ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও বিভিন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা নিয়ে আলোচনায় বসছেন বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা।
আজ
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে জি-২০-এর অর্থমন্ত্রী
ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক
সভার পাশাপাশি ১২ থেকে ১৮
অক্টোবর এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত
হচ্ছে।
বৈঠকে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা
করা হচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে হামলার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে
বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির
দাম বেড়েছে। গত আট মাসের
বেশির ভাগ সময় অপরিশোধিত
তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০
ডলারের ওপরে ছিল। এতে
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল
ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যয় এবং সাধারণ
মানুষের পারিবারিক বাজেটে চাপ বেড়েছে।
বৈঠকে থাকছেন না যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী
জি-২০-এর অর্থমন্ত্রী
ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে অধিকাংশ সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এতে
উপস্থিত থাকবেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের
প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।
তবে
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী
এবং জি-২০-এর
বর্তমান সভাপতি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা স্কট বেসেন্ট বৈঠকে
অংশ নিচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা
জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততার কারণে তিনি যোগ দিতে
পারছেন না। তাঁর পরিবর্তে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন উপঅর্থমন্ত্রী ফ্রান্সিস ব্রুক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক
আন্ডারসেক্রেটারি এরিন ব্রাউন।
জি-২০-এর নিয়মিত
বৈঠকগুলোর একটি এটি। এখানকার
আলোচনা আগামী ১৪ ও ১৫
ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ নেতাদের
মূল সম্মেলনের আলোচ্যসূচি নির্ধারণেও ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধের আহ্বান অস্ট্রেলিয়ার
বৈঠকের
আগে অস্ট্রেলিয়ার কোষাধ্যক্ষ জিম চালমার্স মধ্যপ্রাচ্যের
সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ
প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার
আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্ব
অর্থনীতির জন্য এখন এটিই
সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।
এক
বিবৃতিতে চালমার্স বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানির
দাম, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার
বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
হরমুজ
প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এ পথে
জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি
সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন, পরিবহন
ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
দামের ওপর।
ঋণের বোঝা নিয়েও উদ্বেগ
বৈঠকে
বিভিন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ
আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো
দেশগুলোর সরকারি ঋণ তাদের মোট
দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
বুধবার
এক বক্তব্যে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেন, ক্রমবর্ধমান
ঋণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে
উঠছে। সরকারের কর বাড়ানো বা
ব্যয় কমানোর প্রয়োজন এড়ানোর কোনো ‘জাদুকরি’ সমাধান নেই বলেও মন্তব্য
করেন তিনি।
বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
জি-২০-এর সদস্যদেশগুলো
নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের
ভিত্তিতে আরও কিছু বিষয়
বৈঠকে তুলবে। এর মধ্যে রয়েছে
বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে
উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এর মধ্য দিয়ে
মূলত চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের
অভিযোগ, চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পব্যবস্থার কারণে দেশটির রপ্তানিকারকেরা কম দামে বিদেশের
বাজারে পণ্য বিক্রি করতে
পারছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে
আসছেন, চীনের বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। গত
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনের ক্রমপুঞ্জীভূত বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৯৩৮ বিলিয়ন
ডলার।
বুধবার
আইএমএফের উদ্দেশে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্কট
বেসেন্ট বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বিশেষ
করে অ-বাজারভিত্তিক নীতি
ও চর্চা এবং বিনিময় হার
কীভাবে বৈদেশিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, তা
নিয়ে আইএমএফের বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর
সঙ্গে সম্পৃক্ততা জোরদার করা প্রয়োজন।’
বেসেন্ট
আরও বলেন, কিছু অর্থনীতির বাজার
বিকৃতকারী নীতি প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত
করছে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষতি
করছে। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, তা
নিয়ে বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের কঠিন আলোচনার মুখোমুখি
হতে হচ্ছে।
সব
মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি ঋণের চাপ এবং
বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা—এই বিষয়গুলোই জি-২০-এর এবারের
বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।