ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান, উদ্বেগে ভারত

মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান, উদ্বেগে ভারত

মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া উচিত কি না এ নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি। আলোচনার একটি অংশে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে তা ভারতের নিরাপত্তা ও পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত অবস্থানে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্বার্থ।মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের পক্ষে যাঁরা যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁদের মতে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁদের বিশ্লেষণে, জোটটি কার্যকর হলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা বাড়লে ভারতের পূর্ব সীমান্ত ঘিরে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি ইতিমধ্যে দেশটির সরকারি বক্তব্যেও এসেছে। গত ২৮ আগস্ট সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, তাঁরা পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছেন, বিশেষ করে কোনো বিষয় ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে। ভারতের নিরাপত্তা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।বাংলাদেশের নিরাপত্তা বনাম ভারতের উদ্বেগমক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে বিতর্কের একটি বড় প্রশ্ন হলো—কোন দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে। সমালোচকদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশ জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে নতুন করে নিরাপত্তাগত টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, এতে সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত তৎপরতা বাড়তে পারে।অন্যদিকে জোটে যোগদানের পক্ষের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো তৃতীয় দেশের নিরাপত্তা-উদ্বেগের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এই মতের সঙ্গে অবশ্য ভিন্নমতও রয়েছে। সমালোচকেরা মনে করেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত ও বহুমাত্রিক সম্পর্কের কারণে যেকোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের আঞ্চলিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।পাকিস্তান-তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ও আলোচনায় আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কা জোটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা ছিল।এসব যোগাযোগকে কেউ কেউ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে কেবল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বা কূটনৈতিক যোগাযোগকে কোনো সামরিক জোটে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।ইরান কি মক্কা জোটের বিরোধী?মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনার শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল এটি কি ইরানবিরোধী কোনো সামরিক বা কৌশলগত জোট হয়ে উঠবে? লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়নি। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তেহরান মক্কা চুক্তিকে ইরানবিরোধী জোট হিসেবে দেখছে না এবং বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলেও ইরানের উদ্বেগের কারণ হবে না।লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মক্কা চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে আনা। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টিও আঞ্চলিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে মক্কা জোটের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। জোটটি কতটা সামরিক সহযোগিতাভিত্তিক হবে, এর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি কী হবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে তারা কীভাবে অবস্থান নেবে এসব বিষয় স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।ইয়েমেন প্রসঙ্গমক্কা জোট নিয়ে আলোচনায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাতও সামনে আসছে। সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাতের সময় তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি সরাসরি সৌদি অবস্থানের সঙ্গে না থাকে, তাহলে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো কতটা কার্যকর হবে।লেখাটিতে এর জবাবে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখলের পর ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাতকে সরলভাবে দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত—এমন একটি যুক্তি লেখাটিতে দেওয়া হয়েছে।১৯৭১ ও ভারতের নিরাপত্তা ভাবনাবাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থের সম্পর্কও লেখাটিতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার ফলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটে। একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের সম্ভাবনা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগও কমে আসে।তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক কোন পথে এগিয়েছে, সেটি নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর ভারত বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের সময় এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের প্রভাব নিয়ে লেখক যে মূল্যায়ন করেছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তান, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ বাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত কৌশলগত সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।তবে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও যুক্ত। ফলে বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্তটি নিতে হলে সম্ভাব্য লাভ ও ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।সবশেষে প্রশ্নটি দাঁড়ায়, বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে কোন ধরনের ভারসাম্য অনুসরণ করবে। মক্কা জোটে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিক্রিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাবও। এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কৌশলের আলোকে বিবেচনা করার বিষয়।লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