ঢাকা    শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
ছয় মাসে বিএনপি সরকার: সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব

ছয় মাসে বিএনপি সরকার: সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব

কোনো সরকারের প্রথম কয়েক মাসেই তার অগ্রাধিকার, সক্ষমতা ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশের অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক গণতন্ত্রে তাই সরকারের প্রথম ১০০ দিন বা ছয় মাসকে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও ছয় মাস পূর্তিতে সেই মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।আজ ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব নেয়।সরকারের ছয় মাস পূর্তিকে ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচনী অঙ্গীকারের অধিকাংশই ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এই দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কতটা মিল রয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নও রয়েছে।১৮০ দিনের হিসাবসরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে ১৮০ দিনের একটি সময়সীমা প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের ভাষণে তিনি সরকার ও দলের কাজের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য এই সময়ের কথা তুলে ধরেন।নির্বাচনের আগে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘ধানের শীষের বিজয় হলে ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন।’ ফলে ছয় মাস পূর্তির এই মূল্যায়ন কেবল বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরীক্ষা নয়; বরং সরকারের নিজের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতাগণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবায় দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চাইছেন মানুষ।সরকার ইতোমধ্যে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছে। তবে ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে সরকারকে এখনই পুরোপুরি সফল কিংবা ব্যর্থ—কোনো একটি অভিধায় চিহ্নিত করা কঠিন।সরকারের কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতিতে পরিবর্তন আসেনি। ফলে ছয় মাসের হিসাবের পাল্লা এখনো পুরোপুরি কোনো একদিকে হেলে পড়েনি।সামনে আরও বড় পরীক্ষারাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি সরকারের জন্য প্রথম ছয় মাস গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা।সব মিলিয়ে ছয় মাসের মূল্যায়নে বর্তমান সরকারের অবস্থানকে একেবারে সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার খাতায় ফেলা যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত সামগ্রিক পাল্লা সামান্য হলেও আশার দিকেই ঝুঁকে আছে—এমন মূল্যায়নই সামনে আসছে।

বিএনপি সরকারের ৬ মাসে দৃশ্যমান সাফল্য নেই: জামায়াত

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো সুস্পষ্ট সাফল্য দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছে দলটি।মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পর এখন প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের কাছে জবাবদিহির ভিত্তিতে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের সময় এসেছে। তাঁর দাবি, এই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা ও বাস্তব ফলাফলের ঘাটতি দেখা গেছে।জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেইগণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে।নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেটের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি।তাঁর দাবি, ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি।জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোর কোনোটি গত ছয় মাসে বাস্তবায়িত হয়নি।জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটজ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে পড়ছে।জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে এবং প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্নআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও সরকারি তথ্য উদ্বেগ তৈরি করছে।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নের তথ্য উল্লেখ করে তিনি মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার কথা তুলে ধরেন।পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে ৯১৫টি হত্যা মামলা, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩ হাজার ২৭৭টি চুরি এবং ৫ হাজার ৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা পাওয়া গেছে।দ্রব্যমূল্য ও ব্যাংকিং খাতদ্রব্যমূল্য নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছে জামায়াত। দলটির হিসাবে, জুন ২০২৬-এ দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো বেশি। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়ছে এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।তাঁর অভিযোগ, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট ও আমানতকারীদের আস্থাহীনতা কাটাতে সরকার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।পররাষ্ট্রনীতি ও রোহিঙ্গা সংকটপররাষ্ট্রনীতিতেও সরকারের কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে বলে দাবি করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ঘোষণা করা হলেও ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কাঠামোতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হলেও প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। একই সময়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।সরকারের প্রতি জামায়াতের আট দফাসংবাদ সম্মেলনে সরকারকে আট দফা আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল গ্রহণ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা।এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জ্বালানি কূটনীতি, শ্রমবাজার ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে দলটি।দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বাভাবিক মুনাফা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং দুর্বল ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে জামায়াত।মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ সরকারকে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী সময়ে সরকার দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বিএনপি সরকারের ৬ মাসে দৃশ্যমান সাফল্য নেই: জামায়াত