কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে অনিশ্চয়তায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর এআই খাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার এক দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার থেকে ৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই পতনের ধাক্কা
লেগেছে এশিয়াতেও। শুক্রবার লেনদেন শুরুর পর দক্ষিণ কোরিয়ার
কোস্পি সূচক প্রায় ৯
শতাংশ কমে যায়। পরিস্থিতি
সামাল দিতে ২০ মিনিটের
জন্য লেনদেন বন্ধ রাখতে হয়।
জাপানের নিক্কেই সূচকও একপর্যায়ে ৬ শতাংশের বেশি
পড়ে যায়। গত বছরের
এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে শুল্কযুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর এটিই ছিল
বাজারটির সবচেয়ে বড় দরপতন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাক গত বছরের এপ্রিলের
পর বৃহস্পতিবার সবচেয়ে খারাপ দিন পার করেছে।
এদিন সূচকটি ৫ দশমিক ৫২
শতাংশ কমে সংশোধন পর্যায়ে
প্রবেশ করে। গত ৬
অক্টোবরের রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নাসডাকের দরপতন
১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে এসঅ্যান্ডপি
৫০০ ও ডাও জোনস
সূচকেও বড় পতন দেখা
যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সিএমসি
মার্কেটসের প্রধান ক্রিস্টোফার ফোর্বস বলেন, পরিস্থিতি বিপর্যয়কর। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অনেক
গ্রাহক সূচক ও বিভিন্ন
শেয়ারে বড় অঙ্কের অর্থ
বিনিয়োগ করেছিলেন। বাজারে পতনের ফলে তাঁদের অনেকেই
লোকসানে পড়েছেন। দিনজুড়েই গ্রাহকদের কাছ থেকে মার্জিন
কল ও অভিযোগ এসেছে।
ফোর্বস বলেন, ‘এটি কেবল মূল্যায়নের
দিক থেকে ধাক্কা নয়,
সম্পূর্ণ নীতি এবং ছয়
বছরের কাঠামোগত পরিবর্তন। আমরা এখন গতি
কমাব, ডেটা সেন্টার, অনুমোদন
এবং ইক্যুইটি ক্যাপিটাল মার্কেটকে স্থির করব।’
এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের
বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না,
তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে
আগে থেকেই সংশয় ছিল। নতুন
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সেই উদ্বেগ আরও
বাড়িয়েছে। ফলে এআই-সংশ্লিষ্ট
প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ
করে মার্জিন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ
করা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা
বেশি চাপে পড়েছেন।
তবে এশিয়ার বাজারে পতন ঠেকাতে বিভিন্ন
দেশের কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ায় দিনের শেষভাগে কয়েকটি শেয়ারসূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। দক্ষিণ
কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী লি হিয়ং-ইল
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম সাময়িকভাবে
শিথিল করেন।
তেল, ডলার ও স্বর্ণের
বাজারেও প্রভাব
শেয়ারবাজারের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্য ও মুদ্রাবাজারেও।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর দেশটির অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা নতুন
করে হিসাব-নিকাশ করছেন। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের
যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে
আলোচনার অগ্রগতিও জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করছে।
বৃহস্পতিবারের দরপতনের পর শুক্রবার আন্তর্জাতিক
বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১
দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে
ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি
পৌঁছায়। অন্যদিকে, ডলারের বিপরীতে ইউরো ও ইয়েনের
দাম কিছুটা কমেছে। স্বর্ণের দামও হ্রাস পেয়েছে।
অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা সব ধরনের সম্পদ
থেকে একযোগে অর্থ তুলে নিচ্ছেন,
বিষয়টি এমন নয়; বরং
বিভিন্ন সম্পদশ্রেণিতে নিজেদের বিনিয়োগের অবস্থান নতুন করে সাজাচ্ছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য শেয়ারবাজারের এই পতন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি। এই খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়ার চিপ উৎপাদনকারী দেশ, ইউরোপের প্রযুক্তি সরঞ্জাম নির্মাতা এবং বিভিন্ন দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।