ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
গ্যাসের সংকটে চুলা জ্বলছে না, বাড়ছে লোডশেডিং

গ্যাসের সংকটে চুলা জ্বলছে না, বাড়ছে লোডশেডিং

গ্যাসের সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। একই সময়ে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কোথাও চুলা জ্বলছে না, কোথাও আবার মাটির চুলা বা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে।গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনেও। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলেও তা চাহিদার তুলনায় ৬০ শতাংশ কম। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি বর্তমানে উৎপাদনে নেই। সার কারখানাগুলোতে চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতিদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করেও এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর আগে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, লোডশেডিং কমাতে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এরপরও বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।উৎপাদন কমেছে শিল্পকারখানায়গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে অনেক কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।গাজীপুরের একটি নিট কারখানায় আগে দিনে ২৬ টন কাপড় উৎপাদিত হলেও গ্যাসের সংকটে তা কমে ১১ থেকে ১২ টনে নেমে এসেছে।বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সংগঠনের সদস্যভুক্ত প্রায় ৭০ শতাংশ কারখানা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগে মূলত গ্যাস সংকটের কথা জানানো হলেও গত কয়েক দিনে বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগও বেড়েছে।সার কারখানায়ও সংকটগ্যাসের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)।উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংকঋণের সুদ ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এতে প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।দেশের অন্যান্য সার কারখানাতেও চাহিদার তুলনায় মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস নেই, মাটির চুলায় রান্নাগ্যাস উৎপাদনে দেশের অন্যতম প্রধান জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও আবাসিক গ্রাহকেরা গ্যাস সংকটে ভুগছেন। গত দুদিন ধরে জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।বৃহস্পতিবার শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের চুলা না জ্বলায় বাসাবাড়িতে মাটির চুলায় রান্না করছেন অনেকে। কেউ কেউ সিলিন্ডার গ্যাস কিনে ব্যবহার করছেন।টেংকের পাড় এলাকার বাসিন্দা রুনা দাস বলেন, বেলা ১১টার পর গ্যাসের চুলা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর গ্যাস আসেনি। বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করতে হয়েছে।কাজীপাড়ার বাসিন্দা ইয়াদে রিবা পাপিয়া বলেন, এমনিতেই তাঁদের এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকে। গত দুদিন ধরে একেবারেই গ্যাস নেই। তাই সিলিন্ডার গ্যাস কিনে রান্না করতে হচ্ছে।যানবাহনচালকেরাও গ্যাস সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় গাড়িতে ঠিকমতো গ্যাস নিতে পারছেন না।কুমিল্লায় ৩১ ঘণ্টা ধরে গ্যাস নেইটানা দুদিন ধরে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকার জনজীবন। কোথাও গ্যাস একেবারেই নেই, কোথাও আবার মিলছে খুব কম চাপে। ফলে রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির খরচ।বাগিচাগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন জানান, তাঁদের বাসায় ৩১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার আনতে হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক হোটেলেও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।রেসকোর্স এলাকার গৃহবধূ খালেদা আক্তার বলেন, বুধবার ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করেছিলেন। বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎও না থাকায় বাড়ির পাশে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্না করতে হয়েছে।কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল)।সুনামগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ১৭ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ নেইগ্যাসের পাশাপাশি তীব্র বিদ্যুৎ সংকটেও ভুগছে সুনামগঞ্জের মানুষ। শহরে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও জেলার বিভিন্ন গ্রামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।এতে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ছাতকের জাউয়াবাজার এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে এলাকাবাসী মিছিলও করেছেন।তাহিরপুরের বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, রাতে ১২টার পর বিদ্যুৎ আসে, আবার ৩টার দিকে চলে যায়। সকালে থাকে না। দুপুরে আধা ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না বললেই চলে।অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জকে দায়ী মন্ত্রীদেশের বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের লুটপাট এবং ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার বিস্তারকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।মন্ত্রী বলেন, অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি রাতে চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত উপায় নেই। দেশে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো এবং আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ- দুই ক্ষেত্রেই এখন সমস্যা রয়েছে।তিনি জানান, এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি টার্মিনালের জন্য ১০ থেকে ১২ দিন আগে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। মোংলা-হিরণ পয়েন্ট এলাকাতেও আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালগুলো মেরামতের কাজও চলছে।মন্ত্রীর আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে। ততদিন দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।