জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপর থেকেই নতুন কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চলছে। ছাত্রদলের প্রায় সব সাংগঠনিক ইউনিটের কাজ শেষ করে নতুন নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বর্তমান নেতারা। এখন নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের অপেক্ষা।
ছাত্রদলের নতুন
কমিটি নিয়ে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে
তৎপরতাও বেড়েছে। নিজ নিজ বলয়ে
যোগাযোগের পাশাপাশি বিএনপির হাইকমান্ডের মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। তবে নতুন কমিটি
গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমান নেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো
জানিয়েছে।
২০২৪ সালের
১ মার্চ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের
দায়িত্ব নেন রাকিবুল ইসলাম
রাকিব ও নাছির উদ্দীন
নাছির। সংগঠনের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী
কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর প্রস্তাব
করা হয়েছে। সেই হিসাবে গত
২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
ছাত্রদল সভাপতি
রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, তাঁদের কাজ প্রায় শেষ।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন প্রয়োজন মনে
করবেন, তখন নতুন কমিটি
ঘোষণা করা হবে।
নেতৃত্বে
কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে
বিএনপি ও
ছাত্রদলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা
গেছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে
আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দলের প্রতি
আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতের মতো কোনো সিন্ডিকেটের
প্রভাব বা ‘পকেট কমিটি’র বদলে পরীক্ষিত
ও দক্ষ নেতৃত্ব বাছাইয়ের
বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের
মতে, দীর্ঘদিন সময়মতো কমিটি না হওয়ায় ছাত্রদলে
নেতৃত্বের একটি জট তৈরি
হয়েছে। তাই নতুন নেতৃত্ব
বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও
বিবেচনায় রয়েছে। এ কারণে ২০০৮-০৯ থেকে পরবর্তী
কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্য থেকে শীর্ষ
নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা নিয়ে
আলোচনা রয়েছে।
ঢাবি
থেকে যাঁদের নাম আলোচনায়
নতুন কমিটির
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক
পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)
থেকে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
২০০৮-০৯
শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল আলোচনায়
রয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তিনি হামলা, মামলা,
কারাবরণ ও পুলিশি নির্যাতনের
শিকার হয়েছেন। ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি
ছাড়াও কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার
বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
একই ব্যাচের
মনজুরুল আলম রিয়াদ, এবিএম
ইজাজুল কবির রুয়েল ও
সাফি ইসলামও আলোচনায় রয়েছেন। রিয়াদ বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এবং এর আগে
কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও অমর একুশে
হলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রুয়েল
আন্দোলন-সংগ্রামের সময় একাধিক মামলার
আসামি হয়ে কারাবরণ করেছেন।
২০০৯-১০
শিক্ষাবর্ষের মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম
সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, ২ নম্বর যুগ্ম
সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ও মোস্তাফিজুর
রহমানের নাম রয়েছে।
জিসান দীর্ঘদিন
ধরে সংগঠনে সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর
দাবি, দল ও নেতাকর্মীদের
প্রয়োজনে তিনি নিজের সাধ্যের
মধ্যে পাশে থাকার চেষ্টা
করেছেন। তবে দলের সিদ্ধান্তই
তাঁর কাছে চূড়ান্ত।
ফারুক হোসেনকে
ক্লিন ইমেজের নেতা ও দক্ষ
সংগঠক হিসেবে বর্ণনা করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
আমানউল্লাহ আমান ঢাবি ছাত্রদলের
সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলনের
সময় হামলায় আহত হওয়ার পাশাপাশি
তিনি মামলায় গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার
হয়েছেন। মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৯ সালের ডাকসু
নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন।
আরও
যাঁদের নিয়ে আলোচনা
২০১০-১১
শিক্ষাবর্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সংসদের
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, ঢাবি শাখার সভাপতি
গণেশ চন্দ্র সাহস, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ মাসুম ও সহসভাপতি আনিসুর
রহমান খন্দকার অনিকের নামও আলোচনায় রয়েছে।
তারিক আন্দোলন-সংগ্রামে একাধিকবার হামলা, গুলিবিদ্ধ ও গ্রেপ্তারের শিকার
হয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের
দেওয়া দায়িত্ব পালন এবং রাজপথের
সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক পদে বিবেচনার আলোচনা
রয়েছে।
অনিক ২০১৯
সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের মনোনীত জিএস প্রার্থী ছিলেন।
আন্দোলনের সময় তিনি গুম
ও কারাবরণের শিকার হন বলে সংশ্লিষ্টরা
জানিয়েছেন।
২০১১-১২
শিক্ষাবর্ষের নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহামেদ, গাজী
মো. সাদ্দাম হোসেন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক
মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স এবং ঢাবি ছাত্রদলের
সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
বিভিন্ন সমীকরণে রাজু আহামেদ কেন্দ্রীয়
সাধারণ সম্পাদক পদের আলোচনায় এগিয়ে
আছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
রাজু আহামেদ
বলেন, নতুন নেতৃত্ব ও
নবোদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশের
ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। তাঁদের আশা, বিএনপির চেয়ারম্যান
তারেক রহমান অচিরেই নতুন কমিটি ঘোষণা
করবেন।
এ ছাড়া
২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের নূর
আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সিনিয়রদের মধ্যে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের
বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির ও সিনিয়র যুগ্ম
সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুমের নাম সভাপতি পদে
আলোচনায় এসেছে। তবে নাছির জানিয়েছেন,
তিনি নতুন কমিটিতে থাকতে
চান না।
ঢাবির
বাইরেও কয়েকজন আলোচনায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাইরে সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে ছাত্রদলের বর্তমান সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান
আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত
এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হোরায়রা ও
সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম
তালুকদার বিন্দুর নাম রয়েছে।
ডা. আউয়াল
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসাসেবায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতেও সক্রিয় ছিলেন। কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত
আন্দোলনের সময় মামলা, গ্রেপ্তার
ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রেকর্ডসংখ্যক
সাংগঠনিক কমিটি
বর্তমান রাকিব-নাছির কমিটির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে
প্রায় সব সাংগঠনিক ইউনিটে
কমিটি গঠনের বিষয়টি তুলে ধরছেন নেতারা।
ছাত্রদলের সাধারণ
সম্পাদক নাছিরের ভাষ্য, তাঁদের মেয়াদে প্রায় ২ হাজার ১০০
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি করা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ
জেলা ও মহানগরের প্রায়
সব কমিটিও দেওয়া হয়েছে। পাঁচ থেকে সাতটি
কমিটি এখনো চূড়ান্ত করা
সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন,
দেশের এক হাজারের বেশি
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের কমিটি দিয়ে একটি সাংগঠনিক
কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে।
বাকি কমিটিগুলোর কাজও শেষ হয়েছে;
দল চাইলে সেগুলো জমা দেওয়া যাবে।
নাছির আরও
বলেন, কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজের সঙ্গে
নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।
এটি চলমান সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, পরবর্তী নেতৃত্ব এসে তা সম্পন্ন
করবে।
নতুন কমিটি কবে ঘোষণা হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নতুন কমিটি এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিবেচনায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে।