ইছামতীর তীরে দুই শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর
উপজেলার ঝিটকা। ইছামতী নদীর তীরে গড়ে
ওঠা এই জনপদের রয়েছে
দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও সামাজিক ইতিহাস।
ব্রিটিশ আমল থেকেই নদীকেন্দ্রিক
ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল
ঝিটকা। কৃষিপণ্য ও মসলার কেনাবেচাকে
কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা
হাট-বাজার একসময় এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।এই বাণিজ্যিক
জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে প্রায় দুই
শত বছরের পুরোনো ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি। প্রাসাদসদৃশ ভবন,
কাঠের ঘর, বড় পুকুর,
শানবাঁধানো ঘাট, বাংলো ও
বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নিয়ে একসময় গড়ে
উঠেছিল পোদ্দার পরিবারের বিশাল আবাসিক পরিসর। শুধু স্থাপত্য নয়,
দেশভাগ, সরকারি অধিগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্থানীয় লোকজ
সংস্কৃতির নানা স্মৃতিও ধারণ
করে আছে এই বাড়ি।ইছামতী
ঘিরে ঝিটকার বাণিজ্যঝিটকার ইতিহাসের
সঙ্গে ইছামতী নদীর সম্পর্ক গভীর।
একসময় এই নদীপথে কৃষিপণ্য
ও মসলা পরিবহন করা
হতো। ধনে, পেঁয়াজ ও
রসুনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। কলকাতার সঙ্গেও
ছিল বাণিজ্যিক যোগাযোগ।এই নদীকেন্দ্রিক
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করেই
ঝিটকা হাট ও বাজারের
প্রসার ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্যের
সুযোগ তৈরি হয় স্থানীয়
ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর উত্থানের। সেই সময়ের সমৃদ্ধ
ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর অন্যতম ছিল পোদ্দার পরিবার।ধনের
ব্যবসা থেকে প্রাসাদ নির্মাণপ্রকাশিত বিভিন্ন
তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকের গোড়ার
দিকে পোদ্দার পরিবারের সদস্যরা ধনের ব্যবসায় বড়
পরিসরে যুক্ত হন। যোগেশ্বর মোহন
পোদ্দার ও রায়চরণ মোহন
পোদ্দারকে এ ব্যবসার সঙ্গে
যুক্ত দুই সহোদর হিসেবে
একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা
নৌপথে ধনে কলকাতায় নিয়ে
গিয়ে বিক্রি করতেন।ব্যবসায়িক সাফল্যের
ফলে পরিবারটি স্থানীয়ভাবে সম্পদশালী ও প্রভাবশালী হয়ে
ওঠে। পরবর্তীকালে স্থানীয় ঝিকুটিয়া মৌজায় প্রায় সাত একর জমি
কেনা হয়। এর মধ্যে
ইছামতী নদীর পাশে প্রায়
২ দশমিক ৭৫ একর জমির
ওপর গড়ে ওঠে মূল
প্রাসাদসদৃশ বাড়ি।প্রকাশিত তথ্য
অনুযায়ী, বাড়িটির পূর্ব অংশে যোগেশ্বর মোহন
পোদ্দার এবং পশ্চিম অংশে
রায়চরণ মোহন পোদ্দার পরিবার
নিয়ে বসবাস করতেন। সময়ের সঙ্গে পুরো স্থাপনাটি মানুষের
কাছে ‘ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে
ওঠে।বংশপরিচয়ে
কিছুটা ভিন্নতাপোদ্দার পরিবারের
বংশপরিচয় নিয়ে স্থানীয় ও
প্রকাশিত সূত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায়
মহারাজ পোদ্দারকে পরিবারের মূল কর্ণধার হিসেবে
উল্লেখ করে তাঁর সন্তান
রাম মোহন ও আনন্দ
মোহনের কথা বলা হয়েছে।
আবার ২০২১ সালে প্রকাশিত
একটি প্রতিবেদনে আনন্দ মোহন পোদ্দারের দুই
সন্তান হিসেবে যোগেশ্বর মোহন ও রায়চরণ
মোহনের নাম উল্লেখ করা
হয়েছে।দেশভাগের পর
পরিবারের কোন শাখা ভারতে
চলে যায় এবং কোন
শাখা ঝিটকায় থেকে যায়, এ
নিয়েও প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য
দলিল ছাড়া একটি নির্দিষ্ট
বংশতালিকা তৈরি করা কঠিন।
তবে বিভিন্ন সূত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশভাগের পর পোদ্দার পরিবারের
একটি অংশ ভারতে চলে
যায় এবং অন্য একটি
অংশের সঙ্গে ঝিটকার সম্পর্ক বজায় থাকে।পরবর্তী প্রজন্মের
মধ্যে রথীন্দ্রনাথ পোদ্দারের নামও পাওয়া যায়।
একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে রায়চরণ পোদ্দারের নাতি হিসেবে উল্লেখ
করা হয়েছে।সাত
একরের বিস্তৃত আবাসিক পরিসরঝিটকা পোদ্দারবাড়ি
মূলত একটি ভবনের নাম
নয়। প্রায় সাত একর জমির
ওপর গড়ে ওঠা পুরো
আবাসিক পরিসরটিতে ছিল একাধিক স্থাপনা।
বড় পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, কৃষিজমি, কাঠের
ঘর, আধাপাকা ভবন, বাংলো ও
প্রাসাদসদৃশ একাধিক ভবন মিলে এটি
ছিল একটি বিস্তৃত পারিবারিক
কমপ্লেক্স।বাড়ির দক্ষিণ
ও উত্তর পাশে বড় পুকুর
ছিল বলে বিভিন্ন স্থানীয়
বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ দিকের পুকুরের পাড়ে ছিল শানবাঁধানো
ঘাট। পূর্ব পাশে ছিল কৃষিজমি।
পুরোনো গাছপালা, পুকুর ও স্থাপনাগুলো মিলিয়ে
একসময় পুরো এলাকাটি ছিল
সবুজ ও নান্দনিক।কাঠের
ঘরে বসত বিচার–সালিসপোদ্দারবাড়ির অন্যতম
উল্লেখযোগ্য স্থাপনা একটি বড় চৌচালা
কাঠের ঘর। পুকুরের ঘাটের
কাছে অবস্থিত এই ঘরের ছাউনি
টিনের হলেও চারপাশের দেয়াল
কাঠের। রয়েছে কাঠের বারান্দাও।স্থানীয় বর্ণনা
অনুযায়ী, একসময় এই ঘরে বিচার–সালিস ও সামাজিক বৈঠক
বসত। অর্থাৎ পোদ্দারবাড়ি শুধু একটি পরিবারের
আবাসস্থল ছিল না; স্থানীয়
সামাজিক জীবনেও এর ভূমিকা ছিল।পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক
এই ঘরটি সরকারি কাজে
ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এখানে
বাল্লা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের কার্যক্রম
পরিচালিত হয়ে আসছে।তিন
প্রাসাদ ও পুরোনো স্থাপত্যকাঠের ঘরের
উত্তর দিকে ছিল একটি
বড় আধাপাকা স্থাপনা। এর পেছনে ছিল
দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্বমুখী তিনটি
কারুকার্যখচিত একতলা প্রাসাদ। প্রতিটি প্রাসাদে চার থেকে পাঁচটি
বড় কক্ষ ছিল বলে
স্থানীয় বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।সময় ও
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব ভবনের অনেকটাই
এখন জরাজীর্ণ। দেয়াল ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে, নষ্ট হয়েছে পুরোনো
কারুকাজ। ফলে একসময়কার জাঁকজমকপূর্ণ
স্থাপত্য এখন ধীরে ধীরে
হারিয়ে যাচ্ছে।মুক্তিযুদ্ধের
স্মৃতিও জড়িয়ে আছেঝিটকা পোদ্দারবাড়ির
ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১
সালে এই বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর
ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। আগস্ট
থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত
সেখানে ক্যাম্প পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে
উল্লেখ করা হয়েছে।ফলে বাড়িটির
গুরুত্ব শুধু পুরোনো স্থাপত্য
বা একটি ব্যবসায়ী পরিবারের
ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের
ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।ঘুড়ি
উৎসব ও মেলার স্মৃতিএকসময় পোদ্দারবাড়ি
ছিল লোকজ সংস্কৃতিরও একটি
কেন্দ্র। ১৯৯৮ সাল থেকে
রঞ্জন সাহার উদ্যোগে এখানে ঘুড়ি উৎসব ও
মেলার আয়োজন করা হতো। দেশের
বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই
আয়োজনে অংশ নিতে আসতেন।রঞ্জন সাহা
ছিলেন রায়চরণ পোদ্দারের নাতিনের স্বামী। তাঁর উদ্যোগে দীর্ঘদিন
ধরে এই উৎসব চললেও
২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যুর
পর আয়োজনটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।দেশভাগ
ও সরকারি অধিগ্রহণ১৯৪৭ সালের
দেশভাগ পোদ্দার পরিবারের ইতিহাসেও পরিবর্তন আনে। পরিবারের একটি
অংশ ভারতে চলে যাওয়ার পর
১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান
সরকার ভারতে চলে যাওয়া/পরিত্যক্ত
অংশের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে বলে প্রকাশিত
স্থানীয় তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।১৯৬৭ সালে
বাড়ির দক্ষিণ পাশের একটি ঘরে সার্কেল
অফিস (রাজস্ব) চালু করা হয়।
পরবর্তীকালে সরকারি ব্যবহারের ধারাবাহিকতায় সেখানে ভূমি অফিসের কার্যক্রম
পরিচালিত হতে থাকে।একসময় যে
স্থাপনা ছিল একটি পরিবারের
আবাস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের
কেন্দ্র, তার একটি অংশ
এভাবেই সরকারি প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হয়ে
যায়।অযত্নে
হারাচ্ছে ঐতিহ্যবর্তমানে পোদ্দারবাড়ির
সবচেয়ে বড় সংকট অযত্ন
ও দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাব। পুরোনো ভবনগুলোর দেয়াল ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কারুকাজ।
অনেক স্থাপনা ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে।তবু বাড়িটির
পুকুর, পুরোনো গাছপালা, কাঠের ঘর, প্রাসাদসদৃশ ভবন
ও খোলা পরিবেশ এখনও
দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। জেলার বিভিন্ন
এলাকা থেকে মানুষ এখানে
আসেন। বিভিন্ন সময় বাড়িটিতে শুটিং
ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়েছে।সংরক্ষণে
প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগঐতিহাসিক গুরুত্ব
বিবেচনায় ঝিটকা পোদ্দারবাড়ি সংরক্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন
স্থানীয়রা। প্রথম ধাপে পুরো স্থাপনার
স্থাপত্যগত জরিপ ও নথিভুক্তকরণ
করা যেতে পারে। এরপর
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পুরোনো ভবন, কাঠের ঘর,
পুকুর ও ঘাট সংরক্ষণ
করা প্রয়োজন।মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে
বাড়িটির সম্পর্ক, পোদ্দার পরিবারের ব্যবসায়িক ইতিহাস এবং ঘুড়ি উৎসবের
মতো লোকজ ঐতিহ্য তুলে
ধরে একটি তথ্যকেন্দ্র বা
ছোট প্রদর্শনীকেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে
পারে।স্থানীয় প্রশাসনের
পক্ষ থেকে বাড়িটির পরিত্যক্ত
ভবন সংস্কার এবং স্থাপনাটিকে ঘিরে
পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সময়ে
জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া
গেলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাকে পর্যটনকেন্দ্র
হিসেবে উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।তবে পর্যটন
উন্নয়নের পাশাপাশি মূল স্থাপনার ঐতিহাসিক
বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ অক্ষুণ্ণ
রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।একটি
বাড়িতে একটি জনপদের ইতিহাসঝিটকা পোদ্দারবাড়ি
শুধু একটি পুরোনো বাড়ি
নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে
আছে ইছামতী নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য, ধনের ব্যবসা, কলকাতার
সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য, একটি
ব্যবসায়ী পরিবারের উত্থান, দেশভাগ, সরকারি অধিগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্থানীয় লোকজ
সংস্কৃতির ইতিহাস।প্রায় দুই
শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনার অনেক
কিছুই আজ ক্ষয়প্রাপ্ত। কিন্তু
এর পুকুর, কাঠের ঘর, প্রাসাদ, পুরোনো
গাছ ও স্থাপত্য এখনও
অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।সময় থাকতে
সংরক্ষণ করা গেলে ঝিটকা
পোদ্দারবাড়ি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু একটি
পুরোনো স্থাপনা হিসেবে নয়, মানিকগঞ্জের সামাজিক,
অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের
একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে টিকে
থাকতে পারে।
লেখক:
মোহাম্মাদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ
ইতিহাস চর্চা পরিষদ