এসএসসিতে ফেল, হাল ছেড়ো না
এসএসসি পরীক্ষার ফল
প্রকাশের পর
কারও
ঘরে
আনন্দ,
কারও
ঘরে
হতাশা।
কেউ
কাঙ্ক্ষিত ফল
পেয়েছে,
কেউ
প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল
করতে
পারেনি। কিন্তু
একটি
পরীক্ষার ফল
কি
সত্যিই
একজন
মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে
দিতে
পারে?
উত্তর-
না।দুঃখজনক হলেও
সত্য,
ফল
প্রকাশের পর
দেশের
বিভিন্ন জায়গা
থেকে
কয়েকজন
শিক্ষার্থীর আত্মহননের খবর
এসেছে।
তাদের
অনেকেই
পরীক্ষায় এক
বা
একাধিক
বিষয়ে
অকৃতকার্য হয়েছিল। এসব
ঘটনা
শুধু
কয়েকটি
পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি
নয়,
আমাদের
শিক্ষা
ও
মূল্যায়নব্যবস্থা এবং
সন্তানদের প্রতি
আমাদের
প্রত্যাশা নিয়েও
নতুন
করে
ভাবার
সুযোগ
তৈরি
করেছে।এ বছর
এসএসসি
ও
সমমান
পরীক্ষায় ১৮
লাখ
২৯
হাজার
৪৮৫
পরীক্ষার্থীর মধ্যে
পাস
করেছে
১১
লাখ
৩৮
হাজার
৮৭৭
জন।
অকৃতকার্য হয়েছে
৬
লাখ
৯০
হাজার
৬০৮
জন।
১১
শিক্ষা
বোর্ডে
গড়
পাসের
হার
৬২
দশমিক
২৫
শতাংশ।
গত
বছরের
তুলনায়
এ
হার
প্রায়
৬
দশমিক
২
শতাংশ
কম
এবং
গত
১৯
বছরের
মধ্যে
সর্বনিম্ন।অর্থাৎ এবার
বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল
পায়নি।
কিন্তু
তাঁদের
প্রত্যেকের সামনে
কি
জীবন
থেমে
গেছে?
নিশ্চয়ই নয়।একটি ফলাফল পুরো জীবন নয়এসএসসি একটি
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু
এটি
জীবনের
শেষ
পরীক্ষা নয়,
আবার
জীবনের
চূড়ান্ত মূল্যায়নও নয়।
একটি
পরীক্ষায় একটি
বা
কয়েকটি
বিষয়ে
অকৃতকার্য হওয়া
মানে
একজন
শিক্ষার্থী মেধাহীন- এমন
ধারণা
একেবারেই ঠিক
নয়।প্রতিটি মানুষের শেখার
গতি,
আগ্রহ,
দক্ষতা
ও
সম্ভাবনা আলাদা।
কেউ
গণিতে
ভালো,
কেউ
ভাষায়,
কেউ
বিজ্ঞানে আগ্রহী,
কেউ
প্রযুক্তি, ব্যবসা,
শিল্প,
কারিগরি কাজ
কিংবা
সৃজনশীল কোনো
ক্ষেত্রে নিজের
প্রতিভা প্রকাশ
করতে
পারে।তাই ফল
খারাপ
হওয়ার
পর
প্রথম
কাজ
হওয়া
উচিত
সমস্যাটি বোঝা-
কোথায়
ঘাটতি
ছিল,
কেন
ফল
প্রত্যাশিত হয়নি
এবং
কীভাবে
পরেরবার আরও
ভালো
করা
যায়।
নিজেকে
শেষ
করে
দেওয়া
কোনো
সমস্যার সমাধান
নয়
বরং
নতুনভাবে শুরু
করার
সুযোগটাই হারিয়ে
ফেলা।শিক্ষা
পদ্ধতি নিয়েও ভাবতে হবেঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা
ও
গবেষণা
ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড.
মোহাম্মদ মনিনুর
রশিদের
মতে,
দেশের
বিদ্যমান শিক্ষা
ও
পরীক্ষা পদ্ধতিও শিক্ষার্থীদের ওপর
বাড়তি
চাপ
তৈরি
করছে।
তাঁর
মতে,
দীর্ঘ
১০
বছরের
শিক্ষাজীবনের মূল্যায়ন কয়েক
ঘণ্টার
পরীক্ষার ওপর
নির্ভর
করা
আধুনিক
শিক্ষার সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।তিনি মনে
করেন,
শিক্ষার্থীর শেখার
ফল
বা
দক্ষতা
কতটা
অর্জিত
হয়েছে,
তার
বড়
অংশ
শ্রেণিকক্ষেই মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা
প্রয়োজন। কোনো
একটি
বিষয়ে
অকৃতকার্য হলে
শুধু
সেই
বিষয়েই
পুনরায়
পরীক্ষা দেওয়ার
সুযোগও
থাকা
উচিত।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা
ও
গবেষণা
ইনস্টিটিউটের সহকারী
অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান
চন্দনের বক্তব্যেও একই
ধরনের
পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা
উঠে
এসেছে।
তাঁর
মতে,
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য
বৃত্তিমূলক শিক্ষা
ও
বিকল্প
পথ
তৈরি
করা
গেলে
তাঁদের
হতাশা
কমানো
সম্ভব।এই কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ
একজন
শিক্ষার্থী হয়তো
প্রচলিত একাডেমিক পদ্ধতিতে ভালো
করতে
পারেনি,
কিন্তু
অন্য
কোনো
দক্ষতায় সে
অসাধারণ হতে
পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব হলো
সেই
সম্ভাবনাটুকু খুঁজে
বের
করার
সুযোগ
তৈরি
করা।ব্যর্থতা
থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পআমাদের আশপাশেই এমন
অনেক
উদাহরণ
রয়েছে,
যাঁরা
শিক্ষাজীবনের কোনো
এক
পর্যায়ে ব্যর্থ
হয়েও
পরবর্তী সময়ে
সফল
হয়েছেন।তাইমুর শাহরিয়ারের কথাই
ধরা
যাক।
স্কুলজীবনে ‘ফার্স্ট বয়’
ও
বৃত্তিপ্রাপ্ত এই
শিক্ষার্থী ২০০১
সালে
এসএসসিতে রসায়নে
পরপর
দুবার
অকৃতকার্য হন।
কিন্তু
তিনি
থেমে
যাননি।
২০০৩
সালে
জিপিএ
৩
দশমিক
৭৫
নিয়ে
এসএসসি
পাস
করেন।
পরে
এইচএসসিতে জিপিএ
৪
দশমিক
৮০
পান।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে
৩৩তম
বিসিএসে শিক্ষা
ক্যাডারে সারা
দেশে
প্রথম
হন।সাইফুল ইসলাম
সোহেলের গল্পও
অনুপ্রেরণার। ২০০৭
সালে
প্রথমবার এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার
পর
তিনি
উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন
এবং
৪০তম
বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।অভিনেতা জিয়াউল
হক
পলাশও
২০০৯
সালে
এসএসসিতে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। পরে
তিনি
মিডিয়া
অঙ্গনে
নিজের
জায়গা
তৈরি
করেন।
‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর ‘কাবিলা’ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি
ব্যাপক
পরিচিতি পান।দেশের বাইরেও
এমন
উদাহরণের অভাব
নেই।
আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক
মা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির
পরীক্ষায় ব্যর্থ
হয়েছেন,
চাকরিতেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। স্টিভ
জবস
কলেজ
শেষ
করেননি। বিল
গেটস
হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষ
না
করেই
প্রযুক্তি জগতে
বড়
পরিবর্তন এনেছেন। এসব
মানুষের সাফল্যের পথ
একরকম
ছিল
না।
কিন্তু
একটি
বিষয়
তাঁদের
মধ্যে
ছিল
অভিন্ন- ব্যর্থতার পর
তাঁরা
থেমে
যাননি।প্রিয় শিক্ষার্থী,
তোমার সামনে এখনো অনেক পথযারা এবার
এসএসসি
পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল
পাওনি,
তাদের
উদ্দেশে একটি
কথাই
বলতে
চাই-তুমি ফেল করেছ
একটি
পরীক্ষায়, জীবনে
নয়।আজ হয়তো
তোমার
মন
খারাপ।
বন্ধুদের ভালো
ফল,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের
আনন্দের ছবি
কিংবা
পরিবারের প্রত্যাশা তোমাকে
আরও
কষ্ট
দিতে
পারে।
মনে
হতে
পারে,
সবাই
এগিয়ে
যাচ্ছে
আর
তুমি
পিছিয়ে
পড়েছ।
কিন্তু
মনে
রেখো,
জীবন
কোনো
একদিনের দৌড়
নয়।তোমার সামনে
এখনো
অনেক
সময়
আছে।
যে
বিষয়ে
দুর্বলতা আছে,
সেটি
চিহ্নিত করো।
প্রয়োজনে শিক্ষক,
অভিভাবক বা
বন্ধুর
সাহায্য নাও।
আবার
পরীক্ষা দাও।
পাশাপাশি নিজের
আগ্রহ
ও
দক্ষতার জায়গাটিও খুঁজে
দেখো।
কারিগরি শিক্ষা,
বৃত্তিমূলক শিক্ষা,
দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ সামনে
রয়েছে
অনেক
পথ।অভিভাবকদের প্রতিও
অনুরোধ-
সন্তানের ফলাফলকে তার
পরিচয়
বানাবেন না।
একটি
নম্বর,
একটি
গ্রেড
বা
একটি
পরীক্ষার ফল
সন্তানের চেয়ে
বড়
হতে
পারে
না।
ফল
খারাপ
হলে
বকাঝকা
বা
অপমান
নয়,
এই
সময়ে
সন্তানের পাশে
দাঁড়ানোই সবচেয়ে
জরুরি।শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের বোঝাতে
হবে-
ভুল
করা
অপরাধ
নয়,
ব্যর্থ
হওয়াও
জীবনের
শেষ
নয়।
বরং
ব্যর্থতা থেকে
শিক্ষা
নিয়ে
আবার
চেষ্টা
করার
সুযোগই
জীবনের
অন্যতম
বড়
শক্তি।জীবনটাই
সবচেয়ে বড় সুযোগএসএসসি পরীক্ষার ফলাফল
একটি
শিক্ষাজীবনের একটি
ধাপের
ফল।
এর
সঙ্গে
মানুষের পুরো
জীবন,
মেধা,
চরিত্র,
স্বপ্ন
ও
সম্ভাবনাকে মাপা
যায়
না।আজ যে
শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে,
আগামীকাল সে
হয়তো
একজন
দক্ষ
প্রকৌশলী, শিক্ষক,
উদ্যোক্তা, শিল্পী,
কৃষিবিদ, চিকিৎসক, সরকারি
কর্মকর্তা কিংবা
অন্য
কোনো
পেশায়
সফল
মানুষ
হবে।
তার
জন্য
দরজা
বন্ধ
হয়নি;
শুধু
একটি
দরজায়
হয়তো
সে
এখনো
ঢুকতে
পারেনি।তাই প্রিয়
শিক্ষার্থী, ফল
খারাপ
হয়েছে
বলে
নিজেকে
ছোট
কোরো
না।
একটু
থামো,
নিজের
ভুলগুলো বোঝো,
প্রয়োজন হলে
সাহায্য নাও
এবং
আবার
শুরু
করো।মনে রেখো-
একটি
পরীক্ষার ফল
তোমার
ভবিষ্যৎ লিখে
দেয়
না।
তোমার
চেষ্টা,
সাহস,
শেখার
ইচ্ছা
এবং
বারবার
উঠে
দাঁড়ানোর ক্ষমতাই তোমার
ভবিষ্যৎ তৈরি
করবে।আর কোনো
পরিস্থিতিতেই নিজেকে
একা
করে
ফেলো
না।
খুব
বেশি
কষ্ট
বা
হতাশা
হলে
বাবা-মা, শিক্ষক, বন্ধু
বা
বিশ্বাসযোগ্য কারও
সঙ্গে
কথা
বলো।
সাহায্য চাওয়া
দুর্বলতা নয়
বরং
ঘুরে
দাঁড়ানোর প্রথম
পদক্ষেপ।মো. রাকিবুল ইসলাম
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী