চীনে ঝুঁকি বাড়ায় ভারতে বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ
চীনে ভূরাজনৈতিক
ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার মধ্যে ভারতের বাজারে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে
জাপানি কোম্পানিগুলো। ভোক্তা পণ্য, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন
খাতে দেশটিতে জাপানি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।বিবিসির এক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের
বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল গত সপ্তাহে জাপানে
দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের
নেতৃত্ব দিয়েছেন। সফরে দুই দেশের
মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক
আরও বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।ভারতের মুম্বাই,
দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর শপিংমল
ও প্রধান সড়কে এখন জাপানি
ব্র্যান্ডের উপস্থিতি আগের চেয়ে বেশি
দৃশ্যমান। ইউনিক্লো, মুজি ও অনিতসুকা
টাইগারের মতো প্রতিষ্ঠান দেশটিতে
ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।জাপানের আসবাব
প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিটোরিও সম্প্রতি ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া জাপানি
কনভেনিয়েন্স স্টোর চেইন লসনও ভারতে
প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে
দেশটিতে ১০ হাজার দোকান
খোলার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর কার্যক্রম মুম্বাই
থেকে শুরু হওয়ার কথা।ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগভারতের আর্থিক
খাতেও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। অন্য বিদেশি ঋণদাতারা
ভারতের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে সরে গেলেও
জাপানি ব্যাংকগুলো দেশটির আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।জাপানের সবচেয়ে
বড় ব্যাংক এমইউএফজি গত বছর ভারতের
আর্থিক খাতে ৪ দশমিক
৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করে শ্রীরাম ফাইন্যান্সের
২০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। এটিকে ভারতের আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড়
বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।একই বছর
সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ভারতের ইয়েস ব্যাংকের ২৪
দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার
কিনে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত
হয়।ভারতের গ্লোবাল
ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা জিসিসি ব্যবস্থাতেও
জাপানি কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ছে। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য
অনুযায়ী, ভারতে শতাধিক জাপানি প্রতিষ্ঠান জিসিসি পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্রে গবেষণা
ও উন্নয়ন, করপোরেট কৌশল ও কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হচ্ছে।ভারতের দিকে
কেন
ঝুঁকছে জাপাননেক্সট ভারত
ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা ভিপুল নাথ জিন্দাল বিবিসিকে
বলেন, প্রবৃদ্ধির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে
এখন ভারতের দিকে তাকাতে হচ্ছে।
কারণ, জাপানের স্থানীয় জনসংখ্যা গত ১৬ থেকে
১৭ বছর ধরে কমছে।
এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজারের আকারও
সংকুচিত হচ্ছে।অন্যদিকে জাপানি
ব্যবসার প্রচলিত বাজারগুলোর আকর্ষণও কিছুটা কমেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের
কারণে চীনে বিনিয়োগ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার
কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর বাজারও
ভারতের তুলনায় ছোট।এই পরিস্থিতিতে
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের বাজারকে
জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে সম্ভাবনাময় গন্তব্য
হিসেবে দেখা হচ্ছে।দুই
দেশের
সম্পর্কের ভিত্তিভারত ও
জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরালো হয়
প্রায় দেড় দশক আগে
বাণিজ্য উদারীকরণের একটি চুক্তির মাধ্যমে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের
সম্পর্ককে বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের
পর্যায়ে উন্নীত করা হয়।সে সময়
ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া
হয়। পাশাপাশি মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত
ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়।তবে সাম্প্রতিক
সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক
সম্পর্ক সম্প্রসারণে জাপানের বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখছে।জুলাইয়ে জাপানের
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম দিল্লি সফরের সময় অনুষ্ঠিত এক
গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ১২ দশমিক ৫
বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা
দেয়। এসব বিনিয়োগের মধ্যে
সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ জ্বালানি
খাতও রয়েছে।ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী
পীযূষ গোয়াল বলেছেন, জাপানের ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন
বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হতে
পারে।ছোট
কোম্পানিরও আগ্রহশুধু বড়
প্রতিষ্ঠান নয়, জাপানের ছোট
ও মাঝারি কোম্পানিগুলোও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো
প্রতিষ্ঠানের জন্মস্থান হামামাতসু শহরে সম্প্রতি হামামাতসু
ইন্ডিয়া কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শহরটির ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে
ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, তা
নিয়ে কাজ করবে এই
কমিটি।ভারতে জাপানি
বিনিয়োগ বাড়ার বিপরীতে চীনে জাপানের নিট
বিনিয়োগ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে
করেন, এর অর্থ জাপানি
কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে চীন ছেড়ে যাচ্ছে—এমন নয়। বরং
কয়েক বছর ধরে সরবরাহব্যবস্থায়
বিঘ্ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার
পর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে চাইছে তারা।সিডনিভিত্তিক লোয়ি
ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া চেয়ার শ্রুতি পান্ডালাইয়ের মতে, চীনসংক্রান্ত ঝুঁকির
বিরুদ্ধে ভারত জাপানের জন্য
এক ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। একই
সঙ্গে টোকিওর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দিল্লির উৎপাদন
খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যও দুই দেশের সম্পর্ককে
আরও জোরালো করছে।সামনে
যেসব
চ্যালেঞ্জতবে ভারত
ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার
পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ
রয়েছে। চীনের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে জাপান এখনো গভীরভাবে যুক্ত।
ফলে চীন থেকে পুরোপুরি
সরে আসা বা সমন্বিত
কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাণিজ্যিক
ব্যয় এবং চীনের পাল্টা
অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে।ভারতেও বিদেশি
বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনায়
করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও
পরিবেশগত অনুমোদনে বিলম্বের মতো সমস্যা রয়েছে।সম্প্রতি জাপানের
এক সাবেক মন্ত্রী দিল্লি সরকারের সমালোচনা করে বুলেট ট্রেন
প্রকল্পে বিলম্বের জন্য ভারতকে দায়ী
করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল,
ভারত নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন
করেছে। ভারত সরকার অবশ্য
ওই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে।ঘটনাটি চীনের
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। ভারত ও
জাপানের মধ্যে মতপার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরে ভারতের
চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে
তারা।সব মিলিয়ে
বড় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তির
পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগের গতি ধরে রাখতে
ভারতকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
করতে হবে। বিশেষ করে
অন্য দেশগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি
বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারতের প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় জাপানি বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
উঠছে।
সূত্র:
বিবিসি