ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ: শরিকদের প্রত্যাশা মেটানোচ্যালেঞ্জ হবে বিএনপির

প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ: শরিকদের প্রত্যাশা মেটানোচ্যালেঞ্জ হবে বিএনপির

আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে পাশে থাকা মিত্র দলগুলোর ক্ষোভ ও দূরত্ব ঘোচাতে নেতাদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলগুলোর নেতারা তাঁদের ক্ষোভের পাশাপাশি প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রধানের কাছে। জানিয়েছেন সরকারের অংশীদার হওয়ার দাবি। প্রধানমন্ত্রী সেগুলো ধৈর্যসহকারে শুনেছেন, আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু মিত্রদের এই বাড়তি প্রত্যাশা সামলানো এবং জোটের মূল শক্তিগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেশ কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গত সোমবার রাতে হয়েছে ওই নৈশভোজ এবং আলোচনা। এই আয়োজনে ৪১টি শরিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নৈশভোজে অংশ নেওয়া একাধিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতার সমীকরণে গিয়ে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। যমুনার ওই আয়োজনে নেতারা খোলামেলাভাবেই নিজেদের অবহেলার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। শরিকদের অভিযোগ, দুর্দিনের সঙ্গীদের সরিয়ে রেখে বিএনপির মধ্যে একাকী পথচলার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, যা রাজনীতিতে ভুল বার্তা দিচ্ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিকদের বক্তব্য ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে সবাইকে প্রাপ্য মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি স্পষ্ট করেন, সরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়। এ লক্ষ্যে এখন থেকে প্রতি দুই মাস পর শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় সভা করার বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। নৈশভোজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম—আপনাদের এই ডাক কি ফেয়ারওয়েল ডিনার, নাকি নতুন কোনো যাত্রার সূচনা? জবাবে উনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি কোনো বিদায়ী আয়োজন নয়, বরং আমাদের ওয়েলকামিং ডিনার। এখান থেকেই নতুন করে পথচলা শুরু।’ সাইফুল হক আরও বলেন, ‘দুর্দিনে যারা পাশে ছিল, তাদের সঙ্গে নিয়ে চলার শৈলীটি বিএনপি নেতৃত্বের রপ্ত করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক ছিলেন এবং তাঁর বক্তব্যে অধিকাংশ দলই আশ্বস্ত হতে পেরেছে বলে মনে করি।’ একই সুর পাওয়া গেছে আরও কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে। ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে এই আয়োজন বড় ভূমিকা রাখবে। ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ মন্তব্য করেন, দীর্ঘদিনের রাজপথের বন্ধুদের মধ্যে যে মান-অভিমান তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই অবসান ঘটেছে এই পুনর্মিলনীর মাধ্যমে। তবে এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে শরিক নেতাদের অনেকের কথায়। কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা শরিকদের জমে থাকা ক্ষোভ-হতাশা কিছুটা প্রশমিত হলেও দুর্দিনের সঙ্গীদের সঠিক মূল্যায়ন, চাটুকারিতা এড়িয়ে চলা এবং শরিকদের প্রত্যাশা সামলে ঐক্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বিএনপির নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে সামনের দিনে। কেননা, নৈশভোজে অংশ নেওয়া কোনো কোনো শরিক দলের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি। রাজপথে যাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান বা সাংগঠনিক সামর্থ্য নেই, তারাও অবাস্তব পদ-পদবির আবদার করছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হন দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। তৎকালীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে ওই দলের হয়ে তিনিও আমন্ত্রণ পান প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে। তাঁর মতো আরও অনেকে আমন্ত্রণ পান। সৈয়দ এহসানুল হুদা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শরিকদের সঙ্গে দূরত্বের যে আভাস ছিল, আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব কমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায় সবাই আশ্বস্ত হয়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে পথচলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। শরিকদের মূল্যায়নের বিষয়েও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।’

