ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?



এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?
ছবি: সংগ্রহ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের শেখার পদ্ধতি, চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার জগতে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। এ প্রযুক্তির সহায়তায় অল্প সময়ে জটিল বিষয় শেখা এবং নতুন ধারণা তৈরি করা সহজ হচ্ছে। তবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে সৃজনশীল কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট ইন এআই কনশাসনেস হিয়ার’স হাউ দিস নিউ ইন্টেলিজেন্স ইজ নাউ শেপিং আওয়ার্স শিরোনামের এক নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন এআই নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এআইয়ের প্রভাব শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ নয় মানুষের জ্ঞান অর্জন, স্মৃতি, চিন্তাভাবনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য।

ছয় সপ্তাহে দুই বছরের সমান শেখার অগ্রগতি

শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার শেখার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মানুষের দক্ষতা ও শিক্ষকের নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শিক্ষার্থীদের শেখার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নাইজেরিয়ার বেনিন সিটিতে পরিচালিত একটি গবেষণায় বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের জেনারেটিভ এআইভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা দেওয়া হয়। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা যে অগ্রগতি অর্জন করে, বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় দুই বছরের শেখার সমতুল্য।

তবে এআই ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া গেলেই যে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দক্ষতা একই হারে বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীকে সরাসরি উত্তর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নাকি নিজে চিন্তা করে সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করা হচ্ছে।

এআইয়ের ওপর নির্ভরতায় পরীক্ষার ফল কমতে পারে

শিক্ষার্থীদের ওপর এআইয়ের প্রভাব বোঝার জন্য ২০২৩ সালে তুরস্কের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শেখা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদল পাঠ্যবই ব্যবহার করে গণিত অনুশীলন করে। অন্য দুই দল ব্যবহার করে জিপিটি-৪-এর সাধারণ সংস্করণ এবং এমন একটি বিশেষায়িত সংস্করণ, যা সরাসরি উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিতের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সমাধানের দিকে এগিয়ে দেয়। ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ জিপিটি-৪ ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনী পরীক্ষায় নম্বর প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু পরে বই ছাড়া পরীক্ষা দেওয়ার সময় তাদের ফল পাঠ্যবই ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।

গবেষকদের ধারণা, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ ফলের একটি সম্ভাব্য কারণ। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত দিয়ে সমাধান খুঁজতে সাহায্য করা বিশেষায়িত এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল দেখা যায়নি। এ থেকে বোঝা যায়, এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত উত্তর পাওয়া এবং নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারা এক বিষয় নয়।

সৃজনশীলতা বাড়লেও কমতে পারে বৈচিত্র্য

লেখালেখি ও সৃজনশীল কাজেও এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২৯৩ জন লেখককে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় কয়েকজন লেখককে এআইয়ের দেওয়া গল্পের ধারণা ব্যবহার করতে বলা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা পাওয়া গল্পগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সৃজনশীল বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে, যাঁদের সৃজনশীলতার মাত্রা আগে তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তাঁদের কাজে উন্নতি বেশি দেখা গেছে।

তবে এর পাশাপাশি গল্পগুলোর মধ্যে মিলও বেড়েছে। অর্থাৎ, এআই একজন লেখকের সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করলেও অনেকের সৃষ্টিশীল কাজ একে অপরের মতো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সৃজনশীলতার উন্নতি এবং সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল বৈচিত্র্য বজায় রাখা দুটিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তির কারণে দক্ষতা হারানোর আশঙ্কা নতুন নয়

নতুন প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, এ নিয়ে উদ্বেগ বহু পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও লেখার প্রচলন মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। প্লেটোর ফেড্রাস সংলাপে লেখার আবিষ্কার নিয়ে আলোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল, লিখিত তথ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়লে মানুষ নিজের স্মৃতির পরিবর্তে বাইরের তথ্যভান্ডারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।

তবে লেখার প্রচলন মানুষের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। বরং জ্ঞান সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও বিকাশের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষক মিলম্যান প্যারি বলকান অঞ্চলের দক্ষিণ স্লাভিক কবিদের মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখতে পান, অনেক কবি লিখতে না জানলেও স্মৃতি থেকে হাজার হাজার পঙ্‌ক্তির দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। তাঁরা প্রতিবার কবিতাগুলো নতুনভাবে উপস্থাপনও করতেন।

এ উদাহরণ দেখায়, কোনো দক্ষতার চর্চা কমে গেলে সময়ের সঙ্গে তা হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তি নতুন সক্ষমতা তৈরি করলেও পুরোনো কিছু দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবন ও মস্তিষ্ক

মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। আগুনের ব্যবহার ও রান্নার প্রচলন মানুষের পূর্বপুরুষদের খাবার থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তি পেতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ সময়ে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষের দাঁত, চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন এসেছে।

কৃষিকাজের প্রসার মানুষের পক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সহজ করেছে। তবে এর ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদ, ভেষজ, মাশরুম ও বেরির মধ্যে কোনগুলো খাওয়ার উপযোগী, সে বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কমেছে।পড়ার অভ্যাসও মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী স্তানিসলাস দ্যানে ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, পড়তে শেখার ফলে মস্তিষ্কের দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার একটি অংশ লিখিত শব্দ শনাক্ত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে মুখ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ওই অংশের প্রতিক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও আসতে পারে।

দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেভলিন বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। মানুষের মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতা এবং সংস্কৃতির নমনীয়তা এ বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশ।

এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ব্যবহারের ধরনের ওপর

শেভলিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন একটি মাধ্যম। এটি একদিকে এমন কিছু কাজ করতে পারছে, যা আগে প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না; অন্যদিকে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা সম্প্রসারণের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

তবে এআই মানুষের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। কীভাবে এটি তৈরি করা হচ্ছে এবং মানুষ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা গবেষণায় সরাসরি উত্তর দেওয়া এআই এবং নিজে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করা এআইয়ের ফলাফলে পার্থক্য দেখা গেছে। অর্থাৎ, এমনভাবে এআই ব্যবহার করা সম্ভব, যাতে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার ক্ষমতা বিকশিত হয়।

মানবজাতি এখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে মানুষের কী ধরনের সুবিধা বা ক্ষতি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতাও রয়েছে।

বিষয় : প্রযুক্তি শিক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই

দৈনিক নবকাল

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?

প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের শেখার পদ্ধতি, চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার জগতে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। এ প্রযুক্তির সহায়তায় অল্প সময়ে জটিল বিষয় শেখা এবং নতুন ধারণা তৈরি করা সহজ হচ্ছে। তবে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে সৃজনশীল কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট ইন এআই কনশাসনেস হিয়ার’স হাউ দিস নিউ ইন্টেলিজেন্স ইজ নাউ শেপিং আওয়ার্স শিরোনামের এক নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন এআই নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এআইয়ের প্রভাব শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ নয় মানুষের জ্ঞান অর্জন, স্মৃতি, চিন্তাভাবনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য।

ছয় সপ্তাহে দুই বছরের সমান শেখার অগ্রগতি

শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার শেখার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মানুষের দক্ষতা ও শিক্ষকের নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শিক্ষার্থীদের শেখার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নাইজেরিয়ার বেনিন সিটিতে পরিচালিত একটি গবেষণায় বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের জেনারেটিভ এআইভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা দেওয়া হয়। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা যে অগ্রগতি অর্জন করে, বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় দুই বছরের শেখার সমতুল্য।

তবে এআই ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া গেলেই যে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দক্ষতা একই হারে বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীকে সরাসরি উত্তর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নাকি নিজে চিন্তা করে সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করা হচ্ছে।

এআইয়ের ওপর নির্ভরতায় পরীক্ষার ফল কমতে পারে

শিক্ষার্থীদের ওপর এআইয়ের প্রভাব বোঝার জন্য ২০২৩ সালে তুরস্কের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শেখা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদল পাঠ্যবই ব্যবহার করে গণিত অনুশীলন করে। অন্য দুই দল ব্যবহার করে জিপিটি-৪-এর সাধারণ সংস্করণ এবং এমন একটি বিশেষায়িত সংস্করণ, যা সরাসরি উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিতের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সমাধানের দিকে এগিয়ে দেয়। ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ জিপিটি-৪ ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনী পরীক্ষায় নম্বর প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু পরে বই ছাড়া পরীক্ষা দেওয়ার সময় তাদের ফল পাঠ্যবই ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।

গবেষকদের ধারণা, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ ফলের একটি সম্ভাব্য কারণ। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত দিয়ে সমাধান খুঁজতে সাহায্য করা বিশেষায়িত এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল দেখা যায়নি। এ থেকে বোঝা যায়, এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত উত্তর পাওয়া এবং নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারা এক বিষয় নয়।

সৃজনশীলতা বাড়লেও কমতে পারে বৈচিত্র্য

লেখালেখি ও সৃজনশীল কাজেও এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২৯৩ জন লেখককে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় কয়েকজন লেখককে এআইয়ের দেওয়া গল্পের ধারণা ব্যবহার করতে বলা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা পাওয়া গল্পগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সৃজনশীল বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে, যাঁদের সৃজনশীলতার মাত্রা আগে তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তাঁদের কাজে উন্নতি বেশি দেখা গেছে।

তবে এর পাশাপাশি গল্পগুলোর মধ্যে মিলও বেড়েছে। অর্থাৎ, এআই একজন লেখকের সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করলেও অনেকের সৃষ্টিশীল কাজ একে অপরের মতো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সৃজনশীলতার উন্নতি এবং সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল বৈচিত্র্য বজায় রাখা দুটিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তির কারণে দক্ষতা হারানোর আশঙ্কা নতুন নয়

নতুন প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, এ নিয়ে উদ্বেগ বহু পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও লেখার প্রচলন মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। প্লেটোর ফেড্রাস সংলাপে লেখার আবিষ্কার নিয়ে আলোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল, লিখিত তথ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়লে মানুষ নিজের স্মৃতির পরিবর্তে বাইরের তথ্যভান্ডারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।

তবে লেখার প্রচলন মানুষের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। বরং জ্ঞান সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও বিকাশের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষক মিলম্যান প্যারি বলকান অঞ্চলের দক্ষিণ স্লাভিক কবিদের মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখতে পান, অনেক কবি লিখতে না জানলেও স্মৃতি থেকে হাজার হাজার পঙ্‌ক্তির দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। তাঁরা প্রতিবার কবিতাগুলো নতুনভাবে উপস্থাপনও করতেন।

এ উদাহরণ দেখায়, কোনো দক্ষতার চর্চা কমে গেলে সময়ের সঙ্গে তা হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তি নতুন সক্ষমতা তৈরি করলেও পুরোনো কিছু দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবন ও মস্তিষ্ক

মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। আগুনের ব্যবহার ও রান্নার প্রচলন মানুষের পূর্বপুরুষদের খাবার থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তি পেতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ সময়ে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষের দাঁত, চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন এসেছে।

কৃষিকাজের প্রসার মানুষের পক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সহজ করেছে। তবে এর ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদ, ভেষজ, মাশরুম ও বেরির মধ্যে কোনগুলো খাওয়ার উপযোগী, সে বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কমেছে।পড়ার অভ্যাসও মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী স্তানিসলাস দ্যানে ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, পড়তে শেখার ফলে মস্তিষ্কের দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার একটি অংশ লিখিত শব্দ শনাক্ত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে মুখ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ওই অংশের প্রতিক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও আসতে পারে।

দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেভলিন বলেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। মানুষের মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতা এবং সংস্কৃতির নমনীয়তা এ বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশ।

এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ব্যবহারের ধরনের ওপর

শেভলিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন একটি মাধ্যম। এটি একদিকে এমন কিছু কাজ করতে পারছে, যা আগে প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না; অন্যদিকে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা সম্প্রসারণের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

তবে এআই মানুষের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। কীভাবে এটি তৈরি করা হচ্ছে এবং মানুষ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা গবেষণায় সরাসরি উত্তর দেওয়া এআই এবং নিজে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করা এআইয়ের ফলাফলে পার্থক্য দেখা গেছে। অর্থাৎ, এমনভাবে এআই ব্যবহার করা সম্ভব, যাতে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার ক্ষমতা বিকশিত হয়।

মানবজাতি এখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে মানুষের কী ধরনের সুবিধা বা ক্ষতি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতাও রয়েছে।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
এআই কি মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে?
0:00 0:00
1.0x