ঢাকা    শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
৭ নভেম্বরের চেতনায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

৭ নভেম্বরের চেতনায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে কিংবা বাংলাদেশকে কোনো দেশের তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।শনিবার রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার বিকল্প নেই। এ জন্য ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনাকে মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে।তিনি বলেন, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল। এ দিনটি দেশের ইতিহাসে শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ওই সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চরম আকার ধারণ করেছিল। ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দী করা হয়। দেশের স্বার্থবিরোধী সেই ষড়যন্ত্র সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিয়েছিল। এ কারণে ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের চেতনার প্রতীক হয়ে আছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।তিনি আরও বলেন, পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র পরবর্তী সময়েও থেমে থাকেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মহাজোটের নামে তারা আবারও দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই অপশক্তির আবারও পরাজয় ঘটে এবং দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়।ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।১৯৭১ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের তুলনা করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও একইভাবে সিপাহি-জনতা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।তারেক রহমান বলেন, ইতিহাসে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের দিন হিসেবে বিবেচিত। যখনই বাংলাদেশ এই পথরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তখনই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, ৭ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ম্যাগনা কার্টা।জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও দল-মতনির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের পরিচয় একটাই আমরা বাংলাদেশি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ সবাই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে একই পরিচয়ে গর্বিত। এই পরিচয়ই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে।তিনি বলেন, যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অটুট থাকবে। এ বিপ্লবের নায়ক দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতা।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি যেমন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সম্মুখসমরে লড়াই করেছিলেন, তেমনি ৭ নভেম্বরও দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ সময় স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান তিনি।ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; শুদ্ধ ইতিহাস জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। এবারের আয়োজনে হাজারো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে। ইতিহাসসচেতন এই প্রজন্ম ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ পথ হারাবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, যে দেশের তরুণেরা জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত নয়, সে দেশের জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের তরুণেরা বাংলাদেশের স্বার্থে আপসহীন থাকার প্রমাণ দিয়েছে। সবার আগে বাংলাদেশ এটাই হওয়া উচিত সবার অঙ্গীকার।তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের গৌরব ধরে রাখা এবং স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব। বিশেষ করে তরুণদের একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশে প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলেই ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনায় দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ দিনের ঐতিহাসিক প্রেরণায় দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের স্লোগান হওয়া উচিত দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। এ সময় সেনাপ্রধান, বিমানবাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতেরা উপস্থিত ছিলেন।