পা দিয়ে লিখে স্বপ্ন পূরণ করতে চান কলি রানী

পরীক্ষার কক্ষে সবাই বেঞ্চে বসে লিখে যাচ্ছেন খাতায়। তাঁদের পাশে বসে লিখছেন আরেক শিক্ষার্থী কলি রানী। তাঁকে দেওয়া হয়েছে ছোট বেঞ্চ। আর সেখানে বসেই মনোযোগসহকারে পা দিয়ে উত্তর লিখে যাচ্ছেন তিনি। দূর থেকে একনজরে দেখলে কলি রানীকে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুই পায়ে হাঁটাচলা করতে পারলেও বাহু থেকে দুই হাতের কবজি নেই। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা তাঁকে দমাতে পারেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় কলি রানী রংপুরের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মানবিক বিভাগের পরীক্ষায় অংশ নেন। তিনি ওই উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নে গদাই গ্রামের রুপালী রানীর মেয়ে। কলি রানীর জন্ম থেকে দুই হাতের কবজি নাই। কিন্তু পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ আর মনের জোরে কারও সহযোগিতা ছাড়াই পা দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। মৃত মনোরঞ্জন রায়ের ৬ ছেলেমেয়ের মধ্যে কলি রানী সবার ছোট। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে ডিঙিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্ন পূরণের আশায়। কলি রানী লেখাপড়ার পাশাপাশি ইতিমধ্যে গান গেয়ে একাধিক সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন। এ ছাড়া পা দিয়ে চালাতে পারেন কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন। কলি রানী জানান, তাঁর ইচ্ছা পড়ালেখা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করা। কাউনিয়া মহিলা কলেজের কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম জানান, কলি রানী শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়ম মেনে তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেওয়া হয়েছে। ইউএনও পাপিয়া সুলতানা জানান, কলি রানীকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আটকাতে পারেনি। তার অদম্য অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায়।

পা দিয়ে লিখে স্বপ্ন পূরণ করতে চান কলি রানী

ওষুধের তীব্র সংকটব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা

মৌলভীবাজারে তীব্র ওষুধসংকট, জনবল ঘাটতি, দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। ফলে জেলার প্রত্যন্ত এলাকার প্রায় ১১ লাখ মানুষ এসব ক্লিনিক থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধসহ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের ৭ উপজেলা মিলিয়ে মোট ১৮৬ কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ক্লিনিকে সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করার কথা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের (সিএইচসিপি)। এ ছাড়া তিন দিন স্বাস্থ্য সহকারী এবং বাকি তিন দিন পরিবার কল্যাণ সহকারীর কাজ করার কথা। ক্লিনিকগুলোতে ২২ ধরনের ওষুধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকটি ক্লিনিকে বড়জোর প্যারাসিটামল, মেট্রিল আর স্যালাইন পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ক্লিনিক কার্যত ওষুধশূন্য অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জ উপজেলা পতনঊষার শ্রীসূর্য্য কমিউনিটি ক্লিনিকে দেখা যায়, সিএইচসিপি বসে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দুপুর পর্যন্ত কোনো রোগী আসেননি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের লাইয়ারকুল কমিউিনিটি ক্লিনিক, উপজেলার কাকিয়াছড়া কমিউনিটি ক্লিনিক, সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাইটুলা ক্লিনিক, রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের সালন কমিউনিটি ক্লিনিক দুপুরের মধ্যেই বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, কর্তৃপক্ষের ইচ্ছেমতো সময়ে ক্লিনিক খোলা হয়। ক্লিনিকের লোকজন বেলা ২টার মধ্যেই চলে যায়। বেশির ভাগ ক্লিনিকে সিএইচসিপি ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না। সেবাগ্রহীতা কেউ আসলে ওষুধ সংকটের কথা বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কমলগঞ্জের সাবিনা আক্তার বলেন, ‘এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকে আগের মতো ওষুধ পাই না। কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই। এ জন্য এখন অনেকেই ক্লিনিকে যাওয়া বাদ দিয়ে দিতাছে।’ রাজনগরের নিদনপুর গ্রামের ফাতিহা বেগম বলেন, ‘আমি আলসারের রোগী। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে পারি না। ৪ মাস ধরে ক্লিনিকে এসে কোনো ওষুধ পাইনি।’ স্থানীয় ইমাম আব্দুন নুর বলেন, আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিকে যায়। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে তারা। এভাবে চলতে থাকলে গরিব মানুষ চরম বিপদে পড়বে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শ্যামেরকোনা কমিউনিটি ক্লিনিক সিএইচসিপি জান্নাত আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের এখানে ওষুধের তীব্র সংকট চলছে। ওষুধ না থাকায় রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করছেন। মৌলভীবাজার জেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুবেল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকেও ঢাকায় যোগাযোগ করা হয়েছে। আমাদের বলা হচ্ছে, শিগগির ওষুধসংকট নিরসন হবে।’ শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় আগে তিন কার্টন ওষুধ আসত, এখন এক কার্টন আসে।’ মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণ করে। আগের চেয়ে ওষুধ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনবলের সংকট রয়েছে।

