ঢাকা    শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতৃত্বে আলোচনায় আমিনুল-জাহাঙ্গীর

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতৃত্বে আলোচনায় আমিনুল-জাহাঙ্গীর

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দলটির ভেতরে চলছে নানা সমীকরণ। গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক ইউনিটের নেতৃত্বে কারা আসছেন, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ত্যাগী নেতাদের পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম।সম্প্রতি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও দলীয় শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল এবং মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপর থেকেই মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।দলীয় সূত্র জানায়, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাদের ভূমিকা, ত্যাগ, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকার গঠনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে যাতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে চায় দলটি।বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আমার দেশকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। যেহেতু পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে, শিগগির নতুন কমিটি গঠন করা হবে। কীভাবে কমিটি দেওয়া হবে, সেটা পার্টি সিদ্ধান্ত দেবে।’দলটির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, শিগগিরই নতুন কমিটি গঠন করা হতে পারে। কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হবে, নাকি কেন্দ্র থেকে সরাসরি ঘোষণা দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম। নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞ ও অপেক্ষাকৃত নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।ভোটাধিকার আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ঢাকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ইউনিটের আগের কমিটি বিলুপ্তির পেছনে নিচের সারির কিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাই নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পাশাপাশি নেতাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতাও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি রয়েছে দলের ভেতরে।সভাপতি পদে আমিনুল, সম্পাদক পদে জাহাঙ্গীরের নামনতুন কমিটির সভাপতি পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমিনুল হক। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন।এ ছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, ড. এমএ কাইয়ুম, মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব এবং আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নাম।সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা আমিনুল হক বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর যুব প্রশিক্ষণ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্টেডিয়াম ও মিনি মাঠ নির্মাণ, খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়া কার্ড এবং মাদকমুক্ত যুবসমাজ গঠনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ও দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছে।ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে আমিনুলের দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও আলোচনায় রয়েছে। ২০২১ সালের ২ আগস্ট গঠিত ৪৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি সদস্যসচিবের দায়িত্ব পান। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাইফুল আলম নীরব আহ্বায়কের দায়িত্ব পেলে আমিনুল আবারও সদস্যসচিব হন। পরে ৪ নভেম্বর ঘোষিত আংশিক আহ্বায়ক কমিটিতে তাঁকে আহ্বায়ক করা হয়।মহানগর উত্তরের নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, আমিনুল দায়িত্বে থাকার সময় জ্যেষ্ঠ ও নবীন নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় রাখতে পেরেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সংগঠনকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল। সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন থাকায় সংগঠন শক্তিশালী করতে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ আমিনুলের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভূমিকার কথাও তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ৪২টি মামলার মুখোমুখি হন এবং চারবার কারাবরণ করেন। একাধিকবার রিমান্ডে নির্যাতনের শিকারও হন তিনি। তাঁদের মতে, নতুন কমিটি গঠনের সময় এসব ত্যাগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করা উচিত।সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক আমার দেশকে বলেন, ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের পর থেকে আমিনুল জ্যেষ্ঠ ও নবীন নেতাদের একসঙ্গে রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে যেভাবে সক্রিয় রেখেছেন, অতীতের কোনো নেতৃত্ব তা পারেনি। এ বিবেচনায় নতুন কমিটিতে আমিনুলকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।বাড্ডা থানা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বাবু বলেন, বিগত সময়ে যাঁরা রাজপথে ছিলেন, তাঁদের দিয়েই কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লবসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা মহানগরকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পেছনে আমিনুলের বড় ভূমিকা ছিল। সভাপতি হিসেবে তাঁকে পেলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা খুশি হবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।সাধারণ সম্পাদক পদে জাহাঙ্গীরের অভিজ্ঞতাসাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা জাহাঙ্গীর হোসেনেরও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। ১৯৯০ সালে তিনি তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব হন। পরে কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপির দায়িত্ব পালন করেন।এরপর ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকার কারণে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন জাহাঙ্গীর। ২০২৩ সালে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও কারাবাস করতে হয় তাঁকে।আলোচনায় নীরবও, তবে রয়েছে জটিলতাশীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাঁকে প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার করা হয়। এখনো তিনি দলে ফিরতে পারেননি।এরপরও দলীয় আনুগত্য, জনপ্রিয়তা, সক্রিয় রাজনীতি এবং দলের দুর্দিনে ভূমিকার কারণে শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে তাঁকে দেখা যেতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।তৃণমূলের প্রত্যাশা ত্যাগী নেতৃত্বনতুন কমিটি নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দলের দুঃসময়ে যাঁরা মাঠে ছিলেন, মামলা-হামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করা হোক। একই সঙ্গে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁরা।দলীয় পর্যায়ে নতুন প্রজন্মের দক্ষ নেতাদেরও কমিটিতে জায়গা দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিলে তৃণমূলে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার শুধু পুরোনো নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগঠনের সমন্বয় কঠিন হতে পারে। এ কারণে অভিজ্ঞ ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।