৩৫ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, প্রস্তুতি কতটা?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে
বর্তমানে ১৯টি
উড়োজাহাজ। এরই
মধ্যে
বোয়িং
ও
এয়ারবাস থেকে
আরও
৩৫টি
উড়োজাহাজ কেনার
চুক্তি
হয়েছে।
এত
বড়
বহর
পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও
অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে
প্রশ্ন
তুলছেন
বিশেষজ্ঞরা।রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান
বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে
আগামী
তিন
থেকে
১০
বছরের
মধ্যে
যুক্ত
হতে
যাচ্ছে
আরও
৩৫টি
উড়োজাহাজ। এর
মধ্যে
২৫টি
মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের এবং
১০টি
ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের। বর্তমানে বিমানের বহরে
উড়োজাহাজ রয়েছে
১৯টি।এত বড়
বহর
পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে
প্রশ্ন
উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ
কেউ
বলছেন,
প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও
প্রস্তুতি ছাড়া
এতগুলো
উড়োজাহাজ কেনা
হলে
তা
শেষ
পর্যন্ত বিমানের জন্য
বোঝা
হয়ে
দাঁড়াতে পারে।
তবে
সরকারের দাবি,
যাত্রী
চাহিদা
ও
ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা বিবেচনা করেই
উড়োজাহাজ কেনা
হচ্ছে।একসঙ্গে ৩৫ উড়োজাহাজ কেনার
সিদ্ধান্তগত এপ্রিল
মাসে
বোয়িংয়ের সঙ্গে
১৪টি
এবং
২৩
সেপ্টেম্বর আরও
১১টি
উড়োজাহাজ কেনার
চুক্তি
হয়েছে।
এর
বাইরে
বুধবার
এয়ারবাসের সঙ্গে
১০টি
উড়োজাহাজ কেনার
চুক্তি
সই
হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে,
একসঙ্গে এতগুলো
উড়োজাহাজ কেনার
পরিকল্পনা বিমানের আগে
ছিল
না।
বরং
১০টি
উড়োজাহাজ ভাড়া
নিয়ে
বহর
বাড়ানোর কথা
ভাবা
হয়েছিল। এ
কারণে
এত
বড়
ক্রয়ের
আগে
প্রয়োজনীয় সমীক্ষা হয়েছে
কি
না,
তা
নিয়েও
প্রশ্ন
রয়েছে।অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী
ওয়াহিদুল আলম
বলেন,
গত
৫৪
বছরে
বিমান
নিজেকে
লাভজনক
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে
গড়ে
তুলতে
পারেনি। এটি
এখনো
সরকারি
করপোরেশন হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে।
তাঁর
মতে,
যথাযথ
বাণিজ্যিক সক্ষমতা তৈরি
না
হলে
নতুন
উড়োজাহাজগুলো বিমানের জন্য
বোঝা
হয়ে
উঠতে
পারে।
তবে
যাত্রীসংখ্যা বাড়ার
সম্ভাবনা বিবেচনায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে
এই
ক্রয়
বাংলাদেশের জন্য
লাভজনকও হতে
পারে।খরচ লাখ কোটি
টাকা
ছাড়ানোর আশঙ্কাআনুষ্ঠানিকভাবে উড়োজাহাজগুলোর দাম
প্রকাশ
করা
হয়নি।
তবে
প্রাথমিক তথ্যমতে, ২৫টি
বোয়িং
কিনতে
প্রায়
৬
দশমিক
৪
বিলিয়ন
ডলার
বা
৭৮
হাজার
৭০০
কোটি
টাকা
খরচ
হতে
পারে।
১০টি
এয়ারবাসের দাম
যোগ
হলে
মোট
ক্রয়মূল্য লাখ
কোটি
টাকা
ছাড়িয়ে
যেতে
পারে
বলে
সংশ্লিষ্টদের ধারণা।তবে এসব
উড়োজাহাজের অর্থ
এখনই
পরিশোধ
করতে
হবে
না।
প্রথম
উড়োজাহাজটি ২০৩১
সালে
এবং
শেষটি
২০৩৫
সাল
বা
তার
পর
আসার
কথা।
উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়
পর্যায়ক্রমে অর্থ
পরিশোধ
করতে
হবে।
ফলে
এর
বড়
অংশের
আর্থিক
চাপ
বর্তমান সরকারের মেয়াদের বাইরে
গিয়ে
পরবর্তী সরকারের ওপর
পড়তে
পারে।রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ
নিয়েও
প্রশ্নবিশ্লেষকদের কেউ
কেউ
মনে
করছেন,
এই
বড়
ক্রয়ের
পেছনে
রাজনৈতিক ও
কূটনৈতিক সমীকরণও ভূমিকা
রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
বাণিজ্য ঘাটতি
কমানোর
আলোচনার মধ্যে
বোয়িং
কেনার
বিষয়টি
এসেছে।
একই
সময়ে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে
সম্পর্ক জোরদার
ও
ভারসাম্য রক্ষার
অংশ
হিসেবে
এয়ারবাস কেনার
সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়েছে
বলে
মনে
করছেন
তাঁরা।অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম
নজরুল
ইসলাম
বলেন,
বাজার
বিবেচনায় বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
তবে
চাহিদা
কীভাবে
নির্ধারণ করা
হয়েছে
এবং
পুরো
কৌশল
কী,
তা
পরিষ্কার করা
দরকার।
তাঁর
মতে,
প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী ও
পাইলট
তৈরি,
প্রশিক্ষণ এবং
রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি এখন
থেকেই
নিতে
হবে।বিমানের কারিগরি সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগনতুন উড়োজাহাজ কেনার
পাশাপাশি বিমানের বর্তমান বহরের
কারিগরি সক্ষমতা নিয়েও
প্রশ্ন
রয়েছে।
বোয়িংয়ের একটি
প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে,
বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের অন্য
বহরের
তুলনায়
বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটির হার
বেশি
এবং
মেরামতে স্বাভাবিকের তুলনায়
প্রায়
তিন
গুণ
বেশি
সময়
লাগে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানের ৭৮৭
উড়োজাহাজে ব্রেক
সিস্টেম কন্ট্রোল ইউনিটে
ত্রুটির হার
একই
মডেলের
বৈশ্বিক গড়ের
তুলনায়
১৪
গুণ
বেশি।
৭৭৭
উড়োজাহাজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটির হার
বৈশ্বিক গড়ের
তুলনায়
ছয়
থেকে
সাত
গুণ
বেশি।
পণ্য
পরিবহনের দরজাতেও ত্রুটির হার
প্রায়
১৪
গুণ
বেশি
বলে
প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা
হয়েছে।এত উড়োজাহাজের জন্য
পাইলট
কোথায়?বর্তমানে ১৯টি
উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য
বিমানে
২১৮
জন
পাইলট
ও
৬০০
কেবিন
ক্রু
রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মান
অনুযায়ী বর্তমান বহরের
জন্যই
প্রয়োজন অন্তত
৩০০
পাইলট
ও
৯০০
কেবিন
ক্রু।নতুন ৩৫টি
উড়োজাহাজ যুক্ত
হলে
প্রয়োজন হতে
পারে
৭০০
থেকে
৮৫০
জন
পাইলট
এবং
১
হাজার
থেকে
১
হাজার
২০০
কেবিন
ক্রু।
একই
সঙ্গে
বাড়বে
পার্কিং, মেইনটেন্যান্স, যাত্রী,
লাগেজ,
কার্গো
ও
টার্নঅ্যারাউন্ডের চাপ।বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
উড়োজাহাজ কেনার
আগেই
পাইলট,
প্রকৌশলী ও
কেবিন
ক্রু
তৈরির
কার্যকর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে
তুলতে
হবে।
বাংলাদেশ ফ্লাইং
একাডেমির মতো
পুরোনো
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিকায়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।সরকারের যুক্তি, বিদেশি এয়ারলাইনসের দখলে
