ঢাকা    সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
বরিশালে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট, অস্ত্র নিয়ে মহড়া-শোডাউন

বরিশালে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট, অস্ত্র নিয়ে মহড়া-শোডাউন

বরিশাল নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণদের বিভিন্ন গ্রুপের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মোটরসাইকেলে দলবেঁধে চলাচল, প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন, শোডাউন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নগরীর পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়া এসব গ্রুপের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক।স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গ্রুপের একটি অংশ মাদক, ছিনতাই, চুরি, ইভটিজিং, মারামারি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কখনো ১০ থেকে ১৫টি মোটরসাইকেলে বড় বহর নিয়ে সড়কে মহড়া দিতে দেখা যায় তাদের। কেউ বাধা দিলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।সম্প্রতি নগরীর পলাশপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় মাছ ব্যবসায়ী বাবু শিকদার নিহত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় কাউনিয়া থানা পুলিশ টোকাই মধু, শহীদ ওরফে কালা শহীদ ও মন্টু সিয়ামকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, আলোচিত ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ চক্রের নেতা রিদওয়ান এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার করা না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বরিশাল মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৫০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে পুলিশ বলছে, তাদের কাছে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা রয়েছে এবং তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।অস্ত্রের ভিডিও ছড়িয়ে আতঙ্কসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে কয়েকজনকে মোটরসাইকেলে করে ধারালো অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। পরে নদীর পাড়ে গিয়ে তাদের মধ্যে অস্ত্র হস্তান্তরের দৃশ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের এমন ঘটনা কীভাবে ঘটছে। তাঁদের অভিযোগ, বেলস পার্ক ও আশপাশের সড়ক, কালিজিরা নদীর পাড় থেকে চরবাড়িয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণদের মোটরসাইকেল শোডাউন এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে।বরিশাল নগরের গরিয়ারপাড়, চৌমাথা, নিউ সার্কুলার রোড, বাংলাবাজার, কালুশাহ সড়ক, বটতলা, পলিটেকনিক রোড, আমিরকুটির, কেডিসি, চাঁদমারী, মতাসার, কাকাশুরা, সাধুর বটতলা, কাউনিয়া হাউজিং, জানুকিসিংহ রোড, বিসিক, বাগানবাড়ি, হাওলাদার সড়ক, কাশিপুর, সাগরদি, রূপাতলী, কালীবাড়ী রোড, বিএম স্কুল, নতুন বাজার ও বিএম কলেজ এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতার কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়।স্থানীয়ভাবে রিফাদ-রিয়াদ, সাগর-শাহরুখ, জিহাদ, মুন্না-সামির, হিরা ও স্টেলিনসহ বিভিন্ন গ্রুপের নাম আলোচনায় রয়েছে। পলাশপুরেও একাধিক গ্রুপ সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরাস্থানীয়দের ভাষ্য, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন শুধু পাড়া-মহল্লায় সীমাবদ্ধ নেই। নগরের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রেও দলবদ্ধভাবে তাদের অবস্থান ও আড্ডার অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্ক ও জিলা স্কুল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।নারীদের উত্ত্যক্ত করা, মোটরসাইকেলে বিকট শব্দ সৃষ্টি, পথচারীদের বিরক্ত করা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগও রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর করে তাঁর মুঠোফোন বা টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।শুধু ছিনতাই বা অস্ত্র প্রদর্শন নয়, মাদক ও জুয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই জুয়ার কারবার চলছে। জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে মারামারি, গুরুতর আহত হওয়া এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।সম্প্রতি সদর রোডে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনাতেও জুয়া-সংক্রান্ত বিরোধের কথা স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।গ্রুপে ঢোকার পর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগস্থানীয়দের মতে, কিশোরদের একটি অংশ প্রথমে বন্ধুত্ব, আড্ডা কিংবা মোটরসাইকেল শোডাউনের মাধ্যমে এসব গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে। পরে ধীরে ধীরে তাদের কেউ কেউ মাদক, মারামারি, ছিনতাই ও অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।পলাশপুরের ‘ফকির গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর চক্রের নেতৃত্বে ফকির রাজু রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় একাধিক মামলা থাকার কথাও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।এ ছাড়া স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে কিছুদিন আগে রিদওয়ানের একটি হাত কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নগরের বেলতলা এলাকার মামুন ওরফে বাবা মামুন জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।এসব গ্রুপের পেছনে মাদক কারবারি, অপরাধী চক্র কিংবা কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।পুলিশের অভিযানকিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে বরিশাল মহানগর পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। গত শনিবার দুপুরে নগরের বটতলা এলাকা থেকে ‘স্টেলিন গ্রুপের’ প্রধান স্টেলিনকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। সে একই এলাকার সোহেল মিঞার ছেলে।বরিশাল নগর পুলিশের পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা আছে। তালিকায় থাকা নাম ধরে ধরে তাদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। গত শনিবার বিকেলে দেশি অস্ত্রসহ এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’তিনি বলেন, নতুন করে যারা গ্রুপ করার চেষ্টা করছে, তাদেরও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বরিশালে নতুন কোনো গ্যাং তৈরি করতে দেওয়া হবে না। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, কেউ রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কাজে আসবে না।