ঢাকা    বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?

এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের শেখার পদ্ধতি, চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার জগতে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। এ প্রযুক্তির সহায়তায় অল্প সময়ে জটিল বিষয় শেখা এবং নতুন ধারণা তৈরি করা সহজ হচ্ছে। তবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে সৃজনশীল কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট ইন এআই কনশাসনেস হিয়ার’স হাউ দিস নিউ ইন্টেলিজেন্স ইজ নাউ শেপিং আওয়ার্স শিরোনামের এক নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন এআই নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এআইয়ের প্রভাব শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ নয় মানুষের জ্ঞান অর্জন, স্মৃতি, চিন্তাভাবনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য।ছয় সপ্তাহে দুই বছরের সমান শেখার অগ্রগতিশিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার শেখার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মানুষের দক্ষতা ও শিক্ষকের নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শিক্ষার্থীদের শেখার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নাইজেরিয়ার বেনিন সিটিতে পরিচালিত একটি গবেষণায় বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের জেনারেটিভ এআইভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা দেওয়া হয়। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা যে অগ্রগতি অর্জন করে, বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় দুই বছরের শেখার সমতুল্য।তবে এআই ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া গেলেই যে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দক্ষতা একই হারে বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীকে সরাসরি উত্তর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নাকি নিজে চিন্তা করে সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করা হচ্ছে।এআইয়ের ওপর নির্ভরতায় পরীক্ষার ফল কমতে পারেশিক্ষার্থীদের ওপর এআইয়ের প্রভাব বোঝার জন্য ২০২৩ সালে তুরস্কের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শেখা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদল পাঠ্যবই ব্যবহার করে গণিত অনুশীলন করে। অন্য দুই দল ব্যবহার করে জিপিটি-৪-এর সাধারণ সংস্করণ এবং এমন একটি বিশেষায়িত সংস্করণ, যা সরাসরি উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিতের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সমাধানের দিকে এগিয়ে দেয়। ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ জিপিটি-৪ ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনী পরীক্ষায় নম্বর প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু পরে বই ছাড়া পরীক্ষা দেওয়ার সময় তাদের ফল পাঠ্যবই ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।গবেষকদের ধারণা, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ ফলের একটি সম্ভাব্য কারণ। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত দিয়ে সমাধান খুঁজতে সাহায্য করা বিশেষায়িত এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল দেখা যায়নি। এ থেকে বোঝা যায়, এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত উত্তর পাওয়া এবং নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারা এক বিষয় নয়।সৃজনশীলতা বাড়লেও কমতে পারে বৈচিত্র্যলেখালেখি ও সৃজনশীল কাজেও এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২৯৩ জন লেখককে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় কয়েকজন লেখককে এআইয়ের দেওয়া গল্পের ধারণা ব্যবহার করতে বলা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা পাওয়া গল্পগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সৃজনশীল বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে, যাঁদের সৃজনশীলতার মাত্রা আগে তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তাঁদের কাজে উন্নতি বেশি দেখা গেছে।তবে এর পাশাপাশি গল্পগুলোর মধ্যে মিলও বেড়েছে। অর্থাৎ, এআই একজন লেখকের সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করলেও অনেকের সৃষ্টিশীল কাজ একে অপরের মতো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সৃজনশীলতার উন্নতি এবং সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল বৈচিত্র্য বজায় রাখা দুটিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।প্রযুক্তির কারণে দক্ষতা হারানোর আশঙ্কা নতুন নয়নতুন প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, এ নিয়ে উদ্বেগ বহু পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও লেখার প্রচলন মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। প্লেটোর ফেড্রাস সংলাপে লেখার আবিষ্কার নিয়ে আলোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল, লিখিত তথ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়লে মানুষ নিজের স্মৃতির পরিবর্তে বাইরের তথ্যভান্ডারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।তবে লেখার প্রচলন মানুষের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। বরং জ্ঞান সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও বিকাশের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষক মিলম্যান প্যারি বলকান অঞ্চলের দক্ষিণ স্লাভিক কবিদের মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখতে পান, অনেক কবি লিখতে না জানলেও স্মৃতি থেকে হাজার হাজার পঙ্‌ক্তির দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। তাঁরা প্রতিবার কবিতাগুলো নতুনভাবে উপস্থাপনও করতেন।এ উদাহরণ দেখায়, কোনো দক্ষতার চর্চা কমে গেলে সময়ের সঙ্গে তা হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তি নতুন সক্ষমতা তৈরি করলেও পুরোনো কিছু দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে।প্রযুক্তির সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবন ও মস্তিষ্কমানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। আগুনের ব্যবহার ও রান্নার প্রচলন মানুষের পূর্বপুরুষদের খাবার থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তি পেতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ সময়ে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষের দাঁত, চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন এসেছে।কৃষিকাজের প্রসার মানুষের পক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সহজ করেছে। তবে এর ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদ, ভেষজ, মাশরুম ও বেরির মধ্যে কোনগুলো খাওয়ার উপযোগী, সে বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কমেছে।পড়ার অভ্যাসও মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী স্তানিসলাস দ্যানে ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, পড়তে শেখার ফলে মস্তিষ্কের দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার একটি অংশ লিখিত শব্দ শনাক্ত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে মুখ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ওই অংশের প্রতিক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও আসতে পারে।দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেভলিন বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। মানুষের মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতা এবং সংস্কৃতির নমনীয়তা এ বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশ।এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ব্যবহারের ধরনের ওপরশেভলিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন একটি মাধ্যম। এটি একদিকে এমন কিছু কাজ করতে পারছে, যা আগে প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না; অন্যদিকে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা সম্প্রসারণের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।তবে এআই মানুষের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। কীভাবে এটি তৈরি করা হচ্ছে এবং মানুষ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা গবেষণায় সরাসরি উত্তর দেওয়া এআই এবং নিজে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করা এআইয়ের ফলাফলে পার্থক্য দেখা গেছে। অর্থাৎ, এমনভাবে এআই ব্যবহার করা সম্ভব, যাতে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার ক্ষমতা বিকশিত হয়।মানবজাতি এখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে মানুষের কী ধরনের সুবিধা বা ক্ষতি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতাও রয়েছে।

এআই দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া অপরাধ, বললেন মেহজাবীন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি এবং তাঁকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। একই সঙ্গে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি।আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন এই অভিনেত্রী।পোস্টে মেহজাবীন লেখেন, এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়, বরং অপরাধ। একই কনটেন্ট যখন শত শত কিংবা হাজারো মানুষ শেয়ার করতে থাকেন, তখন বিষয়টি আর শুধু একজনের অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার চিত্র তুলে ধরে। এ পরিস্থিতিতে সমাজ হিসেবে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার জন্য তাঁকে নিজের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন—এমন প্রশ্নও তুলেছেন মেহজাবীন। তিনি লেখেন, এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদে ‘এমনটা যদি আপনার মা কিংবা বোনের সঙ্গে ঘটত’—এ কথা বলতেও তাঁর আর ইচ্ছা করে না। কারণ, একজন মানুষকে সম্মান করার জন্য তাঁর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকার প্রয়োজন কেন?অপমান করে আয়, প্রশ্ন মেহজাবীনেরসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, লাইক, শেয়ার ও ট্রেন্ডিংয়ের মাধ্যমে আয় করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মেহজাবীন।তিনি লেখেন, কিছু ভিউ, লাইক ও শেয়ার পাওয়া, ট্রেন্ডিংয়ে থাকা কিংবা সেখান থেকে কয়েক ডলার আয়—এসবের জন্য অন্য একজন মানুষের অপমান ও অসম্মানকে কীভাবে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নেওয়া হচ্ছে, সেটি ভাবার বিষয়।মেহজাবীন বলেন, মানুষের জীবনে নানা ধরনের সংগ্রাম রয়েছে। অনেকের জন্য কনটেন্ট তৈরি এখন জীবিকা নির্বাহের একটি উপায়। তিনি সেই বাস্তবতা অস্বীকার করেন না। তবে প্রশ্ন হলো, কবে থেকে অন্য একজন মানুষের অপমান ও অসম্মান মানুষের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল?শিকার হতে পারেন যে কেউএ ধরনের ঘটনা শুধু নারী কিংবা পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলেও মন্তব্য করেছেন মেহজাবীন। তাঁর মতে, ভিউ, এনগেজমেন্ট ও ট্রেন্ডিংয়ের প্রতিযোগিতা এখন লিঙ্গের সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যে কেউ যুক্ত হতে পারেন, আবার এর শিকারও হতে পারেন যে কেউ।মেহজাবীন লেখেন, তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় শুধু সেই ব্যক্তি নন, যিনি এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করছেন; বরং সেই অসংখ্য মানুষও, যাঁরা স্বেচ্ছায় সেগুলো শেয়ার করছেন, আলোচনা করছেন এবং আরও হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।এ ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে একজন অপরাধীর অপরাধে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজের বিবেকহীনতার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

এআই দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া অপরাধ, বললেন মেহজাবীন

নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই, সতর্ক করল অ্যানথ্রপিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, ছোট ও মাঝারি আকারের এআই মডেলগুলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ ধরনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মডেলগুলোকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।সোমবার রাতে প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রপিক জানায়, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো এআই ইন্টারনেট-সংযুক্ত বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজস্ব বটনেট তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে এটি দ্রুত এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারে, বন্ধ করার প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে পারে এবং নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ডেটা সেন্টারেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এমন ঝুঁকির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অন্যরা মনে করছেন, অ্যানথ্রপিক বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে।অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডারিও আমোডেই গত মাসে প্রথম এ ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা, আগামী এক বছরের মধ্যে, এমনকি তার আগেও, এআই পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং ইন্টারনেটজুড়ে স্থায়ী একটি বটনেট গড়ে তুলতে পারে।নিজেদের প্রতিলিপি তৈরির সক্ষমতা কতটাঅ্যানথ্রপিকের নতুন ব্লগ পোস্টে বলা হয়েছে, তাদের পরীক্ষায় ৩০ বিলিয়ন বা তার কম প্যারামিটারবিশিষ্ট মাঝারি আকারের এআই মডেলগুলোকে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে দেখা গেছে। তবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নির্ভরযোগ্যভাবে শেষ করতে এখনো তাদের সমস্যা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত কম খরচের বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এআই মডেলগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা সংগ্রহ করতে পারে। একটি সরলীকৃত পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কে মডেলগুলোকে এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তেও দেখা গেছে।অ্যানথ্রপিকের মতে, এভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম কোনো ব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। কারণ, এ ধরনের নেটওয়ার্কে বন্ধ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নাও থাকতে পারে। ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এআই সিস্টেম নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নতুন এই বিশ্লেষণ তাতে আরও মাত্রা যোগ করেছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় সাইবার হামলা, মানুষের সীমিত তদারকিতে কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী ও কর্মীরাও দ্রুতগতিতে এআইয়ের উন্নয়ন নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তাঁদের কেউ কেউ নিয়ন্ত্রণহীন এআই বিকাশের ফলে গুরুতর, এমনকি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তা নিয়ে সংশয়তবে অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন সব সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়েরান মার্টিন মনে করেন, পরীক্ষায় ছোট আকারের এআই মডেল চালাতে পারা মানেই বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়া নয়। তিনি বলেন, আমরা সস্তা টেলিভিশনে একটি ছোট মডেল চালাতে পেরেছি এতেই নিরাপত্তাসংকট তৈরি হয়েছে, এমনটা বলা যায় না।মার্টিনের মতে, অ্যানথ্রপিকের পোস্টটি একটি আকর্ষণীয় প্রযুক্তিগত গবেষণাপত্র হলেও এতে বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঝেংশিয়ং লি বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পরীক্ষাগুলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হলেও এআই কার্যত একটি ‘ওয়ার্ম’-এ পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা উদ্বেগজনক।কম্পিউটার নিরাপত্তার ভাষায়, ওয়ার্ম হলো এমন এক ধরনের ক্ষতিকর প্রোগ্রাম, যা নিজে থেকেই প্রতিলিপি তৈরি করে বিভিন্ন ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। লি বলেন, কোনো কেন্দ্রীয় সেবার ওপর নির্ভর না করে এ ধরনের ব্যবস্থা অসংখ্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়লে সেটি বন্ধ করার মতো নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নাও থাকতে পারে।২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সক্ষমতা অর্জনের আশঙ্কাঅ্যানথ্রপিকের অনুমান, ছোট আকারের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা অতীতের ধারায় বাড়তে থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।প্রতিষ্ঠানটি আরও আশঙ্কা করছে, এআই মডেলগুলো নিজেদের কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়াতে আরও শক্তিশালী অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টারের প্রসেসরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে পারে। এমনটা সম্ভব হলে তারা অনেক বড় পরিসরে কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে। তবে একজন গবেষকের মতে, অ্যানথ্রপিকের বক্তব্যকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই এর নিরাপদ ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার প্রতিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তা সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।সূত্র: রয়টার্স

নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই, সতর্ক করল অ্যানথ্রপিক

চীনে এআই চিপের বাজারে এনভিডিয়ার আধিপত্য কমছে, এগোচ্ছে হুয়াওয়ে

চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার অংশীদারত্ব কমেছে। বিপরীতে, চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বাজার হিস্যা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং দেশীয় প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে বেইজিংয়ের নীতির কারণে বাজারে এই পরিবর্তন ঘটছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইডিসি (IDC)।রয়টার্সের দেখা আইডিসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত এআই চিপের বাজারে এনভিডিয়ার অংশীদারত্ব কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি চীনে ৬ লাখ ৭৮ হাজার এআই অ্যাকসেলারেটর চিপ সরবরাহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম।এআই অ্যাকসেলারেটর হলো বিশেষ ধরনের চিপ, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।অন্যদিকে, একই সময়ে হুয়াওয়ে ৫ লাখ ৭২ হাজার এআই অ্যাকসেলারেটর সরবরাহ করেছে। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ ছিল ৩ লাখের বেশি। এর ফলে চীনের এআই চিপের বাজারে হুয়াওয়ের অংশীদারত্ব বেড়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় চাপে এনভিডিয়াবিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে এনভিডিয়ার উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ রয়েছে। ওয়াশিংটনের এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনে কোন ধরনের চিপ সরবরাহ করা যাবে, তা সীমিত হয়ে পড়েছে।অন্যদিকে, চীনের সরকার দেশীয় প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানির উপযোগী এনভিডিয়া চিপ কেনার ক্ষেত্রেও অনুমোদন নিতে হচ্ছে।এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এ নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান চীনের ৫ হাজার কোটি ডলারের এআই চিপের বাজার হুয়াওয়ের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।তবে চীনের বাজারে এনভিডিয়ার ৩৪ শতাংশ অংশীদারত্বের মধ্যে কোন কোন পণ্যের হিসাব রয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি আইডিসি। চীনে রপ্তানি নিষিদ্ধ বি২০০ ও বি৩০০-এর মতো উন্নত চিপের হিসাব এতে রয়েছে কি না, তা-ও জানা যায়নি। এসব চিপ চোরাচালানের মাধ্যমে চীনে প্রবেশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও এনভিডিয়া তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।চীনা চিপ নির্মাতাদের বাজার সম্প্রসারণএনভিডিয়া ও হুয়াওয়ের বাইরে চীনের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এআই চিপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। আইডিসির তথ্য অনুযায়ী, আলিবাবার চিপ নকশা বিভাগ টি-হেডের বাজার অংশীদারত্ব ৭ শতাংশ। এরপর ক্যামব্রিকনের ৫ শতাংশ, বাইদুর কুনলুনশিনের ৪ শতাংশ এবং হাইগনের ৩ শতাংশ।আইডিসির পর্যবেক্ষণে থাকা চীনের ১১টি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টির সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে মোট এআই অ্যাকসেলারেটর সরবরাহ হয়েছে ২০ লাখ ৮ হাজার ইউনিট।এ সময়ে এআই মডেল প্রশিক্ষণে বহুল ব্যবহৃত গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সরবরাহ ২৬ শতাংশ কমে ৯ লাখ ৯১ হাজার ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। মূল ভূখণ্ড চীনে বিক্রির অনুমতি রয়েছে—এমন চিপের সরবরাহ সীমিত থাকায় জিপিইউয়ের বাজারে এই পতন হয়েছে বলে জানিয়েছে আইডিসি।অন্যদিকে, নির্দিষ্ট এআই কাজের জন্য তৈরি অন্যান্য অ্যাকসেলারেটর চিপের সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ১৬ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। ফলে প্রথমবারের মতো সরবরাহের সংখ্যায় জিপিইউকে ছাড়িয়ে গেছে এই শ্রেণির চিপ।চিপের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতায় গুরুত্বআইডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিপিইউ ছাড়া অন্যান্য এআই চিপের বাজারের ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে হুয়াওয়ে, টি-হেড, কুনলুনশিন ও ক্যামব্রিকন। সরকারি সংস্থা, ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং টেলিযোগাযোগ সেবাদাতাদের মধ্যে এসব চিপের ব্যবহার বাড়ছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই চিপের বাজারে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাচ্ছে। এখন শুধু একটি চিপের কর্মক্ষমতা নয়, বরং একাধিক চিপ একসঙ্গে যুক্ত করে বড় কম্পিউটিং ব্যবস্থা পরিচালনার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।এ প্রবণতা চীনের এআই অবকাঠামো নির্মাণে দেশীয় চিপের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণনীতি বিশ্বের অন্যতম বড় এআই বাজারে এনভিডিয়ার অবস্থানকে চাপে ফেলছে।সূত্র: রয়টার্স

চীনে এআই চিপের বাজারে এনভিডিয়ার আধিপত্য কমছে, এগোচ্ছে হুয়াওয়ে

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বাস্তব রাজনীতিকদের দিয়ে কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেখিয়ে তৈরি এসব বিজ্ঞাপন অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বলে বোঝা গেলেও ভোটারদের মনোভাব গঠনে প্রভাব ফেলছে। এ নিয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, পক্ষপাত ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রশ্ন।যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিজ্ঞাপনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এমন সব বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে যা ঘটেনি। বিজ্ঞাপনগুলোর অনেকগুলোই যে কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা স্পষ্ট। তবু ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।নিউইয়র্কের গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের একটি বিজ্ঞাপনে শহরটির মেয়র জোহরান মামদানি ও গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে একসঙ্গে বাগান করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন তাঁরা বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনায় একমত। আরেকটি বিজ্ঞাপনে হোকুলকে বলতে শোনা যায়, তিনি টোল ও যাতায়াতের ভাড়া বাড়াতে চান, যাতে মানুষ গাড়ি বা পাতালরেলে চলাচলের সামর্থ্য হারায়।তবে এসব বিজ্ঞাপনে হোকুল কিংবা মামদানি কেউই অংশ নেননি। এআই ব্যবহার করে তাঁদের কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।ভুয়া বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি ডলারের ব্যয়নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিনীতি কেন্দ্রের পরিচালক স্কট বাবওয়া ব্রেনেন মনে করেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে এমন বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি। তিনি এ ধরনের প্রচারকে বলেছেন ‘স্লপাগান্ডা’। নিম্নমানের এআই-নির্মিত উপাদান ও প্রচারণামূলক অপতথ্যের সমন্বয়ে শব্দটি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল স্লপাগান্ডা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের সহলেখক তিনি।নির্বাচনী বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী নির্দলীয় সংস্থা ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী মৌসুমে রাজনৈতিক প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা এআই ব্যবহার করে ১৬৪টির বেশি বিজ্ঞাপন তৈরিতে আট কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। এসব বিজ্ঞাপনের প্রায় ৮০ শতাংশের পেছনে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।ব্লেকম্যান অবশ্য তাঁর বিজ্ঞাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো এআই দিয়ে তৈরি—এ কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞাপনের শুরুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এ বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেখানো হয়। তাঁর মতে, মার্কিন রাজনীতিতে ব্যঙ্গ ও পরিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপন সেই ঐতিহ্যেরই অংশ।তবে ব্রেনেনের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য সব সময় সরাসরি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নয়। বরং কোনো প্রার্থীর চরিত্র, আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ভোটারদের মনে একটি ধারণা তৈরি করাও এর লক্ষ্য। এসব বিজ্ঞাপন তথ্যগত সত্যের চেয়ে ‘গভীরতর সত্য’ তুলে ধরার দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে তা ভোটারদের আস্থা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।কাউকে অবাঞ্ছিত অতিথি, কাউকে সুপারহিরোএআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের নানা অস্বাভাবিক ও ব্যঙ্গাত্মক ভূমিকায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওহাইওতে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউনকে একটি পার্টিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এমন এক অতিথি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাঁর উপস্থিতি আর কেউ পছন্দ করছে না।টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ চলচ্চিত্রের মারিয়া চরিত্রের মতো নীল পোশাকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে সুপারহিরোর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে।তবে এ ধরনের বিজ্ঞাপন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে ব্যঙ্গ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য সিনেটর স্কট উইনারের একটি এআই-চালিত চ্যাটবট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চ্যাটবটটি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যান সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছিল।প্রায় পাঁচ হাজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চ্যাটবটটিতে চ্যানের বিরুদ্ধে শহরে আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যঙ্গ করা হয়। পাশাপাশি তাঁর উচ্চারণ ও নাগরিকত্ব নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। এতে পক্ষপাত ও বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে চ্যাটবটটি সরিয়ে নেন উইনার। তিনি স্বীকার করেন, উদ্যোগটি নতুনত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও মানবাধিকার গবেষণাকেন্দ্র স্টারলিং ল্যাবের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অ্যাডাম রোজ মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত নয়। কারণ, এআইয়ের কিছু ব্যবহার কেবল বিজ্ঞাপনের রং বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের মতো সাধারণ সম্পাদনার মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।তবে তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহার করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত প্রার্থীদেরই নিতে হয়। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেয় এবং ভোটারদের কাছে তাঁদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। উইনারের চ্যাটবটের উদাহরণ টেনে রোজ বলেন, ওই উদ্যোগ ভোটারদের কাছে উইনারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি বার্তা দিয়েছে।এআই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় আইন নেইযুক্তরাষ্ট্রে এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। তবে ৩১টি অঙ্গরাজ্য এ ধরনের বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করার বিধান রেখে নিজস্ব আইন করেছে।ওয়াশিংটনভিত্তিক ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের এআই নীতি বিভাগের পরিচালক ইলানা বেলার বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অঙ্গরাজ্যগুলো এ ধরনের আইন করছে। তবে তাঁর মতে, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োজন।এআই বিজ্ঞাপনের ব্যবহার নিয়ে রোজ ও বেলারের অবস্থানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। রোজ মনে করেন, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, বেলার জোর দেন বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি ভোটারদের কাছে সহজে বোধগম্য করে তোলার ওপর।সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনে উইনারের প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যানের মুখপাত্র ইয়ান ক্রেগার মনে করেন, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।ক্রেগারের ভাষ্য, এআইয়ের বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে এর ব্যয় যেন শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। তাঁর অভিযোগ, চ্যান শ্রমজীবী পরিবারগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর উইনার এআই কোম্পানিগুলোর পক্ষে।উইনার গত বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রস্তাবিত বিধানে বড় আকারের এআই মডেল থেকে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনা প্রকাশ করতে হতো। পরে তুলনামূলক শিথিল একটি সংস্করণ আইনে পরিণত হয়। এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে উইনারের দপ্তর সাড়া দেয়নি।খাবারের মোড়কের মতো স্পষ্ট লেবেল চান বিশেষজ্ঞরানভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ পর্যায় ও পরবর্তী সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানোর পক্ষে মত দিয়েছেন পাবলিক সিটিজেনের ইলানা বেলার।তাঁর মতে, খাবারের মোড়কে যেমন উপাদানের তথ্য সহজে বোঝা যায়, তেমনি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেও এআই ব্যবহারের লেবেল হতে হবে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য। এতে ভোটারেরা বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।বিশেষ করে তরুণ ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন বেলার। তাঁর মতে, মানুষকে এসব বিজ্ঞাপনের লেবেল শনাক্ত করতে শেখাতে হবে।নিউইয়র্কে ব্লেকম্যানের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বোর্ডে অভিযোগ করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো তথ্য প্রকাশের বিধি লঙ্ঘন করেছে এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। তবে ব্লেকম্যানের বক্তব্য, মানুষ এসব বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছে এবং ব্যঙ্গ পছন্দ করছে।ব্রেনেনের মতে, রাজনৈতিক প্রার্থীরা জানেন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে নির্বাচনী প্রচারে সুবিধা পাওয়া যায়। এ কারণেই এআই দিয়ে তৈরি এমন বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করবেন না।বেলারের ভাষ্য, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাবও দেখা যাচ্ছে।প্রযুক্তির সহজলভ্যতা রাজনৈতিক প্রচারে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা ও কল্পিত দৃশ্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের তথ্য কতটা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে এবং ভোটারেরা সেই তথ্য কতটা বুঝতে পারছেন সমধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ প্রশ্নগুলোই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল

মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই এর বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ব্যবহার বাড়ানোও ঝুঁকিপূর্ণ।মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কে জিতবে—মূল প্রশ্ন সেটি নয়। বরং মানুষের তৈরি সমাজে যন্ত্রের সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।বিশ্বে এআই নিয়ে দুটি বিপরীত ধারণা রয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, এ প্রযুক্তি মানবজাতির প্রায় সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, এআই মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে এর সুফল ও ঝুঁকি—দুটিই বিবেচনা করা প্রয়োজন।প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে মানুষ কীভাবে সেটি তৈরি, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলালেও সব পরিবর্তন ইতিবাচক হয়নি।এআইয়ের প্রভাব কর্মক্ষেত্রেও পড়ছে। নথি যাচাই, ই-মেইল লেখা কিংবা পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ এআই করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরির চাহিদা কমতে পারে। এতে বেকারত্বের পাশাপাশি মানুষের আয়, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।তবে এআইয়ের সুফলও রয়েছে। চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ে এটি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করানো গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ভুলও কমানো যেতে পারে।তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে—ভুল সিদ্ধান্তের দায় নেবে কে? এআই মানুষের ভুল কমাতে পারে, আবার মানুষের বিচারবোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।ভুল তথ্য ছড়ানো, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও এআই নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে কম খরচে ও দ্রুত বিপুল পরিমাণ ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে সত্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে উঠবে।সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কোনো যন্ত্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় কার—প্রোগ্রামার, সামরিক কমান্ডার, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি রাষ্ট্র—তা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলার অর্থ গবেষণা বন্ধ করা নয়। বরং কোথায় এআই ব্যবহার করা হবে, কোথায় হবে না এবং কী গতিতে এর ব্যবহার বাড়বে—সে বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, মানবিক জবাবদিহি ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াই নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ যন্ত্রের শক্তিকে নিজের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবে কি না। এআইকে মানুষের হাতে থাকা শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই রাখা ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো

মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে

ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা

নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ট্রেনেই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় গত চার বছর আট মাসে ৩ হাজার ১৬১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৭৮৬টি, ২০২৩ সালে ৬৩৯টি, ২০২৪ সালে ৬৪৫টি, ২০২৫ সালে ৮৫১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ২৫০টি মামলা হয়েছে। মামলার নথি পর্যালোচনায় গত চার বছরে ট্রেনে চুরির ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।রেলওয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, এসব অপরাধে জড়িতদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। তারা অনেক সময় যাত্রীবেশে ট্রেনে উঠে অপরাধ করে নিকটবর্তী স্টেশনে নেমে যায়। কেউ কেউ চলন্ত ট্রেন থেকেও দ্রুত নেমে পালিয়ে যায়।ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগসাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে ছিনতাইয়ের সময় যাত্রীদের ছুরিকাঘাত ও চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।গত ৮ মে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ওমর ফারুক শাওন আহত হন। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে ট্রেনে ওঠার পর চার ছিনতাইকারী তাঁকে পেটে ছুরিকাঘাত করে ৩ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগে ৪ মে মালিবাগ এলাকায় একটি ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ইব্রাহিম নামে এক যুবক আহত হন।গত ৮ জুন বনানী এলাকায় মাহিদুল ইসলাম নামে এক স্কুলশিক্ষার্থীকে মারধর ও ব্লেড দিয়ে আঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। পরে তাঁকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।২০ জুন তেজগাঁও এলাকায় চট্টলা এক্সপ্রেসে তোফায়েল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কয়েকজন ছিনতাইকারী। বাধা দিলে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় তারা।১৪ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর থেকে জামালপুরগামী ব্রহ্মপুত্র ট্রেনে সাজিদ নামে এক যুবকের কাছ থেকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আর ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হাফিজুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে টাকা ও আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার একপর্যায়ে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টিও সক্রিয়রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন রুটের ট্রেনে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টি, টানা পার্টি, ঝুলন্ত ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের তৎপরতাও রয়েছে। কেউ কেউ চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করে যাত্রীকে অজ্ঞান করে মালামাল লুটে নেয়।রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিকুলিন চাকমা বলেন, ট্রেনে তল্লাশি ও প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ট্রেনে পুলিশের গার্ড ডিউটিও বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাবে।অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নজরদারি কম থাকার কারণে অপরাধ বাড়ছে। রেলব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।জনবল সংকট, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিরেলওয়ে পুলিশের মোট জনবল ২ হাজার ৪৯৩ জন। ছয়টি রেলওয়ে জেলায় রয়েছে ২৪টি থানা ও ৩৩টি ফাঁড়ি। সীমিত জনবল দিয়ে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ায় অতিরিক্ত জনবল চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, স্টেশন ও চলন্ত ট্রেনে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দেহ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।অপরাধী শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক স্টেশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো ট্রেনে অপরাধ ঘটলে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধী শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ট্রেনে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য নতুন করে ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম)-এ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে পুলিশ। এতে অপরাধীর বর্তমান অবস্থান ও মামলার সর্বশেষ তথ্য রাখা হবে। ফলে পুনরায় অপরাধে জড়ালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।

ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা

গবেষণা থেকে বাস্তব সমাধানের পথে এআইইউবির উদ্যোগ

গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) আয়োজন করেছে গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘গবেষণা থেকে বাস্তবতা’ কীভাবে আমরা বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহনের সম্ভাব্যতা প্রকল্প তৈরি করেছি। অনুষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৩লিফ টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইর্তিজা আহম্মদ রাইফা। অনুষ্ঠানে এআইইউবির উপাচার্য, অধ্যাপক, শিক্ষক, গবেষক, বিশেষ অতিথি ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ সময় এআইইউবির গবেষণা দলের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রচলিত তিন চাকার রিকশার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক যানবাহন নিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের গবেষণা পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, স্মার্ট ও নিরাপদ চলাচল এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।অনুষ্ঠানে ৩লিফ টেকনোলজিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল বলেন- বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে গবেষণা ও সম্ভাব্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক গবেষণার মাধ্যমে একটি সম্ভাবনাময় ধারণাকে বাস্তব, কার্যকর ও টেকসই প্রকল্পে রূপ দেওয়া সম্ভব।প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এআইইউবির শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভবিষ্যতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও টেকসই পরিবহন নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহের কথাও জানানো হয়।সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তব সমাধানে রূপ দিতে পারে। গবেষণা যেন শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনে কার্যকর প্রভাব ফেলে, এ ধরনের উদ্যোগ সেই পথ তৈরি করতে পারে।অনুষ্ঠানে তরুণদের গবেষণা, মেধা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, গবেষণা থেকে উদ্ভাবন, উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন এবং সেখান থেকে মানুষের জন্য কার্যকর সমাধানের পথ তৈরি হবে।

গবেষণা থেকে বাস্তব সমাধানের পথে এআইইউবির উদ্যোগ

জিপিএ-৫-এর কৃত্রিম বন্যা বন্ধ করে শিক্ষায় আসছে বড় সংস্কার

শিক্ষাব্যবস্থায় মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।তিনি বলেন, জিপিএ-৫-এর কৃত্রিম বন্যা দেখিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল বার্তা দেওয়ার পথ বন্ধ করা হয়েছে। এখন দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে।সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের শিক্ষা কাঠামো, নতুন শিক্ষাক্রম, শিক্ষক মূল্যায়ন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন, কারিগরি শিক্ষা, শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় এবং কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র নিয়ে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন।২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে বড় পরিবর্তনমাহদী আমিন বলেন, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের শিক্ষাক্রম নতুন করে সাজানো হবে। পুরো কারিকুলামে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার আনা হবে। এর মাধ্যমে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি টেকসই শিক্ষাক্রম তৈরি করা হবে।তবে এর আগে অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বই ও বিষয় যুক্ত করার কথা জানান মাহদী আমিন। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।এবার কোনো গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নিসাম্প্রতিক এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, আগের সময়ে পরিসংখ্যান ভালো দেখানোর জন্য কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫ বাড়ানোর প্রবণতা ছিল। এমনকি পরীক্ষা না দিয়েও পাস করিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সেই আত্মঘাতী পথ বন্ধ করেছি। এবার কোনো গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা শতভাগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়নে তাদের জিপিএ ও জেনুইন ফলাফল পেয়েছে।’ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণএসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য কিংবা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র বোঝা হিসেবে দেখবে না বলে জানান মাহদী আমিন।তিনি বলেন, এসব তরুণকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি), স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ভোকেশনাল কোর্সে যুক্ত করা হবে। তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। প্রয়োজনে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।বিভাগ ও জেলায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জবেকারত্ব কমাতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।মাহদী আমিন বলেন, এসব কেন্দ্রে কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীরা নিজেদের দক্ষতার তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন। এর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিদাতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে।প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে এবং পরে দেশের প্রতিটি জেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাবশিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করা এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির কথা জানান মাহদী আমিন।তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব স্তরের শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ট্যাবলেট দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় গুরুত্ববিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মাহদী আমিন।স্থানীয় শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ব্রেন ড্রেন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।পাশাপাশি গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমানোর উদ্যোগগ্রামীণ ও শহরের বিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য কমাতে দেশব্যাপী বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা।এর মধ্যে রয়েছে প্রাইমারি স্কুল গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং ইনোভেশন ও স্টার্টআপ কম্পিটিশন। এসব আয়োজনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের প্রতিভা জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। মাহদী আমিন বলেন, শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয় দক্ষতা, কর্মসংস্থান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জিপিএ-৫-এর কৃত্রিম বন্যা বন্ধ করে শিক্ষায় আসছে বড় সংস্কার

এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কাজের গতি বাড়াতে এর ব্যবহার হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ায় মিস-ইনফরমেশন ও ডিপফেক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তিবিদদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এআইয়ের অপব্যবহার সাইবার অপরাধ আরও জটিল করে তুলতে পারে।প্রযুক্তিবিদদের মতে, এআই ব্যবহার করে এমন ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয় যে সেগুলো ভুয়া। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ডেটা নিরাপত্তা এবং এআই মডেলের পক্ষপাত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভুয়া তথ্য ও ডিপফেক। এগুলো মোকাবিলায় মানুষের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।এখনো হয়নি এআই নীতিমালাদেশে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা প্রণয়ন হয়নি। সরকার জানিয়েছে, এআই নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে এবং এ ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।গত ৭ জুলাই আইসিটি টাওয়ারে টেলিকম বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের কাছে এআই নীতিমালা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে এবং শিগগির নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এআই যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে, তেমনি এর অপব্যবহারও নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ও জনমত প্রভাবিত করার কাজে এআই ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ভুয়া ভিডিওসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে অনেকেই সেগুলোকে বাস্তব ঘটনা মনে করছেন। বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ও তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা হলেও প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মানুষ তা করতে পারছেন না।সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শেখ হাসিনাকে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যৌথ সংবাদ সম্মেলন করতে দেখা যায়। পরে ভিডিওটি ভুয়া বলে জানা যায়।তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে বাংলাদেশে ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে এআই দিয়ে তৈরি প্রায় এক হাজার ভুয়া ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এসব ভিডিও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।রাজনৈতিক কনটেন্টেও অপব্যবহারের অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এআইয়ের অপব্যবহার শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই আলোচনার বিষয়। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নির্বাচনী জনমত প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্র ‘Preparing for Artificial Intelligence and Other Challenges to Election Administration’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদপ্রযুক্তিবিদদের মতে, এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে অনেক কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। ফলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এআই নীতিমালা তৈরির জন্য সরকার একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ইউনেস্কোর পরামর্শ নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে।

এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