ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো আমেনার জিপিএ-৫, স্বপ্ন এখন ডাক্তার হওয়ার
পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১২ বছর আগে
বসতভিটা হারিয়েছিল পরিবারটি। এরপর অন্যের জমিতে
খাজনা দিয়ে টিনের ঘর
তুলে বসবাস। সংসারে অভাব-অনটন, তার
ওপর মা দীর্ঘদিন ধরে
কিডনি রোগে ভুগছেন। মায়ের
অসুস্থতার কারণে রান্নাবান্নাসহ ঘরের নানা কাজও
করতে হয় মেয়েটিকে। এসবের
মধ্যেই নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে
গেছে সে।প্রতিকূলতার সঙ্গে
লড়াই করে এবার বিজ্ঞান
বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায়
জিপিএ-৫ পেয়েছে মাদারীপুরের
শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান আমেনা। তার স্বপ্ন, ভবিষ্যতে
চিকিৎসক হয়ে অসহায় ও
দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো।গত সোমবার
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার
ফল প্রকাশের পর আমেনার সাফল্যে
আনন্দিত তার পরিবার, শিক্ষক,
সহপাঠী ও এলাকাবাসী। তবে
এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল
না। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, মায়ের অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা
সংকট সামলে তাকে পড়াশোনা চালিয়ে
যেতে হয়েছে।এক
কক্ষের ঘরে পড়াশোনাবৃহস্পতিবার সকালে
শিবচর উপজেলার মাদবরের চর ইউনিয়নের চরকান্দি
গ্রামে আমেনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,
বৃষ্টিতে কাদাময় ও পিচ্ছিল উঠান
পেরিয়ে টিনের ঘরের সামনে মায়ের
কাজে সহযোগিতা করছে আমেনা। মাত্র
একটি কক্ষের ঘরে গাদাগাদি করে
রাখা আসবাবপত্রের ফাঁকে রয়েছে তার ছোট্ট পড়ার
টেবিল। সংসারের কাজ শেষ করে
সেখানেই পড়াশোনা করত সে।পরিবার সূত্রে
জানা যায়, প্রায় ১২
বছর আগে পদ্মার ভাঙনে
তাদের বসতভিটা ও সহায়-সম্বল
হারিয়ে যায়। তাদের মূল
বাড়ি ছিল শিবচরের চরজানাজাত
ইউনিয়নের পূর্ব খাস বন্দরখোলা এলাকায়।
নদীভাঙনের পর পরিবারটি মাদবরের
চর ইউনিয়নের চরকান্দি গ্রামে এসে অন্যের জমিতে
খাজনা দিয়ে বসতি গড়ে।
এ পর্যন্ত অন্তত দুইবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে পরিবারটি।আমেনার বাবা
হাবিবুর রহমান ওরফে ইলিয়াস কৃষক।
অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে যে
সামান্য আয় করেন, তা
দিয়েই স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান
নিয়ে সংসার চালান। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাও
তাঁর জন্য কঠিন ছিল।অসুস্থ
মায়ের কাজও সামলাতে হয়েছেআমেনার মা
জরিনা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে
ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন
না তিনি। ফলে রান্নাবান্নাসহ ঘরের
বিভিন্ন কাজ আমেনাকেই করতে
হয়েছে। এসব কাজ শেষ
করেই নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত সে।অভাবের কারণে
প্রাইভেট পড়ার সুযোগও তেমন
পায়নি আমেনা। তবে পড়াশোনার প্রতি
তার আগ্রহ ছিল প্রবল।আমেনার মা
জরিনা খাতুন বলেন, ‘আমরা নদীভাঙা মানুষ।
কৃষিকাজ করে সংসার চলে।
সংসারে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকে।
আমি কিডনি রোগে আক্রান্ত। দুই
ছেলে ও তিন মেয়েকে
নিয়ে টানাটানির সংসার। তবে আমেনার পড়াশোনার
প্রতি খুব আগ্রহ। নিজের
ইচ্ছায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়েছে।’তিনি বলেন,
‘ঠিকমতো প্রাইভেটও পড়াতে পারিনি। আমার মেয়ে অনেক
দূর পর্যন্ত পড়তে চায়। কতটুকু
পারব জানি না।’রোল
১৮ থেকে জিপিএ-৫নবম শ্রেণিতে
আমেনার রোল ছিল ১২।
দশম শ্রেণিতে ওঠার পর ফল
কিছুটা খারাপ হওয়ায় রোল হয়ে যায়
১৮। সেই ফলাফলই তাকে
আরও ভালো করার জন্য
অনুপ্রাণিত করে।আমেনা বলেন,
‘দশম শ্রেণিতে ওঠার পর আমার
রেজাল্ট খারাপ হয়। রোল ১৮
হয়ে যায়। রেজাল্ট নিয়ে
বাড়ি আসার পর আব্বা
খুব মন খারাপ করেছিলেন।
আব্বার মলিন মুখ দেখে
আমার খুব কষ্ট হয়।
তখন আমার মধ্যে জেদ
তৈরি হয়, আমাকে ভালো
করতেই হবে। এরপর আমি
আরও চেষ্টা করতে থাকি।’তার ভাষায়,
‘আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেক। চাইলেই বাবার পক্ষে আমার সব চাহিদা
পূরণ করা সম্ভব নয়।
মা অসুস্থ। ঘরের রান্নাবান্না করেও
আমাকে স্কুলে যেতে হয়েছে। কিন্তু
আমি হাল ছাড়িনি। আমার
স্কুলের স্যাররাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন,
বিশেষ করে গণিতের পবিত্র
স্যার।’স্বপ্ন
চিকিৎসক হওয়ারএসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর
আমেনা বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক খুশি।
ফলাফল নিয়ে অনেক টেনশনে
ছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত
প্রত্যাশিত ফল পেয়েছি। আমার
এ পর্যন্ত আসার পথটা সহজ
ছিল না। বাবা-মা
ও শিক্ষকদের সহযোগিতা পেয়েছি।’এখন ভালো
কলেজে পড়তে চান আমেনা।
তাঁর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে অসহায় ও
দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান
তিনি।আমেনার বাবা
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মেয়ে ভালো রেজাল্ট
করেছে, আমরা খুবই আনন্দিত।
অনেক কষ্টের মধ্যে তাকে পড়াশোনা করিয়েছি।
আমি কৃষিকাজ করে সংসার চালাই।
আমার সাধ্য অনুযায়ী মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। সবাই আমার
মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।’শিক্ষকদের
প্রত্যাশাপ্রতিবেশী মো.
ফারুক বলেন, আমেনার পরিবার পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমিতে খাজনা দিয়ে বসবাস করছে।
মেয়েটি খুব মেধাবী। কিন্তু
ভালো কলেজে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তার
বাবার নেই। সমাজের বিত্তবানরা
এগিয়ে এলে এ ধরনের
মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।পাঁচ্চর বালিকা
উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল হক বলেন, আমেনা
নিঃসন্দেহে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী।
পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা তার
পড়ালেখায় বিভিন্ন সময়ে বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছে। মায়ের অসুস্থতার কারণে রান্নাবান্নাসহ ঘরের কাজও তাকে
নিয়মিত করতে হয়েছে। এরপরও
সে স্কুলে এসে মনোযোগ দিয়ে
পড়াশোনা করেছে।তিনি বলেন,
‘আমেনার অদম্য চেষ্টার ফলেই সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আর্থিক
অনটন যেন তার উচ্চশিক্ষার
পথে বাধা হয়ে না
দাঁড়ায়, সে জন্য সমাজের
বিত্তবানদের তার মতো মেধাবী
শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’এ বছর
পাঁচ্চর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১১ জন
শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাঁদের
মধ্যে ইশরাত জাহান আমেনা অন্যতম।বিদ্যালয়ের গণিতের
শিক্ষক পবিত্র চন্দ্র বল্লভ বলেন, আমেনার অধ্যবসায় এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা
মেনে চলার মানসিকতা তাকে
ভালো ফল করতে সহায়তা
করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিত সে।ইংরেজি বিভাগের
সহকারী শিক্ষক ইয়াসিন কাজী বলেন, আমেনা
নিয়মিত ক্লাস করত এবং পাঠে
মনোযোগী ছিল। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার
সঙ্গে নিজের পড়ার রুটিন সমন্বয়
করে চলত এবং শিক্ষকদের
নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিত।সামনে
আরও বড় পথপদ্মার ভাঙনে
ভিটেমাটি হারানো, অভাবের সংসার ও অসুস্থ মায়ের
দায়িত্ব সামলেও আমেনার জিপিএ-৫ অর্জন এখন
পরিবারটির বড় আনন্দের বিষয়।
তবে এসএসসির পর সামনে তার
আরও বড় পথ- উচ্চমাধ্যমিকের
পড়াশোনা এবং মেডিকেল কলেজে
ভর্তির প্রস্তুতি।অর্থের অভাবে
সেই পথ যাতে থেমে
না যায়, সেটিই এখন
আমেনা ও তার পরিবারের
বড় দুশ্চিন্তা। ভালোভাবে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হয়ে
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের
পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পূরণে এখন তার প্রয়োজন
সুযোগ ও সহযোগিতা।