ঢাকা    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

দুর্যোগের আগাম বার্তায় এআই, কতটা বদলাবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি



দুর্যোগের আগাম বার্তায় এআই, কতটা বদলাবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
ছবি: সংগ্রহ

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ কিংবা শৈত্যপ্রবাহ—প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিপুল পরিমাণ আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এআইভিত্তিক মডেল। এর মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে এ প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে প্রচলিত আবহাওয়াবিজ্ঞান, বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এই সমন্বয় কার্যকরভাবে করা গেলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও যেসব পূর্বাভাসে এআই

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের ব্যবহার শুধু ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ণয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিবৃষ্টি থেকে বন্যার আশঙ্কা, তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব, প্রবল বাতাস, শৈত্যপ্রবাহ এবং কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও এ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে।

ধরা যাক, কোনো অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অতিবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এআইভিত্তিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা, বাঁধের অবস্থা পরীক্ষা করা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা এবং জরুরি সেবার পরিকল্পনা করার সুযোগ পেতে পারে।

একইভাবে, কোনো এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা থাকলে হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

তবে শুধু বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়ে স্থানীয় দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায় না। বন্যার আশঙ্কা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যার মানচিত্র, নদীর পানির স্তর, জনবসতি এবং অন্যান্য স্থানীয় তথ্যের সঙ্গে পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সম্ভাব্য বিপদের একাধিক চিত্র

এআইভিত্তিক পূর্বাভাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে কোনো দুর্যোগের সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায়।

ধরা যাক, একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে কোনো মডেল ৫০টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল। এর অধিকাংশ পরিস্থিতিতে ঝড়টি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। তবে কয়েকটি পরিস্থিতিতে অন্য এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনাও দেখা গেল।

এ ধরনের বিশ্লেষণ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। এতে শুধু একটি সম্ভাব্য গতিপথের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়।

তবে সব সম্ভাবনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়। কোন পরিস্থিতি কতটা সম্ভাব্য এবং কোনটির ঝুঁকি কতটা গুরুতর, তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

এআইয়ের পূর্বাভাসে সীমাবদ্ধতা কোথায়

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এ প্রযুক্তি এখনো সব পরিস্থিতিতে সমান কার্যকর নয়। আবহাওয়া একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। বায়ুমণ্ডলের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য পর্যাপ্ত না হলে এআইভিত্তিক মডেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। একইভাবে ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিরল বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য কম থাকলে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়াও কঠিন হতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, বৈশ্বিক পর্যায়ে ভালো ফল দেওয়া কোনো মডেল স্থানীয় পর্যায়েও একই মাত্রায় নির্ভুল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, নদ-নদী, উপকূলীয় পরিবেশ ও আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য পূর্বাভাসের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া পূর্বাভাস স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্ভুল পূর্বাভাসই শেষ কথা নয়

দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু নির্ভুল পূর্বাভাস পাওয়া যথেষ্ট নয়। সতর্কবার্তা কত আগে দেওয়া হলো, তা মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছাল কি না এবং মানুষ সেটি বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারল কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো মডেল ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ সঠিকভাবে অনুমান করলেও সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে না পৌঁছালে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হবে। আবার সতর্কবার্তার ভাষা অস্পষ্ট হলে মানুষ ঝুঁকির মাত্রা বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে।

অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করলে মানুষ বারবার অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য ঝুঁকি কম করে দেখালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে না। এ কারণে এআইয়ের পূর্বাভাস যাচাই, অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীলভাবে সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা জরুরি।

এআই ও আবহাওয়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ

আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভবিষ্যৎ এআই ও প্রচলিত আবহাওয়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। এআই দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে, আবহাওয়াবিদেরা বাস্তব পর্যবেক্ষণ, বায়ুমণ্ডলের ভৌত প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই পূর্বাভাস যাচাই করতে পারেন।

এই সমন্বয় আরও কার্যকর হলে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, তীব্রতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন এলাকা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে।

তবে প্রযুক্তির সাফল্য শুধু কত দ্রুত পূর্বাভাস তৈরি করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং কত আগে নির্ভরযোগ্য সতর্কতা পাওয়া গেল, কত মানুষের কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব হলো এবং এর ফলে কতটা প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো গেল—সেটিই হবে সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস তাই কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; এটি দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোরও একটি সম্ভাবনাময় হাতিয়ার। নির্ভরযোগ্য তথ্য, যথাযথ পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সঙ্গে এ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বিষয় : প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই জলবায়ু ও পরিবেশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস

দৈনিক নবকাল

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


দুর্যোগের আগাম বার্তায় এআই, কতটা বদলাবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ কিংবা শৈত্যপ্রবাহ—প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিপুল পরিমাণ আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এআইভিত্তিক মডেল। এর মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে এ প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে প্রচলিত আবহাওয়াবিজ্ঞান, বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এই সমন্বয় কার্যকরভাবে করা গেলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও যেসব পূর্বাভাসে এআই

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের ব্যবহার শুধু ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ণয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিবৃষ্টি থেকে বন্যার আশঙ্কা, তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব, প্রবল বাতাস, শৈত্যপ্রবাহ এবং কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও এ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে।

ধরা যাক, কোনো অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অতিবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এআইভিত্তিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা, বাঁধের অবস্থা পরীক্ষা করা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা এবং জরুরি সেবার পরিকল্পনা করার সুযোগ পেতে পারে।

একইভাবে, কোনো এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা থাকলে হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

তবে শুধু বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়ে স্থানীয় দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায় না। বন্যার আশঙ্কা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যার মানচিত্র, নদীর পানির স্তর, জনবসতি এবং অন্যান্য স্থানীয় তথ্যের সঙ্গে পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সম্ভাব্য বিপদের একাধিক চিত্র

এআইভিত্তিক পূর্বাভাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে কোনো দুর্যোগের সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায়।

ধরা যাক, একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে কোনো মডেল ৫০টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল। এর অধিকাংশ পরিস্থিতিতে ঝড়টি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। তবে কয়েকটি পরিস্থিতিতে অন্য এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনাও দেখা গেল।

এ ধরনের বিশ্লেষণ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। এতে শুধু একটি সম্ভাব্য গতিপথের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়।

তবে সব সম্ভাবনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়। কোন পরিস্থিতি কতটা সম্ভাব্য এবং কোনটির ঝুঁকি কতটা গুরুতর, তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

এআইয়ের পূর্বাভাসে সীমাবদ্ধতা কোথায়

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এ প্রযুক্তি এখনো সব পরিস্থিতিতে সমান কার্যকর নয়। আবহাওয়া একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। বায়ুমণ্ডলের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য পর্যাপ্ত না হলে এআইভিত্তিক মডেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। একইভাবে ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিরল বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য কম থাকলে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়াও কঠিন হতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, বৈশ্বিক পর্যায়ে ভালো ফল দেওয়া কোনো মডেল স্থানীয় পর্যায়েও একই মাত্রায় নির্ভুল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, নদ-নদী, উপকূলীয় পরিবেশ ও আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য পূর্বাভাসের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া পূর্বাভাস স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্ভুল পূর্বাভাসই শেষ কথা নয়

দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু নির্ভুল পূর্বাভাস পাওয়া যথেষ্ট নয়। সতর্কবার্তা কত আগে দেওয়া হলো, তা মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছাল কি না এবং মানুষ সেটি বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারল কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো মডেল ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ সঠিকভাবে অনুমান করলেও সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে না পৌঁছালে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হবে। আবার সতর্কবার্তার ভাষা অস্পষ্ট হলে মানুষ ঝুঁকির মাত্রা বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে।

অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করলে মানুষ বারবার অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য ঝুঁকি কম করে দেখালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে না। এ কারণে এআইয়ের পূর্বাভাস যাচাই, অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীলভাবে সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা জরুরি।

এআই ও আবহাওয়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ

আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভবিষ্যৎ এআই ও প্রচলিত আবহাওয়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। এআই দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে, আবহাওয়াবিদেরা বাস্তব পর্যবেক্ষণ, বায়ুমণ্ডলের ভৌত প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই পূর্বাভাস যাচাই করতে পারেন।

এই সমন্বয় আরও কার্যকর হলে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, তীব্রতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন এলাকা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে।

তবে প্রযুক্তির সাফল্য শুধু কত দ্রুত পূর্বাভাস তৈরি করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং কত আগে নির্ভরযোগ্য সতর্কতা পাওয়া গেল, কত মানুষের কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব হলো এবং এর ফলে কতটা প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো গেল—সেটিই হবে সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস তাই কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; এটি দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোরও একটি সম্ভাবনাময় হাতিয়ার। নির্ভরযোগ্য তথ্য, যথাযথ পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সঙ্গে এ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
দুর্যোগের আগাম বার্তায় এআই, কতটা বদলাবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
0:00 0:00
1.0x