ওষুধের তীব্র সংকটব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা

পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে

বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। এরপরও মজুত করা পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন চাষিরা। দেশে পেঁয়াজের বড় উৎপাদনস্থল পাবনা ও ফরিদপুরেই এখন এই অবস্থা। কারণ হিসেবে চাষিরা বলছেন, মজুত করা পেঁয়াজে পচন ধরার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে সংরক্ষণ পদ্ধতি কাজ না করায় তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাওয়ার কারণ হিসেবে হাইব্রিড জাতকে দায়ী করছে কৃষি বিভাগ। ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন; যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৯ টন। হাইব্রিড জাতের চাষের কারণেই এ বাড়তি উৎপাদন বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। জেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা (সাড়ে ৫২ শতক) পেঁয়াজ চাষে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তা থেকে ৮০ থেকে ১০০ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বাজারে কম দাম থাকায় মজুত রাখা হয়, সেই মজুত পেঁয়াজে পচন ধরায় তা দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ মণে। সেই হিসাবে তাঁদের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রতি মণে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। কিন্তু তাঁদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে সালথা উপজেলার পেঁয়াজচাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ করলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে। আরেক কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, বাজারে যে দাম, তাতে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। তাঁরা এখন কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ফরিদপুরের কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে এয়ারফ্লো মেশিন দিলেও বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া জেলার অধিকাংশ পেঁয়াজচাষি প্রাচীন চাঙ (মাচা) পদ্ধতিতেও সংরক্ষণ রাখলেও সেখানেও পচন দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজচাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়। এ বছর আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি মেশিনে ১০ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়। চাষিদের অভিযোগ, সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। তাঁরা বলছেন, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। বিদ্যুৎ না থাকলে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পচনের ঘটনা বাড়ছে। সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রায় ৩৫০ মণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে সেগুলো পুকুরে ফেলে দিয়েছেন তিনি। আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মাফিকুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন সার্বক্ষণিক চালু থাকার দরকার। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং যে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে তাতে ওই যন্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এয়ারফ্লো মেশিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একনাগাড়ে তিন-চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করার পর এ ঘণ্টা বন্ধ রাখা। আধুনিক যে মেশিনগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলো সময় ঠিক করে অটো সেন্সর যুক্ত করা। বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এ মেশিনের কার্যকারিতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি জানান। বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের বিষয়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এস এম নাসিরউদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে বিদ্যুতের ভয়ংকর লোডশেডিং আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। দিনে টানা তিন বা চার ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আমরা সরবরাহ করতে পারিনি।’ তবে সামনে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে বিক্রির জন্য চাষিদের নিয়ে আসা বেশির ভাগ পেঁয়াজ হাইব্রিড জাতের। অতিরিক্ত গরম আর সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেগুলোতে পচন ধরেছে বলে জানান একাধিক চাষি। এ ছাড়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের কারণে দেশি পেঁয়াজও বড় হয়েছে এবং তাতে পানি বেশি থাকায় পচন ধরছে মনে করেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন। এসব বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ফরিদপুরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, পেঁয়াজ কত দিন সংরক্ষণ করা যাবে তা নির্ভর করে পেঁয়াজের জাতের ওপর। এবার পেঁয়াজের জাতের কারণে আকার বড় হয়েছে, যা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। তা ছাড়া পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টিপাতের কারণে পানির উপস্থিতি বেশি ছিল। ফলে সংরক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, চলতি বছর পেঁয়াজের আকার স্বাভাবিক পেঁয়াজের তুলনায় বড় হয়েছে। পেঁয়াজ বড় হলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে, আর পানির পরিমাণ বেশি হলে তার সংরক্ষণক্ষমতাও কম থাকে। সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ালে পচন থেকে কৃষকেরা রক্ষা পাবে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন। গত বুধবার পাবনার বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মমিন হোসেন বলেন, বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে। খুচরা বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। মাসখানেক আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। চাটমোহর উপজেলার ভাদড়া গ্রামের পেঁয়াজচাষি হাসু প্রামাণিক বলেন, তিনি ২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। মাসখানেক আগে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ বিক্রি করেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বাজারে বিক্রি করছেন। সাঁথিয়া উপজেলার কোনাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আবদুল লতিফ জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে ঘরে রাখা পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও দাম কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) রাফিউল ইসলাম বলেন, জেলায় পেঁয়াজচাষি আছেন লক্ষাধিক। সেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণ পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার কৃষককে। বেশির ভাগ কৃষক নিজেদের মতো করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলে কৃষক তখন পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর পাবনা জেলায় ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয় ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে। আর ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৬৭ টন। [প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ফরিদপুর, পাবনা, চাটমোহর ও সাঁথিয়া প্রতিনিধি]

পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে