স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে মানুষের পরিচিত হওয়ার ধরন বদলে গেছে। এখন ঘরে বসেই নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি টিন্ডার, বাম্বল ও ট্যানট্যানের মতো ডেটিং অ্যাপও জনপ্রিয় হচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মে কেউ খুঁজছেন নতুন বন্ধু, কেউবা জীবনসঙ্গী। তবে অনলাইনে পরিচয়ের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার জালও বিস্তার করছে একশ্রেণির অপরাধী।
ভুয়া
পরিচয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে টাকা হাতিয়ে
নেওয়া, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও
সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করা
কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে আটকে রেখে
অর্থ আদায়- অনলাইন সম্পর্কের
আড়ালে এমন নানা ধরনের
অপরাধের অভিযোগ উঠছে। শুরুতে স্বাভাবিক পরিচয় ও আন্তরিক কথাবার্তার
মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করলেও একপর্যায়ে সেই বিশ্বাসকেই প্রতারণার
হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ডেটিং অ্যাপ যেভাবে কাজ করে
ডেটিং
অ্যাপ এমন একটি ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ছবি, বয়স, পছন্দ
ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে প্রোফাইল তৈরি
করেন। এরপর অন্য ব্যবহারকারীদের
সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও যোগাযোগের
সুযোগ পান। কারও উদ্দেশ্য
বন্ধুত্ব, আবার কেউ খোঁজেন
প্রেমের সম্পর্ক কিংবা জীবনসঙ্গী।
নিয়মিত
কথাবার্তার মধ্য দিয়ে দুই
ব্যক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, যখন
কেউ ভুয়া পরিচয়, অন্যের
ছবি কিংবা মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে
বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করেন। আকর্ষণীয় প্রোফাইল ও আবেগপূর্ণ কথাবার্তার
আড়ালে তখন চলতে পারে
প্রতারণার প্রস্তুতি।
প্রেমের সম্পর্ক গড়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া
অনলাইন
প্রতারকেরা সাধারণত প্রথমে ভুক্তভোগীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। নিয়মিত
খোঁজখবর নেওয়া, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা
বলা এবং আবেগের জায়গায়
প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তাঁরা আস্থা অর্জন করেন। কখনো অল্প সময়ের
মধ্যেই ভালোবাসা কিংবা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ককে গভীর
করার চেষ্টা করা হয়।
একপর্যায়ে
নানা অজুহাতে অর্থ চাওয়া শুরু
হয়। কেউ অসুস্থতার কথা
বলেন, কেউ বিপদে পড়ার
গল্প শোনান। আবার কেউ বিদেশ
থেকে দামি উপহার পাঠানোর
কথা বলে কাস্টমস বা
ডেলিভারি খরচের নামে টাকা দাবি
করেন।
সম্পর্কের
প্রতি বিশ্বাস থেকে অনেকেই অর্থ
পাঠিয়ে দেন। পরে দেখা
যায়, প্রতিশ্রুত উপহার আর আসে না,
কথিত সমস্যারও সমাধান হয় না। একসময়
যোগাযোগ বন্ধ করে দেন
প্রতারক।
ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল
অনলাইন
সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও
ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করার
ঝুঁকিও রয়েছে। ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে প্রতারকেরা ব্যক্তিগত
ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ
করতে পারেন। কখনো ভিডিও কলের
সময় গোপনে স্ক্রিন রেকর্ড করা হয়। পরে
এসব ছবি বা ভিডিও
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি
করা হয়।
কিছু
ক্ষেত্রে ভুয়া আইডি থেকে
আপত্তিকর ছবি পাঠিয়ে ভয়
দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। সামাজিক সম্মান ও পরিবারের কথা
ভেবে ভুক্তভোগীদের অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁদের
এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে
প্রতারকেরা বারবার অর্থ দাবি করতে
পারেন। একবার টাকা দেওয়ার পরও
দাবি বন্ধ না হয়ে
বরং আরও বাড়তে পারে।
ভুয়া প্রোফাইলের যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
অনলাইনে
কারও সঙ্গে পরিচয় হলেই তাঁকে বিশ্বাস
করা ঠিক নয়। কিছু
আচরণ সন্দেহের কারণ হতে পারে।
যেমন-
·
প্রোফাইলে
খুব কম ছবি বা
ব্যক্তিগত তথ্য থাকা।
·
অল্প
পরিচয়েই প্রেম, বিয়ে বা গভীর
সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া।
·
দ্রুত
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও
চাওয়া।
·
পরিচয়ের
শুরুতেই টাকা বা আর্থিক
সহায়তা চাওয়া।
·
সরাসরি
দেখা করা কিংবা ভিডিও
কলে কথা বলার ক্ষেত্রে
বারবার অজুহাত দেখানো।
·
বিদেশ
থেকে উপহার পাঠানোর কথা বলে কাস্টমস
বা ডেলিভারি খরচ দাবি করা।
·
কথাবার্তায়
অসংগতি থাকা কিংবা পরিচয়
সম্পর্কে বারবার তথ্য পরিবর্তন করা।
এ
ধরনের লক্ষণ দেখা গেলে সতর্ক
হওয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে ব্যক্তির পরিচয়
যাচাই করতে হবে। অনলাইনে
পরিচিত কারও কথার ওপর
নির্ভর করে অর্থ পাঠানো
কিংবা ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও
শেয়ার করার আগে ঝুঁকির
বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশেও বাড়ছে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ
বাংলাদেশেও
অনলাইন প্রেমের নামে প্রতারণার বিভিন্ন
ঘটনা সামনে এসেছে। ডেটিং অ্যাপের পাশাপাশি ফেসবুক, ইমো ও অন্যান্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধীরা মানুষের
সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে প্রতারণা করছেন
বলে অভিযোগ রয়েছে।
অতীতেও
ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক
গড়ে অপহরণ, আটকে রাখা এবং
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও
প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ
আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় অপরাধী
চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে এবং গ্রেপ্তারের ঘটনাও
ঘটেছে।
এআই দিয়ে ভুয়া পরিচয়, হানিট্র্যাপের অভিযোগ
সাম্প্রতিক
দুটি ঘটনা অনলাইন সম্পর্কের
আড়ালে প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে নতুন
করে সতর্ক করেছে।
২০২৬
সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ
ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)
একজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। অভিযোগ
অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার
করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক নারী সদস্যের
ছবি ও ভিডিও তৈরি
করেন। পরে নিজেকে নারী
সেনাসদস্য পরিচয় দিয়ে ফেসবুক ও
ইমোর মাধ্যমে ইতালিপ্রবাসী এক তরুণের সঙ্গে
প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এভাবে
ওই তরুণের কাছ থেকে প্রায়
সাত লাখ টাকা হাতিয়ে
নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এরপর
২৫ অক্টোবর রাজধানীর তুরাগ এলাকায় হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইল চক্রের
পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
পুলিশের অভিযোগ, চক্রটির সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে বিত্তশালী
পুরুষদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। পরে
তাঁদের নির্দিষ্ট বাসা বা হোটেলে
ডেকে আটকে রেখে আপত্তিকর
ছবি ও ভিডিও ধারণ
করা হতো। এসব ছবি
ও ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের
কাছ থেকে অর্থ আদায়
করা হতো বলে অভিযোগ
রয়েছে।
অনলাইন সম্পর্কে সতর্কতাই সুরক্ষার প্রথম ধাপ
প্রযুক্তি
মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি
করেছে। তবে অনলাইনে পরিচিত
ব্যক্তির পরিচয় ও উদ্দেশ্য সব
সময় সহজে যাচাই করা
যায় না। তাই সম্পর্কের
শুরুতেই অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও কিংবা
আর্থিক তথ্য শেয়ার করা
থেকে বিরত থাকা উচিত।
কেউ
অর্থ দাবি করলে, ব্যক্তিগত
ছবি প্রকাশের হুমকি দিলে কিংবা দেখা
করার জন্য চাপ সৃষ্টি
করলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ব্ল্যাকমেইলের
শিকার হলে আতঙ্কে টাকা
না দিয়ে প্রমাণ হিসেবে
কথোপকথন, প্রোফাইলের তথ্য ও লেনদেনের
রেকর্ড সংরক্ষণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।
অনলাইনে সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই বিশ্বাস যেন প্রতারণার সুযোগ তৈরি না করে, সে জন্য সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই।