ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে


অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে
ছবি: সংগ্রহ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই এর বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ব্যবহার বাড়ানোও ঝুঁকিপূর্ণ।

মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কে জিতবে—মূল প্রশ্ন সেটি নয়। বরং মানুষের তৈরি সমাজে যন্ত্রের সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে এআই নিয়ে দুটি বিপরীত ধারণা রয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, এ প্রযুক্তি মানবজাতির প্রায় সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, এআই মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে এর সুফল ও ঝুঁকি—দুটিই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে মানুষ কীভাবে সেটি তৈরি, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলালেও সব পরিবর্তন ইতিবাচক হয়নি।

এআইয়ের প্রভাব কর্মক্ষেত্রেও পড়ছে। নথি যাচাই, ই-মেইল লেখা কিংবা পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ এআই করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরির চাহিদা কমতে পারে। এতে বেকারত্বের পাশাপাশি মানুষের আয়, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে এআইয়ের সুফলও রয়েছে। চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ে এটি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করানো গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ভুলও কমানো যেতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে—ভুল সিদ্ধান্তের দায় নেবে কে? এআই মানুষের ভুল কমাতে পারে, আবার মানুষের বিচারবোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

ভুল তথ্য ছড়ানো, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও এআই নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে কম খরচে ও দ্রুত বিপুল পরিমাণ ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে সত্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কোনো যন্ত্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় কার—প্রোগ্রামার, সামরিক কমান্ডার, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি রাষ্ট্র—তা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।

এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলার অর্থ গবেষণা বন্ধ করা নয়। বরং কোথায় এআই ব্যবহার করা হবে, কোথায় হবে না এবং কী গতিতে এর ব্যবহার বাড়বে—সে বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, মানবিক জবাবদিহি ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াই নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ যন্ত্রের শক্তিকে নিজের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবে কি না। এআইকে মানুষের হাতে থাকা শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই রাখা ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো

বিষয় : প্রযুক্তি কর্মসংস্থান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই

দৈনিক নবকাল

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬


মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই এর বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ব্যবহার বাড়ানোও ঝুঁকিপূর্ণ।

মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কে জিতবে—মূল প্রশ্ন সেটি নয়। বরং মানুষের তৈরি সমাজে যন্ত্রের সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে এআই নিয়ে দুটি বিপরীত ধারণা রয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, এ প্রযুক্তি মানবজাতির প্রায় সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, এআই মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে গিয়ে এর সুফল ও ঝুঁকি—দুটিই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে মানুষ কীভাবে সেটি তৈরি, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলালেও সব পরিবর্তন ইতিবাচক হয়নি।

এআইয়ের প্রভাব কর্মক্ষেত্রেও পড়ছে। নথি যাচাই, ই-মেইল লেখা কিংবা পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ এআই করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক চাকরির চাহিদা কমতে পারে। এতে বেকারত্বের পাশাপাশি মানুষের আয়, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে এআইয়ের সুফলও রয়েছে। চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ে এটি চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করানো গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ভুলও কমানো যেতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে—ভুল সিদ্ধান্তের দায় নেবে কে? এআই মানুষের ভুল কমাতে পারে, আবার মানুষের বিচারবোধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

ভুল তথ্য ছড়ানো, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারির ক্ষেত্রেও এআই নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে কম খরচে ও দ্রুত বিপুল পরিমাণ ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে সত্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি তথ্যের পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কোনো যন্ত্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় কার—প্রোগ্রামার, সামরিক কমান্ডার, অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি রাষ্ট্র—তা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।

এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলার অর্থ গবেষণা বন্ধ করা নয়। বরং কোথায় এআই ব্যবহার করা হবে, কোথায় হবে না এবং কী গতিতে এর ব্যবহার বাড়বে—সে বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, মানবিক জবাবদিহি ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াই নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ যন্ত্রের শক্তিকে নিজের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবে কি না। এআইকে মানুষের হাতে থাকা শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই রাখা ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
মানুষের বিকল্প নয়, এআইকে মানুষের হাতিয়ার হিসেবেই রাখতে হবে
0:00 0:00
1.0x