ঢাকা    শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই নির্মাণকাজ, বিটিআই ভবনে একজন নিহত ও দুজন পঙ্গু

নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই নির্মাণকাজ, বিটিআই ভবনে একজন নিহত ও দুজন পঙ্গু

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ছয় থেকে সাত মাসে ওই ভবনে একাধিক দুর্ঘটনায় একজন নির্মাণশ্রমিক নিহত এবং অন্তত দুজন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট লোহার রড বিদ্যুতের তারে লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শহিদুল ইসলাম (৩০) নামের এক শ্রমিক নিহত হন। আহত হন আরেক শ্রমিক এরশাদুল।বসুন্ধরার কে-ব্লকের এভিনিউ-৫-এর ১৭৬ ও ১৭৭ নম্বর প্লটে বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) নির্মাণাধীন ভবনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ভবনের সামনে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের আশপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। শ্রমিকদের জন্য সেফটি নেট, ফল প্রটেকশন, রেইলিং বা ব্যারিকেড এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না। এর আগে একই ভবনে দুর্ঘটনার পরও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।দুর্ঘটনার পরও হাসপাতালে নিতে দেরিপ্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ আগস্ট দুপুরে ভবনের চতুর্থ তলায় কাজ করার সময় লোহার রড সামনের উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের তারে লাগে। এতে শহিদুল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দোতলার কার্নিশে পড়ে যান। আর এরশাদুল ভবনের নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন।অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পর আহত দুজনকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে দীর্ঘ সময় রাখা হয়। পরে শহিদুল মারা গেলে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত এরশাদুলকেও পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়।শহিদুলের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা এলাকায়। তাঁর তিন সন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি বিপাকে পড়েছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।এরশাদুলের হাত-পা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি কোমরেও গুরুতর আঘাত রয়েছে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।আগেও দুর্ঘটনার অভিযোগস্থানীয় বাসিন্দা ও নির্মাণশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৭ জুন একই ভবনে লোহার রড বিদ্যুতের তারে লেগে আরেক শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তাঁর হাত-পা ভেঙে যাওয়ায় তিনি পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।এ ছাড়া ভবন নির্মাণের শুরুর দিকে আরও একজন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্যও দিয়েছেন আশপাশের ভবনের শ্রমিক ও কেয়ারটেকাররা। তবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এসব ঘটনার পর শ্রমিকদের নিরাপত্তায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনেক শ্রমিককে অন্য প্রকল্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অথবা বাড়িতে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে শ্রমিকেরা কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।ঘটনাস্থলে ভিন্ন বক্তব্য৬ আগস্টের দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবেদক দেখতে পান, নির্মাণাধীন ভবনের ফটক বন্ধ। ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের কাছে দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা জানান, কেউ মারা যাননি; দুজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং তাঁদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প প্রকৌশলী মো. ওয়াদুদ কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে ওয়াদুদ পরে বলেন, দুর্ঘটনার দিনই বিটিআই কর্তৃপক্ষ নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করেছে।লাশ হস্তান্তর ও মামলা নিয়েও প্রশ্ননিহত শহিদুলের সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর বাবা নেসার উদ্দিন ও মা ফরিদা বেগমের নাম রয়েছে। লাশ শনাক্ত ও গ্রহণকারী হিসেবে ফরিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি শহিদুলের আপন ভাই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে অভিযোগ উঠেছে, অন্য একজনকে শহিদুলের ভাই পরিচয় দিয়ে অপমৃত্যু মামলা এবং লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভাটারা থানার পুলিশের সঙ্গে বিটিআইয়ের যোগসাজশের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।এ বিষয়ে প্রকল্প প্রকৌশলী ওয়াদুদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়। প্রথমে তিনি বলেন, নিহতের ভাইয়ের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়নি। পরে আবার বলেন, ভাইয়ের কাছেই লাশ দেওয়া হয়েছে।ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তবে লাশ শনাক্তকারী ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ওসি এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বেলালের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগদুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ওই সাংবাদিকের দাবি, একটি বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁকে গালাগাল ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাসার আশপাশে কয়েকজনকে তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা গেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।এ ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।ওই সাংবাদিকের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ভবনের সামনে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। ২৭ জুনের দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৬ আগস্টের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত বলেও তিনি দাবি করেন।বিটিআইয়ের বক্তব্য কীনির্মাণাধীন ভবনে ধারাবাহিক দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারকে সহায়তার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাইজুর রহমান খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।প্রকল্প প্রকৌশলী মো. ওয়াদুদ বলেন, দুর্ঘটনার দিনই নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।তবে নিহত শহিদুলের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিটিআই কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বা কোনো সহযোগিতা করেনি।একই নির্মাণস্থলে একাধিক দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব এবং লাশ হস্তান্তর ও অপমৃত্যু মামলা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন- সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।