছিল ২৮টি। ১৯৯৯ সালে ছিল ৩২টি।কিন্তু ২০০১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১-তে। এর ৮০ শতাংশের বেশি ঘটনা ঘটে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর।পরবর্তী বছরগুলোতেও ইসলামবিদ্বেষী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় কোনো বছরই এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ১০০-এর নিচে নামেনি।নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর পরও তাই ওই হামলা শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতি, বৈদেশিক সামরিক অভিযান, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইসলামবিদ্বেষের আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা