যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের তৈরি স্নায়ুকোষ প্রতিস্থাপন করে নতুন ধরনের গবেষণার মডেল তৈরি করেছেন। এসব ইঁদুরের মস্তিষ্কে এখন লাখ লাখ মানব স্নায়ুকোষ সক্রিয় রয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই কোষ প্রতিস্থাপনের পর ইঁদুরগুলোর শেখার সক্ষমতাতেও উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গবেষণাগারে
তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের কোষপুঞ্জ ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তৈরি এই প্রাণীগুলোর
নাম দেওয়া হয়েছে ‘এলিয়েন-কর্টিক্যাল মাউস’। বিজ্ঞানবিষয়ক
সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত গবেষণাটি
স্নায়ুকোষের পারস্পরিক সংযোগ এবং মানব মস্তিষ্কের
বিভিন্ন রোগ বোঝার ক্ষেত্রে
নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ
করে সিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পালসি ও ডিমেনশিয়ার মতো
রোগ নিয়ে গবেষণায় এটি
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিষয়টি
শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বা মেরি শেলির
উপন্যাস ফ্রাংকেনস্টাইন-এর মতো মনে
হলেও গবেষকেরা বলছেন, এটি মানুষের মস্তিষ্ক
প্রতিস্থাপনের পরীক্ষা নয়। এসব ইঁদুর
মানুষের মতো চিন্তা করতে
পারে, এমন দাবিও করা
হয়নি।
যেভাবে
ইঁদুরের মস্তিষ্কে যুক্ত হলো মানব কোষ
গবেষণার শুরুতে বিজ্ঞানীরা জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন কিছু ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের অধিকাংশ অংশ এবং এর পাশের হিপোক্যাম্পাস অনুপস্থিত ছিল। মস্তিষ্কের বাইরের স্তর সেরিব্রাল কর্টেক্স মানুষের উপলব্ধি, চলাফেরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনোযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে শেখা ও স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে হিপোক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইঁদুরগুলোর
বয়স যখন মাত্র দুই
দিন, তখন তাদের মস্তিষ্কের
ফাঁকা জায়গায় মানুষের তৈরি বিশেষ কোষপুঞ্জ
প্রতিস্থাপন করেন গবেষকেরা। এসব
কোষপুঞ্জকে বলা হয় ‘অর্গানয়েড’। মানুষের স্টেম
সেল বা টিউমার টিস্যু
থেকে পরীক্ষাগারে এগুলো তৈরি করা হয়।
দেখতে ও কার্যপ্রণালিতে এগুলো
মানব অঙ্গের ক্ষুদ্র সংস্করণের মতো।
প্রতিটি
অর্গানয়েড তৈরি করা হয়েছিল
সুস্থ মানুষের স্টেম সেল থেকে। একেকটি
কোষপুঞ্জে ছিল প্রায় এক
লাখ মানব কোষ।
গবেষণায়
ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে প্রায় ১
কোটি ৪০ লাখ স্নায়ুকোষ
সরিয়ে সেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানব
স্নায়ুকোষ প্রতিস্থাপন করা হয়। মোট
২৯টি ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালানো
হয়। এর মধ্যে ২৫টির
ক্ষেত্রে কোষ প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া
সফল হয়।
মানব
কোষের বিস্তার, শেখার ক্ষমতায় উন্নতি
প্রতিস্থাপনের তিন মাসের মধ্যে ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব কোষগুলো আকারে প্রায় পাঁচ গুণ বড় হয়ে যায়। এসব কোষ ইঁদুরের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে। ইঁদুরের মস্তিষ্কের মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেকজুড়ে মানব টিস্যু ছড়িয়ে পড়লেও তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা ও ডাকাডাকিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গবেষকেরা
ইঁদুরগুলোকে গোলকধাঁধার মতো একটি পরীক্ষায়
অংশ নিতে দেন। এতে
দেখা যায়, যেসব ইঁদুরের
মস্তিষ্কে মানব কোষ প্রতিস্থাপন
করা হয়নি, সেগুলো বারবার পথ হারিয়েছে। অন্যদিকে
মানব কোষযুক্ত ইঁদুরগুলো তুলনামূলক ভালো ফল করেছে।
গবেষকদের ধারণা, প্রতিস্থাপিত মানব কোষ ইঁদুরগুলোর
শেখার ও চিন্তাভাবনার সক্ষমতায়
ভূমিকা রেখেছে।
পরীক্ষায়
আরও একটি ব্যতিক্রমী বিষয়
উঠে আসে। প্রতিস্থাপিত মানব
টিস্যুর কিছু কোষ ‘ভন
ইকোনোমো নিউরন’ নামের বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষে পরিণত হয়। লম্বা আকৃতির
এই স্নায়ুকোষ সাধারণত ইঁদুরের মস্তিষ্কে পাওয়া যায় না। পরীক্ষাগারে
তৈরি করাও বেশ কঠিন।
মানুষ
ছাড়াও বনমানুষ, তিমি ও হাতির
মতো সামাজিক প্রাণীর মস্তিষ্কে এ ধরনের স্নায়ুকোষ
রয়েছে।
সেরিব্রাল
পালসি গবেষণায় নতুন দিগন্ত
এই
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেরিব্রাল
পালসি নিয়ে। শিশুদের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে এ রোগ হতে
পারে। মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও জটিল প্রসবের
সময় এ ধরনের ঝুঁকি
তৈরি হলেও ইঁদুরের বাচ্চাদের
ক্ষেত্রে এমন ঘটনা তুলনামূলক
বিরল। ফলে ইঁদুরের ওপর
পরীক্ষা চালিয়ে সেরিব্রাল পালসির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বোঝা এত দিন
কঠিন ছিল।
এবারের
গবেষণায় জিনগত পরিবর্তন করা ইঁদুরগুলোকে কম
অক্সিজেনের পরিবেশে রাখা হয়। এতে
তাদের মস্তিষ্কে ক্ষতির পাশাপাশি হাঁটার ধরনে পরিবর্তন এবং
হাত-পায়ের সমন্বয় করার ক্ষমতা কমে
যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা
যায়।
গবেষকদের
মতে, এসব পরিবর্তন সেরিব্রাল
পালসির কিছু বৈশিষ্ট্য ও
এর পেছনের স্নায়বিক প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করতে পারে।
মানব
মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় কেন
এই পদ্ধতি?
মানুষের
মস্তিষ্ক নিয়ে সরাসরি গবেষণা
করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন।
মানব মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ
রয়েছে। এসব কোষের মধ্যে
সংযোগের সংখ্যা ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি
ছাড়িয়ে যায়। এত জটিল
গঠন এবং জীবিত মানুষের
মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণার নৈতিক
ও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞানীদের সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
এ
কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাগারে মানুষের
মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র কোষপুঞ্জ বা অর্গানয়েড তৈরির
চেষ্টা করছেন গবেষকেরা। তবে এসব অর্গানয়েড
পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের বিকল্প নয়। জীবন্ত মস্তিষ্কের
মতো জটিল সংযোগ, বিভিন্ন
ধরনের সংকেত গ্রহণ এবং পরিবেশের সঙ্গে
মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ এতে সীমিত।
স্ট্যানফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের
অধ্যাপক সেরগিউ পাসকা এই গবেষণাপত্রের প্রধান
লেখক। তাঁর মতে, মানুষের
মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অভূতপূর্ব
অন্তর্দৃষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পাসকা
বলেন, গত দুই দশক
ধরে মানবদেহের বাইরে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রম অনুকরণ করতে পারে, এমন
মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে। নতুন পদ্ধতিটি আগের
মডেলগুলোর বিকল্প নয়। তবে মানুষের
মস্তিষ্কের এমন কিছু কার্যক্রম
নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে, যা
অন্য উপায়ে বোঝা অত্যন্ত কঠিন।
মানব-প্রাণী সংকর তৈরির নৈতিক
বিতর্ক
বৈজ্ঞানিক
সম্ভাবনার পাশাপাশি এই গবেষণা নতুন
কিছু নৈতিক প্রশ্নও সামনে এনেছে। মানুষের মস্তিষ্কের কোষপুঞ্জ বা টিস্যু প্রাণীর
মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপনের ফলে কোনো ধরনের
অনুভূতি কিংবা চেতনা তৈরি হতে পারে
কি না, তা নিয়ে
উদ্বেগ রয়েছে। এমন সক্ষমতা তৈরি
হলে তা কীভাবে শনাক্ত
ও যাচাই করা হবে, সেটিও
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
গবেষকেরা
ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপিত মানব স্নায়ুকোষের বয়স
ছয় মাস হওয়ার আগেই
পরীক্ষা বন্ধ করে দেন।
তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, মানব কোষগুলো
যেন ইঁদুরের মস্তিষ্কের সঙ্গে আরও বেশি স্নায়বিক
সংযোগ তৈরি করতে না
পারে। পাশাপাশি চেতনা বা সচেতনতার কোনো
লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই
পরীক্ষা শেষ করা হয়।
এই
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি
অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর সমাজবিজ্ঞানের
অধ্যাপক জন ইভান্স। তাঁর
মতে, বর্তমান পরীক্ষাটি নিজে থেকে বড়
কোনো নৈতিক সংকট তৈরি করে
না। তবে ভবিষ্যতে আরও
জটিল নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে,
এমন প্রাণী তৈরির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় এটি।
ইভান্সের
আশঙ্কা, এ ধরনের গবেষণা
ধীরে ধীরে ইঁদুরের মতো
প্রাণী ছাড়িয়ে অমানব প্রাইমেট বা উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন
অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে
ক্ষেত্রে কোথায় গবেষণার সীমারেখা টানা হবে, তা
নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে
উঠবে।
এ
কারণে আপাতত ইঁদুরসহ তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীর মধ্যেই এ ধরনের গবেষণা
সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, গবেষণা
আরও বিস্তৃত হলে মানুষের ও
প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তৈরি স্নায়বিক সংকর
প্রাণীর উদ্ভব এবং তা ঘিরে
বড় ধরনের নৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।