বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম: খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া
একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নাম।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে
তিনি তিনবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ
রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি, বিএনপির সাংগঠনিক বিস্তার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক
সংকটে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের
রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।আগামীকাল ১৫ আগস্ট বেগম
খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। তবে
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর
মৃত্যুর পর এটাই হবে
তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন। বিএনপি ও তাঁর অনুসারীরা
দিনটি দোয়া, স্মরণ ও শ্রদ্ধার মধ্য
দিয়ে পালন করবে।খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা
উত্থান-পতন, আন্দোলন, কারাবরণ
ও রাজনৈতিক সংকটে পরিপূর্ণ। বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ‘আপসহীন
নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৮০-এর দশকে
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে
পরবর্তী কয়েক দশকে দেশের
রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে
আছে।জন্ম ও শৈশববেগম খালেদা জিয়া
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের
জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ইস্কান্দার
মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা
মজুমদার সমাজকর্মী।জন্মের পর জীবনের প্রথম
দুই বছর জলপাইগুড়িতে কাটে।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান
বিভক্তির পর তাঁর পরিবার
দিনাজপুরে চলে যায়। সেখানেই
তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের
বড় অংশ কাটে।খালেদা জিয়া দিনাজপুরের সেন্ট
জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে দিনাজপুর সরকারি
উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে
ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ
কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে
ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।বিয়ে ও পারিবারিক জীবন১৯৬০ সালের ৫
আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে
হয়। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের দুই সন্তান- তারেক
রহমান ও আরাফাত রহমান
কোকো।জিয়াউর রহমানের কর্মস্থলের কারণে তাঁদের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতে হয়েছে। ১৯৬৫
সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়া পাকিস্তানেও অবস্থান
করেন।রাজনীতিতে প্রবেশের আগে খালেদা জিয়া
মূলত পরিবার ও সন্তানদের নিয়েই
ব্যস্ত ছিলেন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে
ছিলেন না।মুক্তিযুদ্ধের সময়১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ
শুরু হলে জিয়াউর রহমান
স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেন। এ
সময় খালেদা জিয়া দুই সন্তানকে
নিয়ে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। পরে নিরাপত্তার কারণে
স্থান পরিবর্তন করেন।১৯৭১ সালের জুলাইয়ে
ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে তাঁকে দুই
সন্তানসহ আটক করা হয়।
পরে তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের একটি
বাড়িতে রাখা হয়। ১৬
ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় পর্যন্ত তিনি
সেনা হেফাজতে ছিলেন।স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে১৯৮১ সালের ৩০
মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর
মৃত্যুর পর বিএনপি সাংগঠনিক
সংকটের মুখে পড়ে।পরের বছর, ১৯৮২
সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে দেশের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়।
বিএনপির নেতাদের অনুরোধে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয়
হন।১৯৮২ সালে বিএনপির
সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর
দ্রুতই দলের নেতৃত্বে উঠে
আসেন তিনি। ১৯৮৩ সালে ভাইস
চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের
আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনবিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে
সক্রিয় হন খালেদা জিয়া।
১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয়
জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি।১৯৮৬ সালের নির্বাচন
বর্জন এবং এরশাদ সরকারের
বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে তাঁকে কয়েকবার আটক করা হয়।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের
৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।এই আন্দোলনে ভূমিকার
কারণে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর নেতৃত্বে
বিএনপি তখন দেশের অন্যতম
প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী১৯৯১ সালের ২৭
ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খালেদা জিয়া
পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে
সবকটিতে জয়ী হন।১৯৯১ সালের ১৯
মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম
নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার
সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। একই বছর
সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা
ফিরে আসে।তাঁর প্রথম মেয়াদে
তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ, নারীর কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে
অগ্রগতির কথা বিএনপির পক্ষ
থেকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদ১৯৯৬ সালের ১৫
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে খালেদা
জিয়াকে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী করে। তবে বিরোধী
দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তাঁর সরকার
অল্প সময়ের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয় এবং ক্ষমতা
হস্তান্তর করে।১৯৯৬ সালের জুনের
নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না
পারলেও ১১৬টি আসন পেয়ে প্রধান
বিরোধী দল হয়। খালেদা
জিয়া পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন।২০০১ সালের ১
অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন
করলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো
প্রধানমন্ত্রী হন। ওই সরকারের
সময়ে শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, অবকাঠামো,
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংস্কারে
বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।এক-এগারো ও কারাবরণ২০০৬ সালে সংবিধান
অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের
পর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি
অবস্থা জারি হয় এবং
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।২০০৭ সালের ৩
সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে তাঁর সেনানিবাসের বাসা
থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে
সংসদ ভবন এলাকার একটি
বাড়িতে সাবজেল হিসেবে রাখা হয়। ২০০৮
সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি
মুক্তি পান।২০১৮ সালে কারাবন্দী২০১৮ সালের ৮
ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট
মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড
দেওয়া হয়। পরে জিয়া
চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাঁকে সাজা দেওয়া হয়।কারাবন্দী অবস্থায় তিনি বিভিন্ন শারীরিক
জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০২০
সালের ২৫ মার্চ করোনা
মহামারির সময় সরকারের নির্বাহী
আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য
তাঁর বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে
দীর্ঘদিন আলোচনা ও বিতর্ক চলে।২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন
একপর্যায়ে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৫
আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের
পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে
বড় পরিবর্তন আসে।এর পর খালেদা
জিয়া দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি সংকট
থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির সুযোগ পান। বিএনপির পক্ষ
থেকে বলা হয়, তাঁর
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার
প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিনবিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মারা
যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল
৮০ বছর।তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক
মানুষ অংশ নেন। বিএনপির
নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।তাঁর মৃত্যুর পর
বিএনপির নেতৃত্বে আরও দৃশ্যমানভাবে সামনে
আসেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে
তারেক রহমান। দীর্ঘদিন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি বিএনপির
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।চলতি বছরের ১২
ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন
করলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে খালেদা
জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর পরিবারের পরবর্তী
প্রজন্মের নেতৃত্বে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ
করে।খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মূল্যায়ন
অবশ্য একমুখী নয়। তাঁর সমর্থকেরা
তাঁকে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার
প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের নেতা হিসেবে দেখেন।
অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘ শাসনামল
ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীদের রয়েছে
নানা সমালোচনা। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে
তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং বিএনপিকে একটি
বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার ভূমিকা নিয়ে
বিতর্কের সুযোগ কম।আগামীকাল তাঁর ৮২তম জন্মদিনে
বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে
স্মরণ করবেন। মৃত্যুর পর এটাই হবে
তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন।
লেখক পরিচিতিমো.
শাহাবুদ্দিন
সাংগঠনিক সম্পাদক, কাহালু পৌর বিএনপি