ঢাকা    রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে উদ্যোগ ঢাকার

পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে উদ্যোগ ঢাকার

পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। এ লক্ষ্যে শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বিভিন্ন বাধা দূর করার প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।আগামী ১ ও ২ ডিসেম্বর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মদলের (জেডব্লিউজিটি) প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক বাধাগুলো তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের মান, কারিগরি বিধিবিধান এবং স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শর্ত (এসপিএস) নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের প্রস্তাব দেওয়া হবে। এসব বাধা কমানো গেলে পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।এ ছাড়া বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।আমদানি-রপ্তানিতে বড় ব্যবধানবাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রধানত তুলা, বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, সিমেন্ট ক্লিংকার ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি হয় পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, চা, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড এবং তৈরি পোশাক।পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটি বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর প্রায় ৭৯ শতাংশ ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল—সুতা, কাপড় ও প্রস্তুত চামড়া। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ডলারের কিছু বেশি।সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তান বাংলাদেশে ৭১ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পাকিস্তানের বাজারে নিয়ন্ত্রক জটিলতা দূর করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।বাণিজ্যমন্ত্রীর পাকিস্তান সফরের সম্ভাবনাএদিকে পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দেশটি সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এ বিষয়ে ঢাকাকে অবহিত করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীকে আতিথ্য দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।প্রস্তাবিত সফরে বাংলাদেশের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং পাকিস্তানের ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তানের (টিসিপি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই করতে চায় দেশটি।এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। এর আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি-রপ্তানি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শবাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ও দর-কষাকষি হতে হবে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে। অর্থনৈতিক ভিত্তি বিবেচনা না করে কোনো চুক্তি করা হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তুলনামূলক সুবিধা বা কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ বিবেচনায় নিয়ে আমদানি-রপ্তানির কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ কর্মদলের বৈঠকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য তুলনামূলক সহজে ও কম খরচে আমদানি করতে পারে, সেসব বিষয়ে দর-কষাকষিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যেসব পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে, সেগুলোর বাজার সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশকেই নিজ নিজ স্বার্থ বিবেচনায় কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে।অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, বাণিজ্য আলোচনায় সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিকেই সব সময় প্রধান বিবেচ্য বিষয় করা ঠিক নয়। কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ভালো থাকলে সেখানে আমদানি বাড়ানোর চিন্তা না করে রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আবার যেসব দেশ থেকে তুলনামূলক সুবিধায় পণ্য আমদানি করা যায়, সেসব ক্ষেত্রে কার্যকর দর-কষাকষি করতে হবে।অর্থাৎ প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নির্ধারণে পণ্যভিত্তিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক হেলাল বলেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করতে পারেননি। এর রাজনৈতিক মূল্যও তাঁকে দিতে হচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ইসলামাবাদে যৌথ কর্মদলের বৈঠক এবং সম্ভাব্য মন্ত্রী পর্যায়ের সফর কার্যকর হলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।