ঢাকা    রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

তাহসিফ হত্যা মামলা: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্যের কেন্দ্রে সেই তরুণী



তাহসিফ হত্যা মামলা: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্যের কেন্দ্রে সেই তরুণী
ছবি: সংগ্রহ

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি যেসব স্থানে গিয়েছিলেন, সেসব এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার রাতে টঙ্গীতে দায়িত্ব পালন করা টহল পুলিশের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিতে যাওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় অবস্থান করেছিলেন তাহসিফ ও তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার জামান দীপ। তাঁদের সঙ্গে ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীও ছিলেন। ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, টহল পুলিশের সদস্যদের বর্ণনা এবং স্থানীয়দের তথ্যের কিছু অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

নেস্ট বারে এক ঘণ্টার বেশি

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার দিন উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরা অবস্থায় দেখা গেছে। বারে প্রবেশের সময় তাঁর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। এ সময় হেলমেট পরা দীপও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে করে তাহসিফ নেস্ট বারে আসেন এবং পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ওই সময় তাঁর সঙ্গে একজন তরুণী ছিলেন। তাঁরা বার থেকে তিন বোতল মদ কিনে পান করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তাঁরা টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকার দিকে যান।

তদন্তকারীরা ওই তরুণীকে খুঁজছেন। তাঁদের ধারণা, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ছায়া তদন্তে যুক্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্য অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

মামলার তদন্ত করছে নৌপুলিশ। সংস্থাটির পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মাসুমা আক্তার বলেন, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

টহল পুলিশের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের যে দলটি টহলে ছিল, তাদের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় দীপের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়েছিল। তখন তাঁর শরীরে কাদা ও নোংরা আবর্জনা লেগে ছিল।

টহল দলের এক সদস্য তদন্তকারীদের জানান, দীপের প্যান্টের নিচের অংশ ও জুতায় কাদা, ময়লা পানি এবং মলমূত্রের মতো পদার্থ লেগে ছিল। বিষয়টি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে দীপ নিজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বলে পরিচয় দেন। পরে তাঁকে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।

পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীপের শরীরে ময়লা লাগার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কী কারণে তাঁর পোশাকে এসব লেগেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দীপের দাবি, ঘটনার রাতে মাদক সেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাঁদের ধাওয়া করেছিল। এ সময় তিনি একদিকে এবং তাহসিফ অন্যদিকে দৌড়ে চলে যান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীপের এই বর্ণনার সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের কিছু গরমিল রয়েছে। বিশেষ করে টহল পুলিশের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার আগের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

হাজী মাজার বস্তিতে কী ঘটেছিল

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপকে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির প্রবেশপথ এলাকায় দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা একাধিকবার ওই এলাকায় যাওয়া-আসা করেছিলেন বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকারীরা ওই এলাকায় মাদক সেবনের সম্ভাব্য ঘটনাও খতিয়ে দেখছেন। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা, তাহসিফ ও দীপ সেখানে ইয়াবা অথবা হেরোইন সেবন করে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথা জানায়নি তদন্ত সংস্থা।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, টহল পুলিশ তাঁদের মাদক সেবনকারী সন্দেহে ধাওয়া করলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর দীপ ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশে লুকিয়ে থেকে পরে সেখান থেকে চলে যান।

তবে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তাঁরা। ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘটনার কাছাকাছি সময়ে তাহসিফ ও দীপের ফোনে করা যোগাযোগগুলো। সূত্রের দাবি, ওই সময় তাহসিফের ফোন থেকে তাঁর মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে দীপও মোহাম্মদপুরে তাঁর বাসার দারোয়ানকে ফোন করে ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে গেট খোলা রাখার অনুরোধ করেছিলেন।

এই যোগাযোগগুলোর সময় ও ঘটনার অন্যান্য তথ্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

দুই বন্ধুর ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায়

তাহসিফ ও দীপের মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য তাঁদের ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দীপের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য আলামতের অসংগতি থাকায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য জানার প্রয়োজন রয়েছে। তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে দীপের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ বা দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

চার দিনের রিমান্ডে দীপ

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত শনিবার দুপুরে দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস এ আদেশ দেন।

সংস্থাটির ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান জানান, তাহসিফের বাবার করা হত্যা মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আদালত থেকে বেরিয়ে আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না, তাঁকে কেন হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আসামির সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল।

আইনজীবী আরও বলেন, তাহসিফকে হত্যার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিকভাবে আলোচিত একটি ছবি বা ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাহসিফের ব্যক্তিগত জীবনও তদন্তে

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তাহসিফের ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও পরিচিতজনদের সম্পর্কের বিষয়গুলোও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন, ঘটনার আগে কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে সেগুলোকে মৃত্যুর কারণের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না বলে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে।

নৌপুলিশের তদন্তে পিবিআই সহযোগিতা করছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

তাহসিফের বাসায় রাওয়ার প্রতিনিধিদল

এদিকে গত শনিবার রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) একটি প্রতিনিধিদল তাহসিফের বাসায় যায়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রাওয়ার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু নাওয়াজ খুরশিদ আলম। এ সময় সংগঠনটির সদস্য মেজর (অব.) আল-আমিনসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

তাঁরা তাহসিফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের সান্ত্বনা দেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও রহস্য উদ্‌ঘাটনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ

গত মঙ্গলবার উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। পরদিন বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।

উদ্ধারের সময় তাঁর পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁর বাবা উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

এখন পর্যন্ত তদন্তে নেস্ট বারে অবস্থান, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যাতায়াত, টহল পুলিশের সঙ্গে দীপের সাক্ষাৎ এবং দুই বন্ধুর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তাহসিফের মৃত্যু কীভাবে ঘটেছে এবং এর পেছনে কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্তের ফল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করতে হবে।

বিষয় : পুলিশি তদন্ত তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলা পুলিশি তদন্ত সিসিটিভি ফুটেজ দীপের রিমান্ড তুরাগ নদ

দৈনিক নবকাল

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


তাহসিফ হত্যা মামলা: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্যের কেন্দ্রে সেই তরুণী

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি যেসব স্থানে গিয়েছিলেন, সেসব এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার রাতে টঙ্গীতে দায়িত্ব পালন করা টহল পুলিশের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিতে যাওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় অবস্থান করেছিলেন তাহসিফ ও তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার জামান দীপ। তাঁদের সঙ্গে ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীও ছিলেন। ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, টহল পুলিশের সদস্যদের বর্ণনা এবং স্থানীয়দের তথ্যের কিছু অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

নেস্ট বারে এক ঘণ্টার বেশি

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার দিন উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরা অবস্থায় দেখা গেছে। বারে প্রবেশের সময় তাঁর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। এ সময় হেলমেট পরা দীপও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে করে তাহসিফ নেস্ট বারে আসেন এবং পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ওই সময় তাঁর সঙ্গে একজন তরুণী ছিলেন। তাঁরা বার থেকে তিন বোতল মদ কিনে পান করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তাঁরা টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকার দিকে যান।

তদন্তকারীরা ওই তরুণীকে খুঁজছেন। তাঁদের ধারণা, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ছায়া তদন্তে যুক্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্য অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

মামলার তদন্ত করছে নৌপুলিশ। সংস্থাটির পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মাসুমা আক্তার বলেন, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

টহল পুলিশের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের যে দলটি টহলে ছিল, তাদের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় দীপের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়েছিল। তখন তাঁর শরীরে কাদা ও নোংরা আবর্জনা লেগে ছিল।

টহল দলের এক সদস্য তদন্তকারীদের জানান, দীপের প্যান্টের নিচের অংশ ও জুতায় কাদা, ময়লা পানি এবং মলমূত্রের মতো পদার্থ লেগে ছিল। বিষয়টি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে দীপ নিজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বলে পরিচয় দেন। পরে তাঁকে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়।

পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীপের শরীরে ময়লা লাগার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কী কারণে তাঁর পোশাকে এসব লেগেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দীপের দাবি, ঘটনার রাতে মাদক সেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাঁদের ধাওয়া করেছিল। এ সময় তিনি একদিকে এবং তাহসিফ অন্যদিকে দৌড়ে চলে যান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীপের এই বর্ণনার সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের কিছু গরমিল রয়েছে। বিশেষ করে টহল পুলিশের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার আগের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

হাজী মাজার বস্তিতে কী ঘটেছিল

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপকে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির প্রবেশপথ এলাকায় দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা একাধিকবার ওই এলাকায় যাওয়া-আসা করেছিলেন বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকারীরা ওই এলাকায় মাদক সেবনের সম্ভাব্য ঘটনাও খতিয়ে দেখছেন। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা, তাহসিফ ও দীপ সেখানে ইয়াবা অথবা হেরোইন সেবন করে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথা জানায়নি তদন্ত সংস্থা।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, টহল পুলিশ তাঁদের মাদক সেবনকারী সন্দেহে ধাওয়া করলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর দীপ ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশে লুকিয়ে থেকে পরে সেখান থেকে চলে যান।

তবে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তাঁরা। ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘটনার কাছাকাছি সময়ে তাহসিফ ও দীপের ফোনে করা যোগাযোগগুলো। সূত্রের দাবি, ওই সময় তাহসিফের ফোন থেকে তাঁর মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে দীপও মোহাম্মদপুরে তাঁর বাসার দারোয়ানকে ফোন করে ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে গেট খোলা রাখার অনুরোধ করেছিলেন।

এই যোগাযোগগুলোর সময় ও ঘটনার অন্যান্য তথ্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

দুই বন্ধুর ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায়

তাহসিফ ও দীপের মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য তাঁদের ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দীপের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য আলামতের অসংগতি থাকায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য জানার প্রয়োজন রয়েছে। তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে দীপের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ বা দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তদন্তকারীরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

চার দিনের রিমান্ডে দীপ

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত শনিবার দুপুরে দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস এ আদেশ দেন।

সংস্থাটির ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান জানান, তাহসিফের বাবার করা হত্যা মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আদালত থেকে বেরিয়ে আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না, তাঁকে কেন হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আসামির সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল।

আইনজীবী আরও বলেন, তাহসিফকে হত্যার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিকভাবে আলোচিত একটি ছবি বা ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাহসিফের ব্যক্তিগত জীবনও তদন্তে

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তাহসিফের ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও পরিচিতজনদের সম্পর্কের বিষয়গুলোও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন, ঘটনার আগে কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে সেগুলোকে মৃত্যুর কারণের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না বলে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে।

নৌপুলিশের তদন্তে পিবিআই সহযোগিতা করছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

তাহসিফের বাসায় রাওয়ার প্রতিনিধিদল

এদিকে গত শনিবার রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) একটি প্রতিনিধিদল তাহসিফের বাসায় যায়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রাওয়ার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু নাওয়াজ খুরশিদ আলম। এ সময় সংগঠনটির সদস্য মেজর (অব.) আল-আমিনসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

তাঁরা তাহসিফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের সান্ত্বনা দেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও রহস্য উদ্‌ঘাটনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ

গত মঙ্গলবার উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। পরদিন বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।

উদ্ধারের সময় তাঁর পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁর বাবা উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

এখন পর্যন্ত তদন্তে নেস্ট বারে অবস্থান, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যাতায়াত, টহল পুলিশের সঙ্গে দীপের সাক্ষাৎ এবং দুই বন্ধুর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তাহসিফের মৃত্যু কীভাবে ঘটেছে এবং এর পেছনে কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্তের ফল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করতে হবে।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
তাহসিফ হত্যা মামলা: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্যের কেন্দ্রে সেই তরুণী
0:00 0:00
1.0x