ডনের গ্রেপ্তারে সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য ফের সামনে
প্রায় তিন
দশক ধরে রহস্যের জট
খোলেনি চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর। ১৯৯৬
সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের
বাসায় তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে
আত্মহত্যা ও হত্যার- দুই
ধরনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে
চলে আসছে। এর মধ্যে একসময়ের
চলচ্চিত্র খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডনের
গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটি নিয়ে
নতুন করে আলোচনা শুরু
হয়েছে।গত রোববার
সৌদি আরবে যাওয়ার সময়
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ডনকে গ্রেপ্তার
করা হয়। সালমান শাহ
হত্যা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দেশত্যাগে
নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাঁকে বিমানবন্দর থেকে যেতে দেওয়া
হয়নি। পরে সিআইডি তাঁকে
নিজেদের হেফাজতে নেয়। আদালত জামিন
আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে
পাঠানোর আদেশ দেন।সিআইডি সূত্র
বলছে, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের
বাসায় কী ঘটেছিল, কারা
সেখানে ছিলেন এবং কী কারণে
মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়েছিল- এসব বিষয়ও নতুন
করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।১২
লাখ টাকার চুক্তির দাবিডনের গ্রেপ্তারের
পর মামলার পুরোনো নথি ও জবানবন্দির
বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ ১৯৯৭
সালে গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া
১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা, কয়েকজনের সম্পৃক্ততা এবং অর্থ লেনদেনের
কথা বলেছিলেন।রাষ্ট্রপক্ষের দাবি,
ওই জবানবন্দিতে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা
হক ও ব্যবসায়ী আজিজ
মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পর্কের জেরে হত্যার পরিকল্পনা
এবং ডনের সঙ্গে ১২
লাখ টাকার চুক্তির কথা উঠে আসে।তবে রিজভী
আহমেদ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন
বলে দাবি করেছেন। সালমান
ও শাবনূরকে ঘিরে তাঁর কিছু
বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শাবনূর
তাঁর বক্তব্যের কয়েকটি অংশকে পরস্পরবিরোধী বলে দাবি করেছেন।পুরোনো ১৬৪
ধারার জবানবন্দি ও সাম্প্রতিক বক্তব্যের
মধ্যে এই পার্থক্য কেন,
কোন পরিস্থিতিতে ওই জবানবন্দি দেওয়া
হয়েছিল এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে এর কতটা মিল
রয়েছে- এসব বিষয় তদন্তে
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।পুরোনো
তদন্তে আত্মহত্যার কথাসালমান শাহর
মৃত্যুর পর তাঁর বাবা
কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে
অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরে পরিবারের পক্ষ
থেকে হত্যার অভিযোগ করা হয়।১৯৯৭ সালের
৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত
প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান
শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। পরিবার
ওই প্রতিবেদনে আপত্তি জানায়। পরে বিচার বিভাগীয়
তদন্তও হয়। ২০১৪ সালের
ওই তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।এরপর ২০১৬
সালে পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২০ সালের
ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন
জমা দিয়ে জানায়, সালমান
শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি
আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার ওই প্রতিবেদনেও নারাজি
দেয়।২০২৫
সালে মামলায় নতুন মোড়দীর্ঘ আইনি
প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের
২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর
দায়রা জজ আদালত সালমান
শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলা
বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা
মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেন।এর পরদিন
রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি
করে হত্যা মামলা করা হয়। আসামিরা
হলেন সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা
হক, তাঁর মা লতিফা
হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই,
অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ,
ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু
ও রিজভী আহমেদ।দেহাবশেষ
উত্তোলন নিয়েও জটিলতাসালমান শাহর
মৃত্যুর তদন্তে দেহাবশেষ উত্তোলন ও পুনরায় ময়নাতদন্তের
বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা ২০ মে দেহাবশেষ
উত্তোলন করে সুরতহাল ও
পুনরায় ময়নাতদন্তের আবেদন করেন। ২৪ মে আদালত
তা অনুমোদন করেন।পরে ২৩
জুন বাদীপক্ষের আবেদনের পর আগের আদেশ
বাতিলের বিষয়ে আদালতে প্রক্রিয়া শুরু হয়। একাধিক
প্রতিবেদনে ওই আবেদন মঞ্জুর
করে আগের আদেশ বাতিলের
কথা জানানো হয়েছে।বাদীপক্ষের যুক্তি
ছিল, প্রায় তিন দশক পর
দেহাবশেষ থেকে কার্যকর আলামত
পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পাশাপাশি ধর্মীয়
ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়।ডনকে
ঘিরে সিআইডির প্রশ্নসিআইডি সূত্র
জানিয়েছে, ডনের গ্রেপ্তার তদন্তে
নতুন তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ
তৈরি করেছে। তদন্তকারীরা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে
১৯৯৭ সালের নথি, রিজভীর ১৬৪
ধারার জবানবন্দি, পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন, পরিবারের বক্তব্য এবং নতুন মামলার
এজাহার মিলিয়ে দেখবেন।ডনের কাছে
১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬
সেপ্টেম্বর তাঁর অবস্থান, সালমান
শাহর সঙ্গে শেষ যোগাযোগ, সামিরা
ও অন্য আসামিদের সঙ্গে
তাঁর যোগাযোগ এবং ১২ লাখ
টাকার কথিত চুক্তির বিষয়ে
জানতে চাওয়া হতে পারে।ঘটনার দিন
ইস্কাটনের বাসায় যাঁরা গিয়েছিলেন, সালমানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় যাঁরা সঙ্গে
ছিলেন এবং পরে বিভিন্ন
তদন্ত সংস্থার কাছে যাঁরা বক্তব্য
দিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্যও নতুন তথ্যের সঙ্গে
মিলিয়ে দেখা হতে পারে।মায়ের
দাবি, তদন্তে গতি আনতে হবেসালমান শাহর
মা নীলা চৌধুরী ডনের
গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি মনে
করেন, একজন আসামিকে গ্রেপ্তার
করলেই তদন্ত শেষ হওয়ার সুযোগ
নেই।তিনি ডনকে
জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের তথ্য বের করার
দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার
অন্য আসামিদের, বিশেষ করে সামিরা হক,
লতিফা হক লুসি ও
আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।৩০
আগস্ট প্রতিবেদন জমার দিনসিআইডির বিশেষ
পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান
বলেন, এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি
ডনকে গ্রেপ্তার করা তদন্তের ক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও রহস্য উদ্ঘাটনে
আইনানুগ সব পথ অনুসরণ
করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ডনকে হেফাজতে
নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।মামলার তদন্ত
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা
এরই মধ্যে আটবার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই
আদালত আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন
ধার্য করেন।ডনের গ্রেপ্তারের
পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা
নিয়ে নতুন করে আলোচনা
শুরু হয়েছে। ভক্তদের অনেকে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার
ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। রিজভী
আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং শাবনূরের প্রতিক্রিয়াও
আলোচনায় এসেছে।তবে প্রায়
তিন দশক পর নতুন
করে সামনে আসা পুরোনো নথি,
জবানবন্দি ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের
কোনটি কতটা সত্য- তার
উত্তর এখন নির্ভর করছে
সিআইডির চলমান তদন্তের ওপর।