৮০
শতাংশ
যাত্রীসরকারের পক্ষ
থেকে
বলা
হচ্ছে,
দেশের
মোট
বিমানযাত্রীর মাত্র
২০
শতাংশ
বহন
করে
বিমান
বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বাকি
৮০
শতাংশ
যাত্রী
বিদেশি
এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন।
তাই
বহর
বাড়িয়ে
এই
ঘাটতি
পূরণ
করা
প্রয়োজন।বিমানমন্ত্রী এম
রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন,
যাত্রী
চাহিদার ভিত্তিতেই নতুন
উড়োজাহাজ কেনা
হচ্ছে।
নেটওয়ার্ক ফ্লিট
প্ল্যানিং, উড়োজাহাজের রেঞ্জ,
যাত্রী
ধারণক্ষমতা, ফ্লাইটপ্রতি সম্ভাব্য যাত্রী
এবং
সাপ্তাহিক ফ্রিকোয়েন্সি বিবেচনা করে
ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের সংখ্যা
নির্ধারণ করা
হয়েছে।তিনি বলেন,
বহর
সম্প্রসারণে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের মডেল
অনুসরণ
করা
হচ্ছে।
ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসের বহরে
বর্তমানে ১৬৭টি
উড়োজাহাজ রয়েছে,
যেখানে
বাংলাদেশের বিমানে
রয়েছে
১৯টি।
তাঁর
দাবি,
বাংলাদেশে যাত্রী
চাহিদা
বেশি
এবং
উড়োজাহাজের স্বল্পতা দূর
করতেই
এই
উদ্যোগ
নেওয়া
হয়েছে।অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক চাপ নেই: তথ্য
উপদেষ্টাপ্রধানমন্ত্রীর তথ্য
ও
সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা.
জাহেদ-উর রহমান বলেছেন,
নতুন
উড়োজাহাজ কেনার
কারণে
অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক চাপ
পড়বে
না।
তাঁর
বক্তব্য, উড়োজাহাজগুলো হাতে
পেতে
অনেক
সময়
লাগবে
এবং
অর্থও
দীর্ঘ
সময়
ধরে
ধাপে
ধাপে
পরিশোধ
করা
যাবে।তবে উড়োজাহাজ কেনার
প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও
সরকারি
অর্থ
ব্যয়ের
যৌক্তিকতা নিয়ে
প্রশ্ন
তুলে
ইতিমধ্যে সরকার
ও
বিমানকে লিগ্যাল নোটিশ
দেওয়া
হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তফা মোহাম্মদ গোলাম
সারওয়ার গত
৭
সেপ্টেম্বর এ
নোটিশ
পাঠান।শুধু উড়োজাহাজ কিনলেই
হবে
নাবিশেষজ্ঞদের মতে,
বহর
বাড়ানোর পাশাপাশি বিমানের ব্যবস্থাপনা ও
কারিগরি সক্ষমতায় বড়
ধরনের
সংস্কার দরকার।
দক্ষ
ও
অভিজ্ঞ
এভিয়েশন পেশাজীবীদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আইটি
অবকাঠামো ও
ডিজিটাল দক্ষতা
উন্নয়ন,
পাইলট-প্রকৌশলী-কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ এবং
আন্তর্জাতিক মানের
লাইসেন্সিং নিশ্চিত করার
ওপর
গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।এ ছাড়া
টিকিটিং ব্যবস্থাকে আরও
স্বচ্ছ
ও
গতিশীল
করা,
রুটভিত্তিক যৌক্তিক ভাড়া
নির্ধারণ এবং
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের সঙ্গে
প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শও রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে,
বিমান
শুধু
একটি
পরিবহন
প্রতিষ্ঠান নয়;
এটি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
বাংলাদেশের পরিচয়েরও অংশ।
তাই
বহর
সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও
সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে
উন্নীত
করাই
এখন
বড়
চ্যালেঞ্জ।